ডিজিটাল যুগে বদলে গেছে জালিয়াতির ধরন। কঠোর নিরাপত্তা আর বায়োমেট্রিকের প্রযুক্তিকেও বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে পাচারকারীরা। গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর চক্র। তাদের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, অন্যের ভিসায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অপরাধীরা। এমনই এক প্রতারণার শিকার শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের তামান্না বেগম।
তামান্না ও তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে জামাল আহমেদের (আসল নাম নয়) পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে প্রিয়াঙ্কা সরকার (৩২) ও আশরাফুল কাজী (১৫) নামে দুজনকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল মানব পাচারকারী একটি চক্র। প্রিয়াঙ্কা ও আশরাফুলের সঙ্গে ৩৬ লাখ টাকার চুক্তিও হয় চক্রটির। কিন্তু বিধি বাম; চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ইমিগ্রেশন চ্যানেলে ধরা পড়েন তারা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ আটক করে তাদের, হয় মামলাও। জব্দ করা পাসপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত মালিক তামান্না ও জামালের সন্ধান পায় পুলিশ। এরপর একে একে বেরিয়ে আসে পিলে চমকানো তথ্য। জানা যায়, তামান্না বেগম ও তার দুই সন্তানের পাসপোর্ট ব্যবহার করে এরই মধ্যে ইতালি চলে গেছেন আরও তিনজন! বিষয়টি যেন নব্বইয়ের দশকের আলোচিত ‘গলাকাটা’ ভিসা প্রতারণার নতুন সংস্করণ!
অথচ ডিজিটাল তথ্যের যুগে এমন প্রতারণা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, এখন পাসপোর্টের নাম-ঠিকানা, ছবি কিংবা বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) অন্যের সঙ্গে মেলার কোনো সুযোগ নেই। অথচ সেই পাসপোর্টেই ভিসা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অন্যরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানব পাচারে পাসপোর্ট জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং একাধিক দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা। ভয়ংকর এই জালিয়াতিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, ইতালিসহ বিদেশে থাকা একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র সক্রিয়। চক্রের হোতা বেলায়েত জমাদ্দারসহ সাতজনকে পাকড়াও করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ইমিগ্রেশন পুলিশের পাঁচ সদস্যকে রাখা হয়েছে নজরদারিতে। ইতালির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষও কাজ করছে চক্রের সদস্যদের শনাক্তে। এরই মধ্যে কয়েক দফায় ঢাকার ইতালি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন সিআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
পাসপোর্ট তামান্নার, ইতালি গেল অন্যরা: গত ২৬ জুলাই তামান্না ও তার দুই সন্তান লিলি এবং জামাল কাতার এয়ারলাইনসে টিকিট কেটে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে গিয়ে জানতে পারেন, ৬ থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই তাদের পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনজন ইতালিতে চলে গেছেন। পরে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদর দপ্তরে গিয়ে তাদের পাসপোর্টে ইতালি যাওয়া ব্যক্তিদের ছবিও দেখেছেন।
তামান্না বেগম জানালেন, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই গুলশান-২-এর ‘ভিএফএস’ সেন্টারে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ওই নারীই তাদের সন্ধান দেন বেলায়েত জমাদ্দারের। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট বেলায়েতের মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর বেলায়েতের সঙ্গে ইতালির ভিসা দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার জন্য সাড়ে ৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি সকালে ভিএফএস থেকে ইতালির ভিসাসহ পাসপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু বেলায়েতের সহযোগীরা জোর করে তাদের তিনটি পাসপোর্ট নিয়ে নেন। সাড়ে ৫ লাখ টাকা নিয়ে তার অফিসে গেলে বেলায়েত জানালেন, দুটি পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে। তবে ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে পুলিশের ফোনে জানতে পারেন, তাদের পাসপোর্টে প্রিয়াঙ্কা ও আশরাফুল নামে দুজন বিদেশ যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে আটক হয়েছেন। আর বেলায়েতের অফিস থেকে তার মেয়ের পাসপোর্টও উদ্ধার করা হয়েছে।
নাসিমার পাসপোর্টেও অন্যজন ইতালিতে: একই চক্রের খপ্পরে পড়েন নাসিমা আক্তার (আসল নাম নয়) ও তার চার সন্তান। ইতালি যাওয়ার জন্য বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে গিয়ে জানতে পারেন, তার পাসপোর্ট ব্যবহার করে একজন এরই মধ্যে ইতালি চলে গেছেন।
নাসিমা জানালেন, তার স্বামী ১১ বছর ধরে ইতালিতে থাকেন। চার সন্তানসহ স্বামীর কাছে যেতে পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই ভিসা করতে পারছিলেন না। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার ইতালি দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। ১৪ মাস পার হলেও ভিসা পাননি। এর মধ্যে তার পাসপোর্টের মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। দূতাবাস থেকে ফোন করে জানানো হলে মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে যান তিনি। তখন নাজমুল নামে একজন তাকে বললেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট নবায়ন করে দিতে পারবেন। দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নাজমুলকে নবায়নের জন্য দেন। তখন নাজমুল জানালেন, ইতালি যাওয়ার ভিসাও করে দেওয়া সম্ভব।
এরপর গত ২ এপ্রিল নাজমুলের মাধ্যমেই পরিচয় হয় বেলায়েতের সঙ্গে। ভিসা করে দেওয়ার জন্য সাড়ে ৪ লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তি হয় তার সঙ্গে। ভিসা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকা পরিশোধের কথা বলা হয়। ১৬ এপ্রিল ইতালি দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বের হওয়ার সময় নাজমুলসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন চুক্তি অনুযায়ী টাকা দাবি করেন। টাকা না থাকায় তারা পাসপোর্টটি কেড়ে নেন। বাধ্য হয়ে তাদের ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা দেন তিনি। টাকা দেওয়ার পর পাসপোর্ট ফেরত পান। তবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ৯ জুলাই বিমানবন্দরে গেলে তাদের আটকে দেওয়া হয়। ইমিগ্রেশন থেকে জানানো হয়, গত ২৪ এপ্রিল তার পাসপোর্ট ব্যবহার করে একজন ইতালিতে গেছেন। এ ঘটনায় ২১ জুলাই রাজধানীর গুলশান থানায় মামলা করেন তিনি।
কে এই বেলায়েত: তামান্নার অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে গত ২১ জুলাই বেলায়েত হোসেন, নাজমুলসহ চক্রটির সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। গ্রেপ্তার হওয়া অন্য ব্যক্তিরা হলেন মেহেদী হাসান, মো. সোলাইমান সুমন, ফজলে রাব্বী, মো. তৌহিদুর রহমান ও কাওসার হোসেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫৬টি পাসপোর্ট, ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিল, একটি এমবোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ আড়াই লাখ টাকা জব্দ করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের মাত্র চার দিনের মাথায় বেলায়েত জামিন পান।
বেলায়েত হোসেনের প্রকৃত নাম বেলায়েত জমাদ্দার। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। ২০০৮ সালে কৃষি ভিসায় ইতালি যান তিনি। বসবাস করতেন ইতালির সিসিলি শহরে। তবে ১০০ ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৩ সালে তাকে ইতালি থেকে বের করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিক ইতালির নাগরিককে বড় অঙ্কের জরিমানাও করে সরকার। পরে নতুন পাসপোর্টে বেলায়েত হোসেন নাম ধারণ করে ২০২৩ সালে পর্যটক ভিসায় আবার ইতালিতে যান। অবশ্য, ইতালির ফাইল প্রসেসিংয়ের নামে ২০১৬ সাল থেকেই মানব পাচার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন বেলায়েত। প্রতিষ্ঠা করেন ‘জমাদ্দার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’।
ইমিগ্রেশনেই বড় প্রশ্ন: বেলায়েতের অফিস থেকে জব্দ করা পাসপোর্ট ও সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা ঘিরে। একজনের পাসপোর্টে অন্য ব্যক্তির ছবি, নাম-পরিচয় ও বায়োমেট্রিক কীভাবে ব্যবস্থাপত্রের একাধিক ধাপ পেরিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ থেকে যিনি অন্যের পাসপোর্টে বের হচ্ছেন, তিনি ইতালির বিমানবন্দরে গিয়ে কীভাবে পার হয়ে যাচ্ছেন ইমিগ্রেশন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হবে না; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কারা এই চক্রকে সহায়তা করছে— সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘আন্তর্জাতিক এই জালিয়াত চক্রের কর্মকাণ্ড কল্পনাকেও যেন হার মানাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ইতালিতে থাকা মানুষ, এমনকি ইমিগ্রেশন বিভাগের সদস্যরাও জড়িত বলে আমাদের ধারণা। এ বিষয়ে ইতালি সরকারও কাজ করছে। তারা আমাদের কাছে তথ্য চাচ্ছেন। আমরা সেগুলো সরবরাহ করেছি।’
এমন জালিয়াতির সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন জড়িত বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ। আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এতে বিদেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা হেয়প্রতিপন্ন হবেন। সরকারের উচিত এই দুর্বলতা খুঁজে বের করা। কারণ, ইমিগ্রেশন বিভাগের সহায়তা ছাড়া কোনোভাবেই অন্যের ভিসায় কেউ দেশ ছাড়তে পারে না। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে দ্রুত। এই ধরনের আরও চক্র সক্রিয় থাকলে তাদেরও খুঁজে বের করা উচিত।’