Image description

রোগীকে সুস্থ করে জীবনে আশা আর আলো ফিরিয়ে আনে হাসপাতাল। অথচ ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে জীবন বাঁচানোর সেই ‘আলোর ঘর’গুলোই এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জেনারেটর বা আইপিএসের পর্যাপ্ত ব্যাকআপ না থাকায় অনেক সময় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) টর্চ বা মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে সারতে হচ্ছে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে কাজ করেন মো. রবিউল ইসলাম। তিনি জানালেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে রেডিওথেরাপির মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। ব্লাডব্যাংকের বিভিন্ন যন্ত্র চালানো এবং রক্ত সংরক্ষণেও সমস্যা তৈরি হয়। তার ভাষ্য, আইপিএস ও জেনারেটরের ব্যাকআপ থাকলেও হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় তা অপ্রতুল। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয় না।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার রোস্টার ডিউটির মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। কিছুদিন আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। জেনারেটর নষ্ট থাকলে টর্চ ও মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়েও ছোটখাটো ওটির কাজ করতে হয়। তাদের অভিযোগ, নতুন ভবনে জেনারেটর থাকলেও সব জায়গায় এর সুবিধা পাওয়া যায় না। জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস আছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ মিলে হাসপাতালের পরিবেশ গুমোট হয়ে ওঠে। এতে রোগীদের কষ্ট আরও বাড়ে।

একটি-দুটি হাসপাতাল নয়, দেশজুড়ে হাসপাতালগুলোতে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। তীব্র গরমে কষ্ট পাচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। ব্যাহত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসা, ওটিতে অস্ত্রোপচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের রোগীরা। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকটিতে পর্যাপ্ত জেনারেটর বা বিকল্প না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কার্যত অচল হয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা।

জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন যুগান্তরকে বলেন, রেডিওথেরাপি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আইসিইউ, প্যাথলজি ও ব্ল্যাডব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। বিশেষ করে রেডিওথেরাপির মেশিন ৩০ মিনিটের বেশি বন্ধ থাকলে এর পুরো ব্যবস্থাই শাটডাউন হয়ে যেতে পারে।

অস্ত্রোপচার ও প্যাথলজি পরীক্ষায় বিঘ্ন : যুগান্তরের অনুসন্ধানে ঢাকা ছাড়াও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসাসেবায় সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও দিনে একাধিকবার, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার ও প্যাথলজি পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। ল্যাবে দামি রিএজেন্ট নষ্ট হচ্ছে। পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।

কথায় কথায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে ভয়াবহ তথ্য দিলেন। হাসপাতালটির জেনারেটরের ম্যাগনেটিক এটিএস নষ্ট হয়ে প্রায় ২০-২৫ দিন ব্যাকআপ বন্ধ ছিল। পরে গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) সহযোগিতায় মেরামত করা হয়েছে।

জেনারেটর পরিচালনায় আরেক সংকটের কথা জানালেন ওই চিকিৎসক। তার তথ্যমতে, বড় জেনারেটরটি চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ লিটার তেল লাগে। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ সীমিত। ফলে সবসময় জেনারেটর চালানো সম্ভব হয় না। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের পিক আওয়ারে জেনারেটরের ব্যাকআপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় বহির্বিভাগে রোগীর চাপ থাকে এবং অপারেশন থিয়েটারও সচল রাখতে হয়। বিকালের দিকে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প সময়ের জন্য জেনারেটর চালানো হয়।

ঢাকার বাইরে কয়েকটি হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ চলে গেলে তীব্র গরমে হাসপাতালে অবস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থদের কষ্ট বাড়ে। হাতপাখা দিয়ে রোগীর পাশে বসে বাতাস করতে হয়। রাতের দিকে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ এলেও ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে আবার চলে যাচ্ছে। সিসিইউ ইউনিট, নিউমোনিয়া ওয়ার্ডের রোগীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।

ঝুঁকিতে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম : হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংকট শুধু রোগীর স্বাভাবিক ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়; ঝুঁকিতে পড়ছে জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ খালেদ বিন ইসমাইল যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি হাসাতালের আইসিইউ, সিসিইউ, আরআইসিইউ, এইচডিইউ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউর বিভিন্ন যন্ত্রই বিদ্যুৎনির্ভর। ভেন্টিলেশন সাপোর্টের রোগীদের ভেন্টিলেটর মেশিন, সিরিঞ্জ পাম্প, নবজাতকদের ফটোথেরাপি, ওয়ার্মারসহ বিভিন্ন যন্ত্র চালাতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিছু যন্ত্র আইপিএস বা ইউপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়; কিন্তু সব ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এসব ইউনিটে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইবনে সিনা ট্রাস্টের এজিএম (অ্যাডমিন) মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, লোডশেডিংয়ের ক্ষতি এড়াতে আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, ল্যাবরেটরি ও অপারেশন থিয়েটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহসহ পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

জরুরি সেবায় বিদ্যুৎ নিশ্চিতের উদ্যোগ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি রাজবাড়ীতে গিয়ে হাসপাতালের বিদ্যুৎ সমস্যার বিষয়টি দেখেছি। বিশেষ করে অপারেশন থিয়েটারে লোডশেডিং হলে সমস্যা হয়। এ কারণে স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি অপারেশনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। কোনো জরুরি অপারেশন বা গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা চলাকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানালে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি সেবাগুলোতে যাতে কম লোডশেডিং হয়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস যুগান্তরকে বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে যাতে জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। জরুরি প্রয়োজনে অনেক হাসপাতালেই বিকল্প বিদ্যুৎলাইন ও অন্যান্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে অপারেশন, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি বিভাগের সেবা সচল রাখার বিষয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া থাকে।

এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, সব জায়গায় সমানভাবে ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলেও ন্যূনতম জরুরি সেবা-বিশেষ করে জরুরি বিভাগ ও অপারেশন কার্যক্রম যাতে চালু রাখা যায়, সেদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টি রাখতে বলা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং নিয়ে নতুন আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়মিত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার কর্মসূচিতে কীভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।