Image description

গ্রামের মানুষ আইনি সেবা পেতে চাইলে যেতে হয় শহরে। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জেলা শহর পর্যন্ত যাতায়াত মানে বেশ লম্বা সময় ও আর্থিক ব্যয়ের বিষয়। গ্রামীণ জনপদের এই ভোগান্তি কমাতে দেশে চালু করা হয়েছিল ‘গ্রাম আদালত’। জনগণের দোরগোড়ায় সহজ ও স্বল্প সময়ে সেবা পৌঁছে দিতে উদ্যোগটি নেওয়া হয়। নানা জটিলতায় সেই দোরগোড়ার সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। সম্প্রতি রাজশাহীর গ্রাম আদালতগুলোর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

 

সরেজমিন তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নানামুখী সংকটে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। গ্রাম আদালতের কার্যক্রম যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে পরিচালিত হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশিরভাগ পরিষদের সেবায় ব্যাঘাত ঘটে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা গা ঢাকা দেওয়ায় গ্রাম আদালতের বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে।

 

গ্রাম আদলতের কাজ কী

স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকে অধিকতর স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা; গ্রামীণ জনগণের, বিশেষ করে নারী এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ন্যায় বিচার প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা এবং উচ্চ আদালতে মামলার জট কমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে গ্রাম আদালত।

 

১৯৭৬ সালে গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ এবং গ্রাম আদালত বিধিমালা, ২০১৬ প্রণয়নের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হয়। আইনটি ২০১৩ সালে প্রথম এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বার সংশোধন করা হয়।

 

গ্রাম আদালতে ফৌজদারি বিচারযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য–চুরি সংক্রান্ত; ঝগড়া-বিবাদ; শক্রতামূলক ফসল, বাডি বা অন্য কিছুর ক্ষতি সাধন; গবাদি পশু হত্যা বা ক্ষতিসাধন; প্রতারণামুলক; শারিরীক আক্রমণ, ক্ষতি সাধন, বল প্রয়োগ করে ফুলা ও জখম করা; গচ্ছিত কোনো মুল্যবান দ্রব্য বা জমি আত্মসাৎ।

 

এ ছাড়া দেওয়ানি বিচারযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখডোযোগ্য হলো–স্থাবর সম্পতি দখল পুনরুদ্ধার; অস্থাবর সম্পত্তি বা তার মূল্য আদায়; অস্থাবর সম্পত্তি ক্ষতিসাধনের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়; কৃষি শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরী পরিশোধ ও ক্ষতিপুরণ আদায়ের মামলা; চুক্তি বা দলিল মূল্যে প্রাপ্য টাকা আদায়।

 

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উভয়পক্ষ মনোনীত দুইজন করে চারজন মোট পাঁচজন (দুজন বাদী পক্ষ থেকে, দুজন বিবাদী পক্ষ থেকে এবং চেয়ারম্যান স্বয়ং) সদস্য নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়।

 

আবেদনকারী সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ দিয়ে মামলা করতে পারে। চেয়ারম্যান অভিযোগ যাচাই করে গ্রাম আদালত গঠন করেন। নির্ধারিত তারিখে উভয় পক্ষকে উপস্থিত হতে হয়। প্রমাণ, সাক্ষ্য, এবং যুক্তিতর্ক শোনার পর রায় ঘোষণা করা হয়। রায় সর্বসম্মত বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে হয়।

 

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর করা হয়। যদি কোনো পক্ষ রায়ে অসন্তুষ্ট হয়—দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে: সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আপিল করতে হয়। আপিল সাধারণত রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে করার নিয়ম রয়েছে।

একটি গ্রাম আদলত সহকারীর সহযোগিতা নিচ্ছেন বিচারপ্রার্থী। ছবি: ভিলেজকোর্ট
একটি গ্রাম আদলত সহকারীর সহযোগিতা নিচ্ছেন বিচারপ্রার্থী। ছবি: ভিলেজকোর্ট

 

বিচারব্যবস্থায় স্থবিরতা

সম্প্রতি রাজশাহীর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে নিয়মিত গ্রাম আদালতের শুনানি হওয়ার কথা, সেই কক্ষগুলো অনেক জায়গায় কার্যত পরিত্যক্ত। কোথাও ধুলাবালিতে ঢেকে আছে আদালতের কক্ষ, কোথাও চেয়ার-টেবিল গুছিয়ে তুলে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে নির্ধারিত এজলাস। আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এসব কক্ষ নীরবতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 

এই জেলায় নয়টি উপজেলার আওতায় রয়েছে ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে অধিকাংশ ইউনিয়নে সাধারণ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে অথবা সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এই বিকল্প ব্যবস্থায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আগের গতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগে একই ধরনের বিরোধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে যেত। এখন সেই সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে উপজেলা বা জেলা আদালতে মামলা করতে হচ্ছে। এতে আইনজীবীর খরচ, যাতায়াত ব্যয় এবং দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা—সব মিলিয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

 

বিচারপ্রার্থী ও বিচার সংশ্লিষ্টরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, আগে দ্রুত বিচার পাওয়া গেলেও বর্তমানে শুনানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত আদালতে মামলা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ১০ নম্বর মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, নিয়মিত চেয়ারম্যান না থাকায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও জমে থাকা অভিযোগগুলো ধাপে ধাপে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 

মোহনপুর উপজেলার ৫ নম্বর মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজর বিশ্বাস জানান, জনসাধারণ যাতে একেবারে বিচারসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য সীমিত পরিসরে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

 

পবা উপজেলার ৯ নম্বর পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাঈদ আলী বলেন, সীমিত জনবল ও বিভিন্ন আইনি জটিলতার মধ্যে সপ্তাহে অন্তত একদিন গ্রাম আদালতের অভিযোগগুলোর শুনানি নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

একটি গ্রাম আদালতে বিচারব্যবস্থার চিত্র। ছবি: ভিলেজকোর্ট
একটি গ্রাম আদালতে বিচারব্যবস্থার চিত্র। ছবি: ভিলেজকোর্ট

 

পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা

প্রশাসন বলছে, প্যানেল চেয়ারম্যানদের প্রশিক্ষণ, সভা-সেমিনার এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার মাধ্যমে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

 

এ বিষয়ে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সেলিম আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, গ্রাম আদালত সচল রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। যেসব ইউনিয়নে সমস্যা রয়েছে, সেখানে নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

 

মোহনপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা বলেন, বিচারপ্রার্থীরা যাতে দ্রুত সেবা পান, সে লক্ষ্যে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, রাজশাহীতে বর্তমানে ৭১ জন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ৬৩৯ জন সাধারণ সদস্য এবং ২১৩ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের পদ রয়েছে।

 

সংযুক্ত প্রকল্পের তথ্য বলছে, জেলার ৭১টি ইউনিয়নই গ্রাম আদালত কার্যক্রমের আওতাভুক্ত। চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৩৩টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৮টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, বিচারাধীন রয়েছে ১৮৩টি মামলা। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের অনুকূলে আদায় করে দেওয়া হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৯ টাকা। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৬৩টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কক্ষ সংস্কার এবং ছয়টি ইউনিয়নে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি ও সমাজকর্মী আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং জনবল সংকটের কারণে গ্রাম আদালত এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।

 

তার মতে, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত, সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে বিচার নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালতের বিকল্প নেই। এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে উপজেলা ও জেলা আদালতে ছোটখাটো মামলার চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রাম আদালতকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

 

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ১২টি নতুন এজলাস তৈরি করা হয়েছে। যেসব ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম বন্ধ বা অনিয়মিত রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সচল করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।