একসময় শিশু, দর্শনার্থী ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা চট্টগ্রামের ‘মিনি বাংলাদেশ’ এখন প্রায় জনশূন্য। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা কমপ্লেক্স নামে পরিচিত এই বিনোদনকেন্দ্রটি এখন আগাছা, অবহেলা ও অযত্নে ঢেকে গেছে।
চট্টগ্রামের কালুরঘাটের চান্দগাঁও এলাকায় ১৬ দশমিক ৩৭ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই বিনোদন কমপ্লেক্সটির বর্তমান চিত্র একেবারেই ভিন্ন। একসময় যেখানে মানুষের ভিড় ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে মরিচা ধরা বিভিন্ন রাইড ও লোহার কাঠামো। দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ক্ষুদ্র প্রতিরূপগুলোও নষ্ট হতে শুরু করেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনার কিছু সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই কমপ্লেক্সটি প্রায় অচল। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। পুরো এলাকায় ঘন ঝোপঝাড় ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন পরিচর্যা না হওয়ায় বিভিন্ন অংশে জন্মেছে আগাছা।
বিনোদনকেন্দ্রটির রাইড, কৃত্রিম রেলপথ ও অন্য লোহার স্থাপনা বৃষ্টি ও রোদের মধ্যে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে এসব কাঠামো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের কারণে সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইফতেখার মাহমুদ আবিদ বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগে সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পার্কের ভেতরে মাদক, অ্যালকোহল ও গাঁজার আসরের অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর কমপ্লেক্সে ভাঙচুর ও লুটপাটও হয়েছে। বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
তার মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে জায়গাটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর।
‘মিনি বাংলাদেশ’ এমন একটি স্থান হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষুদ্র সংস্করণ এক জায়গায় দেখা যাবে। এর মধ্যে ছিল জাতীয় সংসদ ভবন, কার্জন হল ও সোনা মসজিদের প্রতিরূপ। এই বিনোদন কেন্দ্র যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসতেন।
২০০৬ সালে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই কমপ্লেক্স নির্মিত হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে এর নাম রাখা হয়েছিল ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এই নামকরণ করা হয়েছিল।
কালুরঘাট এলাকাটি বেছে নেওয়ার পেছনেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই এলাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাসের সঙ্গেও কালুরঘাটের নাম জড়িয়ে আছে।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কমপ্লেক্সটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর এটি ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়। এরপর থেকে বিনোদনকেন্দ্রটিতে আর স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।
এই কমপ্লেক্সের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ৭১ মিটার উচ্চতার স্বাধীনতা টাওয়ার। যার সবচেয়ে উপরের তলায় থাকা রেস্তোরাঁ থেকে একসময় চট্টগ্রাম শহর, কর্ণফুলী নদী ও আশপাশের এলাকার দৃশ্য উপভোগ করা যেত। বর্তমানে টাওয়ারটি বন্ধ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সরঞ্জাম ও স্থাপনাও চুরি হয়ে গেছে।
বর্তমানে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং পাঁচজন আনসার সদস্য কমপ্লেক্সটির দেখভাল করছেন বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এত বড় একটি স্থাপনা রক্ষার জন্য এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
বন্ধ থাকার কারণে দর্শনার্থীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি পরিবার নিয়ে সেখানে যাওয়া আবদুল করিম বলেন, তারা জানতেন না যে জায়গাটি এত দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে মিনি বাংলাদেশ দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি জায়গাটি পরিত্যক্ত ও বন্ধ। ভেতরে ঢুকতে পারিনি, বাইরে কিছু সময় কাটিয়ে চলে যেতে হয়েছে।’
স্থানীয়রা বলছেন, এটি কেবল একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; চট্টগ্রামের মানুষের জন্য এটি ছিল দেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের একটি প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে চট্টগ্রামে বড় আকারের বিনোদনকেন্দ্রের সংখ্যা কম থাকায় মিনি বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেশি।
এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকলে স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ব্যয় আরও বেড়ে যাবে বলেও আশঙ্কা জানান তারা।