Image description

পতিত আওয়ামী লীগের বিদেশে পলাতক সাবেক সংসদ সদস্যরা ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) কাছে একাধিক চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসব চিঠিতে তারা দেশে ফিরতে না পারা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে অভিযোগ করেন।

গত রোববার রাতে বাংলাদেশ সফরে আসেন আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপ। তার সফরকে কেন্দ্র করে সংসদের সদস্যদের সঙ্গে হওয়া প্রস্তুতি বৈঠকে এসব অভিযোগের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব বৈঠকে বর্তমান সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আওয়ামী লীগকে জনগণই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। একই সঙ্গে বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্যই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতন, হয়রানি কিংবা গুমের শিকার হয়েছেন বলে বৈঠকে তুলে ধরা হয়।

সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতি বৈঠকে বৈঠকগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর গুম, নির্যাতন ও দমনপীড়নের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ও সময়কার সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোও আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে আইপিইউর কাছে দেওয়া চিঠিতে তাদের দেশে ফেরার সুযোগ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারা আইপিইউর কাছে আরো দাবি করেছে, দলটি বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। সবার অধিকার ছিল, তাদের আমলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের সবধরণের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আওয়ামী লীগের এমপিদের সব অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংসদ সদস্য বলেন, গত জুলাইয়ে অ্যান্ডা ফিলিপ আইপিইউ সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগ থেকে দীর্ঘদিন এ সংস্থায় কাজ করছেন। এ কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিদের কারো কারো সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। তারা এসব চিঠি দিয়েছে। এখন আমরা তাদের পাল্টা যুক্তি, তাদের আমলে করা হত্যা, গুম-খুনের চিত্র তুলে ধরছি।

গতকাল সোমবার সকালে আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে স্পিকার আইপিইউ সেক্রেটারির কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতার বিষয়ে জাতিসংঘের করা প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।

সেখানে স্পিকার বলেন, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল প্রহসনের। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত করে দেশের গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করা হয় এসব নির্বাচনের মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে ছাত্রজনতা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বৈরাচারের অবসান ঘটায়। তিনি বলেন, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এদেশের ইতিহাসে অন্যতম অবাধ, প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। পরে অ্যান্ডা ফিলিপের সঙ্গে নারী ও তরুণ সংসদ সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাতেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতন ও দমনপীড়নের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারী এমপিরা।

গতকাল বিকালে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য ও দলটি সদস্য সচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আইপিইউর কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।

দলটির পক্ষ থেকে আইপিইউতে পাঠানো চিঠির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আইপিইউকে দেওয়া বিভিন্ন চিঠিতে ২০২৪ সালের আগের সময়ের নিপীড়ন, গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এজন্য বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশের জনগণকে দায়ী করার চেষ্টা হয়েছে।

আখতার বলেন, আওয়ামী লীগের দেওয়া ভুল বার্তা সংশোধনের চেষ্টা করেছেন তারা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রনেতাসহ বিভিন্ন পক্ষ অতীতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সে নির্যাতনের কিছু তথ্য আইপিইউ প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান আখতার।

এ সময় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম অবশ্য বলেন, বর্তমান সরকারকে সরাসরি দোষারোপ করা হয়নি। তবে সরকার ও বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্পিকার পূর্ববর্তী সরকারের সময় জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন এবং আইপিইউর সেক্রেটারি জেনারেল ও তার প্রতিনিধিদলকে প্রতিবেদনটি পড়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, এটি জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্বাধীন প্রতিবেদন এবং জাতীয় সংসদের এ প্রতিবেদন প্রণয়ন বা প্রকাশে কোনো ভূমিকা ছিল না।

এদিন বিকালে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন আইপিইউ মহাসচিব। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার দমনপীড়নের চিত্র তার কাছে তুলে ধরা হয় বলে জানা গেছে।

আজ মঙ্গলবার সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন আইপিইউ মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ। ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতন ও গুমের শিকার হওয়া কয়েকজন সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য বিএনপির সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তার পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার রাজনৈতিক নির্যাতনের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। এছাড়া গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী, গুমের শিকার বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম, নাজিবুর রহমানসহ আরো কয়েকজনকে বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

বৈঠকে ভুক্তভোগী সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের এবং পরিবারের ওপর সংঘটিত নির্যাতন, গুম ও হয়রানির ঘটনাগুলো আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে তুলে ধরবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে গতকাল বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে অ্যান্ডা ফিলিপ সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা জাতীয় সংসদকে আরো কার্যকর করে তোলা এবং সব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সংলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা এ সময় সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।