বাগেরহাটের মিরাজ শেখের গুমের ঘটনা বর্তমানে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত একটি ঘটনা। গত ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রথম এক বিবৃতির মাধ্যমে মিরাজের গুমের ঘটনাটি সামনে আনে। প্রতিষ্ঠানটি এটিকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে সংঘটিত প্রথম গুমের ঘটনা হিসেবে অভিহিত করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বিবৃতিতে জানায়, "২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাতে, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি অনুযায়ী, মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মণীর ঘোল এলাকায় জেলে মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান। পরদিন তার পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে অবস্থিত কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে গেলে তাদের প্রথমে জানানো হয় যে, মিরাজ “একটি অভিযানে” রয়েছেন এবং বিকেলে আবার আসতে বলা হয়। কিন্তু বিকেলে পুনরায় সেখানে গেলে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।"
এরপর দ্য ডিসেন্ট, বিবিসি বাংলা এবং ডয়চে ভেলে-সহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম আলাদা আলাদা অনুসন্ধানে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য তুলে ধরে একই ধরনের তথ্য জানায়।
পাশপাশি দ্য ডিসেন্ট এর প্রতিবেদনে এমন কিছু প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে যেখানে দেখা যায়, মিরাজ শেখকে তুলে নেয়ার পর তার পরিবার এবং এলাকাবাসী যারা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তাদেরকে নানানভাবে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে হয়রানি করা হয়েছে।
মিরাজের গুমের ঘটনা তদন্তে দেশি বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যখন চাপ তৈরি হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের দুটি সংবাদমাধ্যম একযোগে 'অনুসন্ধানী প্রতিবেদন' প্রকাশ করে গুমের ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। সংবাদমাধ্যম দুটির কথিত অনুসন্ধানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, মিরাজকে কোস্টগার্ড গুম করেনি, এবং তার পরিবারের দাবি সত্য নয়।
দ্য ডিসেন্ট এর অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগকে 'অসত্য' প্রমাণের চেষ্টা করা কথিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশকারী সংবাদমাধ্যম দুটির প্রতিবেদকরা কোস্টগার্ডের বোটে চড়ে 'অনুসন্ধান' চালিয়েছেন।
এবং একাধিক সূত্র দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে, ওই দুই সংবাদমাধ্যমের দুটি টিমকে ঢাকা থেকে বাগেরহাটের সুন্দরবন এলাকায় নিয়ে যাওয়া, সেখানে অবস্থান করা এবং ফিরে আসার যাবতীয় আয়োজন করেছে কোস্টগার্ড নিজে।
'গুম হয়নি' দেখাতে কোস্টাগার্ডের বোটে চড়ে দুই সংবাদমাধ্যমে সংঘবদ্ধ 'অনুসন্ধান'
কথিত ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশকারী দুটি সংবাদমাধ্যম হল, বেসরকারি এখন টিভি এবং নতুন দৈনিক নাগরিক প্রতিদিন।
গত ২৬ আগস্ট এখন টিভি তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ৮:৪১ মিনিটের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে শিরোনাম দেয়, “পরিবারের দাবি ‘গুম’, অনুসন্ধানে বের হলো ৬ লাখ টাকার গোপন তথ্য! | Investigative News | BD Crime”।
নাগরিক প্রতিদিনের শিরোনাম ছিল, “মোংলার মিরাজ শেখ: নিখোঁজের নেপথ্যে আসলে কী?”। পত্রিকাটির অনুসন্ধানী প্রোগ্রাম ‘দ্য ব্লুপ্রিন্ট’-এর ফেসবুক পেইজে ৩১:৩৯ মিনিট দীর্ঘ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ২৬ আগস্ট।
এখন টিভির প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট শাহরিয়ার জামান দীপ ও ভিডিও জার্নালিস্ট আবু বক্কর সিদ্দিক মুন। নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদক ছিলেন রাকিব হাসান এবং ভিডিওতে ছিলেন সাইফুল সাঈদ ইসলাম।

প্রসঙ্গত, চলতি আগস্ট মাসেই নাগরিক প্রতিদিন থেকে এখন টিভিতে যোগ দিয়েছিলেন শাহরিয়ার জামান দীপ।
দুটি প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ও ভিডিও জার্নালিস্টদের ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করা বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে যে, উভয় সংবাদমাধ্যমের চারজন সংবাদকর্মী একসাথে ঢাকা থেকে বাগেরহাটে গিয়েছেন এবং সেখানে চারদিন অবস্থানরত অবস্থায় কোস্টকার্ডের নৌযানে করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছেন।
এখন টিভির রিপোর্টের শুরুতে একটি দৃশ্যে দেখা যায়, সাদা শার্ট পরিহিত শাহরিয়ার জামান দীপ চলন্ত নৌযানের সামনে একটি লোহার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। ১৫ আগস্ট নিজের দাঁড়িয়ে থাকার একই রকম একটি ছবি দীপ তার ফেসবুক আইডিতে (সুন্দরবনের লোকেশন ট্যাগ) পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছেন, “আসছি আমি... নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে।”
একই দিন একই নৌযানে দাঁড়ানো অবস্থায় কয়েকটি ছবি এবং একটি ভিডিও নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেন শাহরিয়ার জামান দীপের সাথে অবস্থান করা ভিডিও জার্নালিস্ট আবু বক্কর সিদ্দিক মুন। এর মধ্যে লোহার খুঁটি ধরে দীপের মতো করে দাঁড়িয়ে থাকার প্রায় হুবহু একটি দৃশ্যও আছে। মুনের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, নৌযানটি কোস্টগার্ডের পোশাক পরা এক ব্যক্তি চালাচ্ছেন এবং নৌযানের ওপরে ইংরেজিতে কোস্টগার্ড এর নাম লেখা (ভিডিওতে শুধু URAD অক্ষরগুলো দৃশ্যমান)। যানটির উপরে মেরিন রাডার ডোম বা ‘রেডোম’ রয়েছে।
অর্থাৎ, এখন টিভির প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজ ও প্রতিবেদকদ্বয়ের ফেসবুকে পোস্ট করা ছবি ও ভিডিও থেকে এটি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, তারা উভয়ে কোস্টগার্ডের বোটে চড়ে কথিত অনুসন্ধানের কাজ করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, একই নৌযানে নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদক রাকিব হাসান এবং সাইফুল সাঈদ ইসলামও ছিলেন।

নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদনেও একাধিক জায়গায় কোস্টগার্ডের আরেকটি নৌযান (যেটি অপেক্ষাকৃত বড়) দেখানো হয়েছে। সেই নৌযানে দেখা যায় বেশ কয়েকজন ইউনিফর্ম পরিহিত কোস্টগার্ড সদস্যের সাথে যানটির দুই প্রান্তে দুটি ক্যামেরায় শুট করা হচ্ছে। এসব শট ড্রোন থেকে নেয়ার কারণে ক্যামেরার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের চেহারা দেখা যায়নি। একটি সূত্র জানিয়েছে, এই ড্রোন শটগুলো কোস্টগার্ড কর্তৃক এখন টিভি ও নাগরিক প্রতিদিনের সাংবাদিকদেরকে সরবরাহ করা পুরনো ফুটেজ।

ঢাকা থেকে ৪ সংবাদকর্মীকে হাই-এইস গাড়িতে করে নিয়ে যান কোস্টগার্ড কর্মকর্তা
অন্তত দুটি সূত্র দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে, দুটি সংবাদমাধ্যমের চারজন সংবাদকর্মীকে ঢাকা থেকে কোস্টগার্ডের খরচে ও তত্ত্বাবধানে বাগেরহাটে নিয়ে যাওয়া হয়।
যাত্রা শুরু হয় ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় ঢাকার আগারগাঁও কোস্টগার্ড কার্যালয়ের সামনে থেকে। একটি হাই-এইস গাড়িতে করে চালকসহ মোট সাতজন রওয়ানা দেন। তারা হলেন, এখন টিভির স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট শাহরিয়ার জামান দীপ, ভিডিও জার্নালিস্ট আবু বক্কর সিদ্দিক মুন, নাগরিক প্রতিদিনের রাকিব হাসান, ভিডিও জার্নালিস্ট সাইফুল সাঈদ ইসলাম, কোসগার্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল এবং তার সহযোগী একজন, যার নাম জানা যায়নি তবে একটি ছবি পাওয়া গেছে।
সংবাদকর্মীদেরকে নিয়ে গাড়িটি রাত ৯টা দিকে মোংলায় পৌঁছায় এবং তারা পর্যটন করপোরেশন পরিচালিত স্থানীয় হোটেল পশুর হোটেলে উঠেন। চার রাত সেখানে অবস্থানের পর গত ১৭ আগস্ট দুপুরে রওয়ানা দিয়ে রাত ৮টার দিকে ঢাকা ফেরেন তারা। পশুর হোটেল থেকে কোস্টগার্ডের স্থানীয় অফিসের দুরত্ব শুধু নদী পারাপারের।
সূত্র দুটি জানিয়েছে, চার সংবাদিকের ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে যাওয়া আসা, থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ বহন করেছে কোস্টগার্ড। ঢাকার টিমকে মংলায় সার্বক্ষণিক হোটেল পশুর, মোংলা | পাতা | বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন সহযোগিতা করেছেন একজন কর্মকর্তা, যার পূর্ণ নাম সূত্র জানাতে পারেনি। তবে সাজেদুল নামে তাকে ডাকা হয়েছে। তিনি আগে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন।
জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেলের সাথে যে সহযোগী ছিলেন তিনি খাবার বিল, হোটেল বিলসহ যাবতীয় বিল নিজের হাতে পরিশোধ করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
ওই সহযোগীর নাম বলতে না পারলেও তার একটি ছবি দ্য ডিসেন্টের সাথে শেয়ার করেছে একটি সূত্র। ছবিতে দেখা যায়, গত ২৪ আগস্ট মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে আয়োজিত জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন শেষে সংবাদমাধ্যমের বুম হাতে (সংবাদমাধ্যমটিকে চেনা যায় না) একজন ব্যক্তি ব্যাগ গুছাচ্ছেন। দ্য ডিসেন্ট এই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি।

এখন টিভি ও নাগরিক প্রতিদিনের সাংবাদিকরা যে একসাথে বাগেরহাট গিয়েছিলেন তা স্পষ্ট হয় ১৭ আগস্ট নাগরিক প্রতিদিনের রাকিব হাসান এবং এখন টিভির শাহরিয়ার জামান দীপ দুজনেই একই সময় একই স্থানে দাঁড়িয়ে সুন্দরবনের ডাকাত দল ‘ছোটো সুমন’ বাহিনীর প্রধান সুমনের সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। ছোটো সুমনের সাক্ষাৎকার উভয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই প্রচারিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে কোস্টগার্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “এসব তথ্য আপনাকে কে দিয়েছে? আপনি আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেয়েছেন?”
তিনি ১৩ তারিখ ঢাকার আগারগাও থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে বাগেরহাট গিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রথমে চুপ থাকেন। এরপর আবারও প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি হেডকোয়ার্টারেই ছিলাম।”
সাংবাদিকদের সাথে তিনি বাগেরহাটে গিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি পারসোনাল নম্বরে আপনাকে কোন কিছু বলবোনা। আপনি অফিসিয়ালি আসেন, আপনাকে আমি ইয়ে করবো।”
এরপর তিনি কল কেটে দেন।
নাগরিক প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার (ক্রাইম) রাকিব হাসানকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, আমি আমাদের নিজস্ব গাড়িতে করে গিয়েছি। আমরা কোস্টগার্ডের কোনো ধরণের গাড়ি ব্যবহার করিনি এবং এই প্রতিবেদনটিও কোস্টগার্ডের স্পন্সর ছিলো না।”
দুই প্রতিবেদনের অনেক জায়গায় হুবহু মিল
এখন টিভি এবং নাগরিক প্রতিদিনের ‘অনুসন্ধান’ একই সময়ে সংবদ্ধভাবে করার প্রমাণ মিলে উভয় প্রতিবেদনেই। দুটি প্রতিবেদনের একাধিক স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে একসাথে নাগরিক প্রতিদিন এবং এখন টিভির বুম দেখতে পাওয়া যায়।

এছাড়াও প্রতিবেদন দুটিতে নেয়া সাক্ষাৎকারগুলোতেও একাধিক স্থানে হুবহু মিল পাওয়া যায়। কিছু জায়গায় একই ব্যক্তির একই এঙ্গেল থেকে শুট করা একই বক্তব্য হুবহু প্রচারিত হয়েছে দুই প্রতিবেদনে। সাক্ষাৎকারের বাইরেও একাধিক জায়গায় ফুটেজও হুবহু একই রকম।

যেমন- মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ডের পন্টুনে নিয়ে যেতে যে মাঝির নৌকা ব্যবহারের দাবি করা হয়েছিল, সেই মাঝি মান্নান শেখের বক্তব্য দুটি প্রতিবেদনেই অভিন্ন। একইভাবে, ছোট সুমনের সঙ্গে মিরাজের যোগাযোগ, টাকা সংগ্রহ ও অস্ত্র বহনসংক্রান্ত জবানবন্দিও হুবহু মিলে যায়। ছোট সুমনের নির্দেশে মিরাজের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনার বর্ণনাও উভয় প্রতিবেদনে একই।
এ ছাড়া, মিরাজের পরিবারের কথিত অপরাধমূলক ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজমুল হাওলাদারের বক্তব্য দুটি প্রতিবেদনেই একই ভিডিও ক্লিপ থেকে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় দুই প্রতিবেশীর বক্তব্যও হুবহু একইভাবে উভয় সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের বক্তব্য উল্টে গেল
সাধারণ পোশাকে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে দুইজন ব্যক্তি কর্তৃক মিরাজ শেখকে জোরপূর্বক নৌকায় তুলে কোস্টগার্ডের স্টেশনের দিকে নিয়ে যেতে দেখা প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন হলেন চায়ের দোকানদার আলামিন শেখ, মাঝি মান্নান শেখ ও স্থানীয় গৃহবধু সেলিনা বেগম।
গত ৩০ জুলাই দ্য ডিসেন্ট এর প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য আলামিন শেখ ও সেলিনা বেগমের সাথে কথা বলেছিলেন এই প্রতিবেদক। তখন আলামিন এবং সেলিনা বেগম বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন কীভাবে তাদের চোখের সামনে মিরাজকে কোস্টগার্ড পরিচয় দেয়া দুই ব্যক্তি ধরে নিয়ে নৌকায় উঠিয়ে নদীতে থাকা কোস্টগার্ডের স্টেশনের দিকে যান।
কিন্তু এখন টিভি ও নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তারা উল্টো কথা বলছেন।
দুটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আলামিন শেখকে বলতে শোনা যায়, “আট-দশ দিন পর তারা আমার কাছে এসেছে। দোকানে বসে আমার ভিডিওটা এনেছে (ধারণ করেছে)… আমারে আগে থাকতেই বলছে যে এভাবে এভাবে তুমি বলবা। তোমার বলার জন্য যাতে আমাদের পোলারে আমরা পাই। আমি নিজে নিজে ভেবে এ বক্তব্যটা তখন দিয়েছি যে কোস্টগার্ড নিয়ে গেছে আমি যে বলছি। এটা একদম বানোয়াট, আমি সাক্ষী রেখে বলতে পারি আল্লাহরে যে কোস্টগার্ড মিরাজরে ধরে নিয়ে গেছে আমি দেখিনি।”
আলামিন শেখকে আরও বলতে দেখা যায়, “এটা টোটাল একটা বানোয়াট, তারা নিজেরা সাজায়া বলতেছে, যদি বলে যে মোটরসাইকেল আমার কাছে ছিল বা রাখছে, তাইলে তারা একটা ছবি তুলে রাখতে পারত না?...এটা একটা বানোয়াট কথা, মিথ্যা কথা।”
আর সেলিনা বেগম আগের বক্তব্য পরিবর্তন করে এখন টিভিকে বলেছেন, “আমারে এসে চাপ দিয়েছে এটা বলে যে তুমি ফোন দিয়ে আনাইয়া কোস্টগার্ড দিয়ে ধরাই দিছো আমার ভাইরে। আর বলছে সাংবাদিক আনবো তুমি কিন্তু এসব বলবা নাইলে কিন্তু কেস দিবো। ফোন রেকর্ডস আছে, তুমি যদি না কও, তাহলে তোমারে মার্ডার কেস দিবো।”
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মান্নান শেখও তার বক্তব্য বদলেছেন। মান্নান শেখের নৌকায় করে মিরাজকে শ্যালা নদীর ওপর অবস্থিত বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা এর আগে মিডিয়াকে বলেছিলেন।
তবে এখন টিভি এবং নাগরিক প্রতিদিনের দুটি প্রতিবেদনেই মান্নান শেখকে বলতে শোনা যায়, “সাত-আট দিন পরে আমাকে মিরাজের স্ত্রী, মিরাজের মা, আর ওর বোন এসে বলতেছে, ভাই আপনার বোটে আমাদের মিরাজ নাকি পন্টুনে উঠছে? আমি কইছি না। মিরাজরে দেখিনি, আর কোস্টগার্ড আমাদের পাবলিকের বোট ব্যবহার করে না। … তখন (মিরাজের পরিবার) বলছে ভাই, আমার ছেলেটা তো কোস্টগার্ড নিয়ে গেছ…কান্নাকাটি করতেছে। তখন আমাকে বলে যে আপনি বোটে নিয়ে গেছেন মানে পন্টুনে উঠাই দিছেন এটা বললে হবে…ওরা এই জিনিসটা ইস্যু কইরা একটা ভিডিও তৈরি করছে। ভিডিও তৈরি করে এটা মোবাইলে ছাইড়ে দিছে।”
তবে মিরাজের বোন লিজা ইসলাম দাবি করেছেন আগে একাধিকবার তার কাছে মান্নান স্বীকার করেছিলেন যে, মিরাজকে কোস্টগার্ড তার নৌকায় উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
লিজা মান্নানের বক্তব্য একবার গোপনে রেকর্ডও করেছিলেন। তার সাথে মান্নান শেখের কথোপকথনের একটি ভিডিও এই প্রতিবেদককে পাঠান লিজা। তাতে স্থানীয় কয়েকজন নারী-পুরুষের সামনে মান্নান শেখকে বলতে শোনা যায়, “ঘটনা হইছে আমার ভাগনে রবিউল আছে না? ও বউ নিয়ে দুইজন উঠছে। আর হাসানও ছিল। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, ওরা (কোস্টগার্ড) ডাক দিয়েছে, আমি বোট থামিয়েছি। এরপর ওরা মিরাজকে (বোটে) উঠিয়েছে। আমি জানতাম না। এরপর ঠোটায় এসে শুনেছি ওখানে মিরাজ ছিল। এরপর ঘটনা পরিষ্কার হয়েছে। ওদের পন্টুনে (কোস্টগার্ডের) উঠিয়েছে, সেখানে তো কোস্টগার্ড ছাড়া কেউ যায় না।”
ভিডিওটি দেখুন এখানে।
চায়ের দোকানদার আলামিন শেখের বক্তব্যেরও রেকর্ড রয়েছে লিজার কাছে।
আলামিন শেখের সাথে লিজার কথোপকথনের একটি ফোন রেকর্ডিংয়ে লিজা ইসলামকে বলতে শোনা যায়, “মিরাজের গাড়ি কি আপনার কাছে রাখা? গাড়ি কি দেওয়া যাবে?” জবাবে আলামিন শেখকে বলতে শোনা যায়, “আমার ঐ গাড়িতে হাত দেওয়ার কোনো কায়দা নেই।” লিজা ইসলাম বলেন, “গাড়ি রেখে গেছে কে?” জবাবে আলামিন শেখ বলেন, “কোস্টগার্ড। আমারে বলছে, আপনি চলে যাওয়ার যান, কিন্তু গাড়ির যেন কিছু না হয়।”
ফোন রেকর্ডিংটা শুনুন এখানে।
এখন টিভি ও নাগরিক প্রতিদিনের দুটি প্রতিবেদনেই স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজমুল হাওলাদারের বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদনে নাজমুল হাওলাদারকে বলতে শোনা যায়, “মিরাজের স্ত্রী আর মিরাজের মা আমার কাছে এসেছিল পরের দিন রাতে। গিয়ে আমাকে বলেছে, আমার ছেলেটাকে কোস্টগার্ড নিয়ে গেছে। আমি তখন বলছি, নিয়ে যাবে কেন? সে কি কোনো অপারেশনে জড়িত? বলে তা তো বলতে পারি না। আমি বলি, অপারেশনে জড়িত না হলে কেউ কাউকে নেবে না।”
তবে দ্য ডিসেন্টের হাতে আসা আগের ফোনকলের একটি রেকর্ডে নাজমুল হাওলাদারকে বলতে শোনা যায়, “কোনো সমস্যা থাকলে আমারে বলবেন। ধইরে নিয়ে গেছে কোস্টগার্ডে। এটা তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। ও ওদের লগেই আছে। ও যতই অস্বীকার করুক। নিশ্চিত থাকো, ও (মিরাজ শেখ) ওদের (কোস্টগার্ডের) সাথে আছে।”
ভয় দেখিয়ে বক্তব্য পরিবর্তনের অভিযোগ মিরাজের বোনের
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, “কোস্টগার্ডের সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে যাতে মিরাজের পক্ষে কথা না বলে। যারা কথা বলেছে তাদেরও ভয় দেখিয়ে বক্তব্য পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে।”
লিজা বলেন, “দোকানদার আল-আমিন বলতেছে যে, আমাদের শেখানো কথা সে বলেছে। সেলিনা বলেছেন আমাদের হুমকিতে তিনি আগের কথাগুলো বলেছিলেন। আচ্ছা বলুন তো, আমাদের শেখানো কথার জন্য একটা বাহিনীর নামে মিথ্যা বলবে কেউ? এমনটা কি কখনো হতে পারে? কে শক্তিশালী এখানে? কোস্টগার্ড নাকি আমরা? কাদের ভয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা বক্তব্য বদলাচ্ছেন এটা বুঝা কি খুব কঠিন?”
তিনি বলেন, “অনেক মিডিয়ার কাছে এবং আমার কাছে এসব ব্যক্তিদের আগের বক্তব্যের রেকর্ড আছে। কিন্তু তারা এখন ভয়ে কথা বদলাচ্ছেন।”
গত মাসেও দ্য ডিসেন্টকে স্থানীয় তিনজন বাসিন্দা এবং একজন সাংবাদিক জানিয়েছিলেন, মিরাজকে নিয়ে কথা না বলার কারণে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে তাদের চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দৈনিক আজকের বাংলার মোংলা প্রতিনিধি শেখ তাইজুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার পর এ নিয়ে লেখালেখি করায় আমাদের ওপর নানানভাবে চাপ তৈরি করা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে।
দ্য ডিসেন্টকে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা বিভিন্নভাবে হুমকি পাচ্ছেন যাতে মিরাজের নিখোঁজের ব্যাপারে কোনো কথা না বলা হয়।
লিজা ইসলাম বলেন, “আমার ভাবি ইপিজেডে গার্মেন্টস এ কাজ করতো। ভাবি কাজ থেকে আসার পথে অনেকে ভাবিকে ফলো করতো। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিতো। শেষে আমার ভাবি চাকরি ছেড়ে দেন। আমাদের বাসায় গভীর রাতে এসে হুমকি দেওয়া হয়েছে বারবার। আমরা ভয়ে বাড়ি ছেড়ে আত্বগোপনে আছি। আমি ফোন বন্ধ রেখেছি, আপনি আমাকে সিমে কল দিলে পাবেন না, সিম বন্ধ করে হোয়াটসএপ চালাচ্ছি।”
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা অভিযোগ করেন, “মিরাজকে তুলে নিয়ে যেতে দেখা প্রত্যক্ষদর্শীরা রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারেনা। জঙ্গলে, কবরস্থানে রাত কাটাতে হচ্ছে।”
দুটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মিরাজের পরিবারের কোন বক্তব্য নেই
ঢাকা থেকে কোস্টগার্ডের আয়োজনে বাগেরহাটে গিয়ে একই বাহিনীর নৌযানে চড়ে চার দিন ধরে কথিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘মিরাজকে কোস্টগার্ড উঠিয়ে নিয়ে যায়নি’ বয়ানটি প্রতিষ্ঠা করতে বহু ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিলেও দুটি সংবাদমাধ্যমের কোনটিতেই মিরাজ শেখের পরিবারের কারো বক্তব্য নেয়া হয়নি।
বরং মিরাজের পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে অসত্য তথ্য দেয়ার অভিযোগ করেছেন লিজা ইসলাম।
এখন টিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, “ঘটনার সময় মিরাজের বোন উপস্থিত থাকার দাবি করলেও প্রযুক্তি বলছে ঘটনার সময় তিনি যশোরে অবস্থান করছিলেন।”
তবে লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “এই চার মাস ১৭ দিনের ভেতরে আমি একবারও কোথাও বলিনি যে, আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম। এমনকি আপনাদের দ্য ডিসেন্টেও নিউজ হয়েছে, তখনও আমি বলেছি আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। তারা আমার সাথে কথা না বলে কীভাবে আমার নামে কথাটা তুলে ধরল? আমি কি তাদেরকে বলেছি যে, আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম?”
মিরাজ শেখের গুম নিয়ে দ্য ডিসেন্ট গত ৩০ জুলাই একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। লিজা ইসলাম তখন বলেছিলেন, তিনি মিরাজ শেখকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
এখন টিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, “মিরাজের পরিবারের দাবি সন্ধ্যার আগে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বলছে মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার দিন সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটেও মিরাজের ফোনে একটি ফোনকল এসেছিল। সূত্র ধরেই সামনে আসে সুন্দরবনের একসময়ের আলোচিত নাম ডাকাত ছোটো সুমন।”
তবে গত মাসে দ্য ডিসেন্টকে মিরাজের মা, বোন, স্ত্রী এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিলেন, মিরাজ শেখ সন্ধ্যা ৭টার দিকে আলামিনের চায়ের দোকানে চা খেতে আসেন। এরপরই তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, মিরাজের পরিবার সন্ধ্যার আগে নয়, বরং সন্ধ্যার পরে মিরাজকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিল।
লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমরা এ পর্যন্ত একবারও বলিনি যে সন্ধ্যার আগে আমার ভাইকে তুলে নেওয়া হয়েছে। বারবারই বলা হয়েছে যে আনুমানিক সাতটার দিকে, তবে সন্ধ্যার পর, মাগরিবের পর। আর যদিও ৭টা এগারো মিনিটে কলে কথা বলা হয় সুমনের নাম্বারে, এটা কোস্টগার্ড কল করেছে কি না মিরাজের ফোন থেকে, এইটার নিশ্চয়তা কে দেবে? এবং সুমনের সাথে টাকা-পয়সার লেনদেনের কোনো সত্যতা বা প্রমাণ তারা দিতে পারেনি।”
গুমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা প্রতিবেদন নিয়ে এখন টিভির নিউজরুমে অস্বস্তি
‘মিরাজকে কোস্টগার্ড উঠিয়ে নিয়ে যায়নি’-- এমন বয়ান প্রতিষ্ঠায় কোস্টগার্ডের আয়োজনে নিজেদের টিম পাঠিয়ে ফরমায়েশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে এখন টিভির নিউজরুমে অস্বস্তি বিরাজ করছে।
দ্য ডিসেন্ট এই প্রতিবেদনের জন্য বিভিন্ন তথ্য ভেরিফাই করতে এবং এখন টিভির নিউজরুমের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন পদবীর অন্তত ১১ জন ব্যক্তির সাথে কথা বলেছে।
এর মধ্যে এখন টিভির সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আবদুল্লাহকে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, তিনি ঢাকার বাহিরে, পরে কথা বলবেন। পরে আর তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
কথিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের স্পন্সর করা কোন কন্টেন্ট ছিলো কিনা জানতে চেয়ে তুষার আবদুল্লাহর হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট পাঠালে তিনি তা সিন করলেও কোনো উত্তর দেননি।
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট শাহরিয়ার জামান দীপ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা কোস্টগার্ডের গাড়ি ব্যবহার করিনি, কোস্টগার্ডের কোনো নৌযানও ব্যবহার করিনি। আমরা সেখানে নৌকা নিয়ে গিয়েছিলাম এবং এলাকার লোকজন তা দেখেছেন। আমরা যদি কোস্টগার্ডের নৌযান নিয়ে যেতাম, তাহলে এলাকাবাসী কিন্তু তা দেখতেন। আমরা ঘটনাস্থলে নৌকা নিয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন টিভি কখনোই পৃষ্ঠপোষকতায় কোন অনুষ্ঠান করে না। শুধু কোস্টগার্ড কেন, অন্য কেউ টাকা দিয়ে কিছু করাতে চাইলেও এখন টেলিভিশন সে ধরনের কিছু প্রচার করে না। আর আমি যখন কোনো বিষয়ে অনুসন্ধান করতে যাই, তখন আমার নিজের অনুসন্ধানে যা উঠে আসে, সেটাই তুলে আনি। কারও দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমি অনুসন্ধান করি না। এটাই অনুসন্ধানের নিয়ম। কারণ সত্য তুলে আনাই হচ্ছে অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য।”
বাকি ৯ জন সংবাদকর্মীর সবাই নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
বিভিন্ন পদবীর এই ৯ সংবাদকর্মীর প্রত্যেকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠানে মিরাজ শেখের গুমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ফরমায়েশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া নিয়ে অস্বস্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, অফিসে বাকিদের মধ্যে সিনিয়র জুনিয়র অনেকেই তাদের ক্ষোভের কথা প্রকাশ করেছেন।
এখন টিভির একজন সংবাদকর্মী বলেছেন, “এই রিপোর্ট যাওয়ার পর নিউজরুমের প্রায় সবাই বিরক্ত হয়েছেন। বিশেষ করে একটা বাহিনীর স্পন্সরে ট্যুরে গিয়ে একটা গুমের ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিষয়টি অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি।”
এই প্রতিবেদনের জন্য প্রতিবেদককে কার পক্ষ থেকে এসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছিল তা জানতে চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট অন্তত তিনজন সিনিয়র সংবাদকর্মী জানান, এসাইনমেন্ট ডেস্ক থেকে এই প্রতিবেদনের জন্য কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
তিনটিই সূত্রই বলেছে, এই এসাইনমেন্ট এডিটোরিয়াল হেড তুষার আব্দুল্লাহ নিজেই দিয়ে থাকতে পারেন।
একজন বলেছেন, “শাহরিয়ার জামান দীপ সরাসরি তুষার আব্দুল্লাহর অধীনে কাজ করেন। দীপ নিউজ টিমের লোক নন। সম্প্রতি তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে একটি ক্রাইম শো শুরু করার জন্য। চলতি আগস্ট মাসে তার নিয়োগের পরে কখনো এসাইনমেন্ট ডেস্কের রোটাতে তার নাম ছিল না।”
আরও দুইজন দীপের নিউজ টিমে না থাকার তথ্য সঠিক বলে নিশ্চিত করেছেন।
ভিন্ন আরেকজন সংবাদকর্মী বলেছেন, “স্ক্রিপ্টে তুষার ভাইয়ের ছোঁয়া আছে, মনে হচ্ছে। সকল গণমাধ্যম যখন এই ঘটনাকে গুম বলছে, তখন গুমের পক্ষে ন্যারেটিভ উৎপাদনের জন্য মাঠে নেমেছে এখন টেলিভিশন।”
তিনি আরও বলেন, “এ রিপোর্টে সবাই মিরাজের এবং মিরাজের পরিবারের বিপক্ষে কথা বলেছে, কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের কারো বক্তব্য নেয়া হয়নি।”
একাধিক সংবাদকর্মী জানান, এখন টিভির অফিসিয়াল নিয়ম হচ্ছে কোন প্রতিবেদক কোন এসাইনমেন্টে গেলে অফিসের গাড়ি নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু বাগেরহাটে মিরাজ শেখের ঘটনায় প্রতিবেদক ও ভিডিও জার্নালিস্ট অফিসের গাড়ি নেননি।
“সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা ভূলুণ্ঠিত”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খোরশেদ আলমের কাছে কোস্টগার্ডের ব্যবস্থাপনায় দুই গণমাধ্যমের ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ এর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “আপনি আমাকে যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেসব তথ্য ঠিক থাকলে আমি বলব, এটা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে যখন কোনো সাংবাদিক অনুসন্ধান করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মধ্যে একধরনের পক্ষপাত কাজ করে। তিনি তো তাঁদের সহায়তা নিচ্ছেন, তাঁদের নৌযান ব্যবহার করছেন, হোটেলের বিল তাঁরা পরিশোধ করছেন এবং আরও কিছু বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেন। ফলে যাঁদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান—হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যেটা বলছে—সেদিক থেকে দেখলে আমি বলব, এটা সাংবাদিকতার নিয়ম, কাঠামো ও নীতিমালার পরিপন্থী কাজ। এটাকে আমরা লেজুড়বৃত্তিক সাংবাদিকতা বলতে পারি।”
অভিযুক্ত কোস্টগার্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি কোনো প্রতিবেদন করা বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী রেজাউল করিম লেনিন বলেন, “এটা একটি গুরুতর অপরাধ। প্রথম ঘটনাটি হলো, বাংলাদেশে যখন কারও সামনে থেকে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন এখানে প্রত্যক্ষদর্শী আছেন। এখানে কোস্টগার্ডের প্রতিনিধিদের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যও রয়েছে। তাহলে তুষার আবদুল্লাহসহ অন্যরা কীভাবে এমন একটি বাস্তবতার মধ্যে ঢুকলেন এবং কোস্টগার্ডকে রক্ষা করতে গেলেন? সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার অসম্ভব রকমের ভূলুণ্ঠিত অবস্থা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। হলুদ রং ব্যবহার করে কি তাঁরা হলুদ সাংবাদিকতা করছেন—প্রশ্নটি সেটাই।”
কী হয়েছিল মিরাজ শেখের সঙ্গে?
বাগেরহাটের মোংলার জয়মণি ঠোটা গ্রামের বাসিন্দা মিরাজ শেখ (৩০) সুন্দরবনে মাছ ও মধু সংগ্রহের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি বাড়ির পাশের আল আমিনের চায়ের দোকানে যান। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল আলমের সঙ্গে কথা বলার সময় নদীর মাঝখানে থাকা কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশন থেকে একটি ছোট নৌকা তীরে আসে। নৌকায় মাঝি মিজান শেখ ছাড়াও সিভিল পোশাকের দুই ব্যক্তি ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই ব্যক্তি মিরাজের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে ধরে জেটির দিকে নিয়ে যান। মিরাজ কারণ জানতে চাইলে তাঁকে মারধর করা হয়। প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মিটার দূরের জেটিতে নিয়ে মান্নান মাঝির নৌকায় তুলে তাঁকে হাড়বাড়িয়া স্টেশনের পন্টুনে নেওয়া হয়। পরে কোস্টগার্ডের পোশাক পরা কয়েকজন সদস্য একটি স্পিডবোটে করে মিরাজকে মোংলার দিকে নিয়ে যান।
দ্য ডিসেন্ট মিরাজের স্ত্রীসহ সাতজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে এবং তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভিডিও সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সোহেল আলম বলেন, নৌকাটি কোস্টগার্ডের পন্টুন থেকে এসেছিল এবং সেখান থেকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ নেই। গৃহবধূ মোছাম্মত সেলিনা জানান, পন্টুনে নেওয়ার পর মিরাজকে কালো কাপড় দিয়ে আড়াল করা হয়। পরে তাঁকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তোলা হয়।
চায়ের দোকানদার আল আমিন জানান, মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার ১০–১১ দিন পর রাত চারটার দিকে কোস্টগার্ড পরিচয় দেওয়া কয়েকজন মিরাজের মোটরসাইকেল নিয়ে যান। তাঁদের একজন নিজের নাম রবিন বলেছিলেন। তবে পরে কোস্টগার্ড মোটরসাইকেল নেওয়ার কথা অস্বীকার করে।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামীকে নৌকায় তুলে নিয়ে যেতে দেখেন। এরপর থেকে মিরাজের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
কোস্টগার্ড অবশ্য মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ছোট সুমন বাহিনীর এক সদস্যের জবানবন্দিতে মিরাজের নাম পাওয়া গিয়েছিল। ২২ এপ্রিল তাঁকে খোঁজা হলেও পাওয়া যায়নি। পরিবার ২৩ এপ্রিল জিডি করায় বিষয়টি সন্দেহজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিরাজের পরিবার বলছে, চারবার থানায় যাওয়ার পর জিডি নেওয়া হয় এবং পুলিশের লিখে দেওয়া জিডিতে চায়ের দোকান থেকে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে বাড়ির নিচ থেকে হারিয়ে যাওয়ার কথা লেখা হয়। পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, মিরাজের সন্ধানে তদন্ত চলছে, তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।
মিরাজের সন্ধান দাবিতে জুনে পরিবার ও গ্রামবাসীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোস্টগার্ডের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পন্টুন ও স্পিডবোট ভাঙচুরের ঘটনায় মিরাজের মা, স্ত্রী ও বোনসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা ২৭ দিন কারাগারে ছিলেন।