রূপকথার গল্পে অনেক ভূত-প্রেতের কথা আসে। যারা এক নিমিষেই সাবাড় করে দিতে পারে অনেক কিছু। রূপকথার সেই 'ভূত'ই যেন জেঁকে বসেছে রেলে। যেই 'ভূত' যেখানেই গেছেন, সেখানকার তলাই রীতিমত ফাঁকা করে এসেছেন। যারা রেলের টুকটাক খোঁজ রাখেন, তারা হয়ত বুঝে গেছেন সেই 'ভূত'র নাম আফজাল হোসেন। যিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি)।
যমুনার অনুসন্ধানে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে অভূতপূর্ব আর্থিক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ডিজি আফজালের তদারকিতে এই প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩শ' ৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে বলে সরকারি অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্পটি পরিচালনা করার সময় আফজাল হোসেন ছিলেন প্রকল্প পরিচালক।
সরকারি অডিট নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে অনিয়মের এক ভয়ংকর চিত্র। এই অনিয়ম সংক্রান্ত অডিট নিষ্পত্তি না হতেই ঠিকাদাররা বেশিরভাগ টাকা তুলে নিয়েছেন। অথচ যার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ, সেই আফজাল হোসেন অডিটর টিমের দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রকল্পটির ৪২টি ধাপে চিহ্নিত করা অনিয়মের মধ্যে সবচেয়ে বড় অডিট আপত্তি ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত নতুন রেললাইন স্থাপনে বাঁধ নির্মাণের কাজে। মূল চুক্তিতে বাঁধের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭.৩ মিটার এবং চুক্তির মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল ১১ হাজার ১শ ৩৮ কোটি টাকা।
কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই নকশায় করা হয় পরিবর্তন। বাঁধের উচ্চতা কমিয়ে ফেলা হয় ৫.৬ মিটারে। যা মূল পরিকল্পনার চেয়ে ১.৭ মিটার কম। এর পরেও ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয় সম্পূর্ণ চুক্তিমূল্য। এই একটি অনিয়মেই সরকারের আর্থিক ক্ষতি ২ হাজার ১শ' ৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
বাঁধের উচ্চতা হ্রাসের পাশাপাশি এর নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ। রেল পরিদর্শন অধিদফতরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে বাঁধ তৈরিতে প্রয়োজনীয় পাথরের চাঙড় বা ভাঙা পাথরের কোনোটাই পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে ভাঙা ইট। যমুনা টিম সরেজমিনে হালকা মাটি খুঁড়েও বিষয়টি পরীক্ষা করার চেষ্টা করে। যেখানেও অভিযোগের পুরোপুরি সত্যতা মেলে।
এই অনিয়মের ফলে বাঁধের বিয়ারিং ক্যাপাসিটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেলের এমব্যাংকমেন্ট বা বাঁধটির ধারণক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। সরকারি অডিট রিপোর্টে এই অনিয়মের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অবৈধভাবে ২৫ কোটি টাকার সুবিধা প্রদান করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক রেল পরিদর্শক মো. রমজান আলী বলেছেন, স্টোন চিপস এবং গ্রেভেলের পরিবর্তে ব্রিক খোঁয়া ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ স্টোন চিপস এবং গ্রেভেলের দাম বেশি। আর ব্রিক খোঁয়ার দাম কম। এখানে ঠিকাদারকে অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন যোগসাজশে এই অপকর্মগুলো করেছেন।
লাইনের স্লিপারের উপরে দেওয়া পাথর নিয়েও রয়েছে আপত্তি। মরা পাথরের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ইটের খোঁয়া।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প ছাড়াও আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে চীন থেকে ১০০টি নতুন রেলকোচ আমদানিতে শত কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকও ছিলেন আফজাল হোসেন। উচ্চমূল্যে আমদানি করা এই কোচগুলি পরীক্ষামূলক চালানোর সময়েই চাকায় ফাটল দেখা যায়।
কোচগুলি এখন অন্য একটি লাগেজ ভ্যানের চাকা ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে।
রেলের ডিজি আফজাল যেখানেই গেছেন, সেখানেই নিজের চতুরতা আর অনিয়মের ছাপ রেখে এসেছেন। খুলনা থেকে মোংলা পোর্ট পর্যন্ত রেল সংযোগ প্রকল্পেরও প্রকল্প পরিচালক ছিলেন তিনি। সেখানেও শত কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে।
ডিজির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে যমুনা টেলিভিশন মুখোমুখি হয় আফজাল হোসেনের। তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। কোচ কেনায় অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এই কোচগুলি নির্দিষ্ট একটি নতুন রেললাইনের জন্য কেনা হয়েছিল। কিন্তু এগুলি অন্য রুটে চালানো হয়েছে যেখানে এই মানের কোচের প্রয়োজন ছিল না। তবে এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে।
এত বড় অনিয়মের পর আফজাল হোসেন কীভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ পেলেন, এটি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। তৃতীয় গ্রেড থেকে তিনি মহাপরিচালক পদে চলে যান। যা প্রথম গ্রেডের পদ।
বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নিয়ে তাকে পেয়েছেন ডিজি হিসেবে। আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান আছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর যদি তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে, তাকে পুরস্কৃত করার কোনো মানে হয় না। তিনি ঠিকাদারকে যে সুবিধা দিয়েছেন, সেই সুবিধার কিছু অংশ যে প্রকল্প পরিচালক নেননি, তা কিন্তু বলা যাবে না। তাই তার বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে তদন্ত হওয়া জরুরি।