তীব্র সংকটে দিশা হারায় মানুষ। খোঁজে আশার আলো। সরকারও তাকিয়ে ছিল রূপপুরের দিকে— আশা, সেপ্টেম্বরে মিলবে পারমাণবিক বিদ্যুতের ঝলক। সেখানেও এখন আঁধার। ‘সেফটি ভালভ’ নামের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র দেড় মাসেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। নতুন ভালভ ছাড়া এগোনোর পথ নেই। সেটি আনতে লাগবে কয়েক মাস। সঙ্গে বাকি পড়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। ফলে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রটি চালু করতে এরই মধ্যে অনেক বেশি সময় লেগে গেছে। দেশের স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা দরকার।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলেছেন, “এই মুহূর্তে বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং ব্যয় কমাতে রূপপুরের বিদ্যুৎ ‘ফরজ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বিদ্যুতের দামের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও কমাবে। আরও আগেই কেন্দ্রটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও নানা অজুহাতে এ কেন্দ্রের সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় নিষ্ক্রিয়। সময়মতো এ বিদ্যুৎ না আসায় জাতীয় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করছে।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে গত সোমবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের (রুটিন দায়িত্ব) ড. এম মঈনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। প্রকল্প পরিচালক মো. কবির হোসেনের বক্তব্য জানার জন্য গত দুদিনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রূপপুর অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো নয়। সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই বলা যাবে কবে উৎপাদন শুরু হবে। এর আগে নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেফটি ভালভ রিঅ্যাক্টরের ভেতরের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। কুলিং সিস্টেমে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে বাড়তি চাপ নিরাপদে নিষ্কাশন করে। ফলে পাইপ ফেটে যাওয়া বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এ যন্ত্র। প্রতিটি সম্ভাব্য বিপদের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে।
রূপপুরে বর্তমানে মূলত এ সেফটি ভালভ নিয়েই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পরমাণু শক্তি কমিশন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে নানা উপায়ে চেষ্টা করেও ভালভটি গুণগত মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। এখন বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আবারও পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা চলছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরের মতো অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সেফটি ভালভ মূলত ইউক্রেন, তুরস্ক ও জার্মানি তৈরি করে। শুরুতে ইউক্রেনে এটি তৈরির কার্যাদেশ দেয় রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে উৎপাদন ভেস্তে যায়। পরে তুরস্ক থেকে এটি আনা হয়।
এখন নতুন করে আরেকটি সেফটি ভালভ আনার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। তবে এ ধরনের ভালভ তৈরি করতে সাধারণত ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে। ফলে বর্তমান ভালভটি কাজে লাগানো না গেলে নতুনটির জন্য ওই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর বর্তমান ভালভটি কাজে লাগানো গেলেও উৎপাদনে যেতে সময় লাগবে প্রায় আড়াই মাস। কারণ সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতেও ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের দুই কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে এ বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদা গড়ে ১৬ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ১০ আগস্ট লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছিল। পরে তা কমলেও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় কারখানাগুলোতেও গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ায় লোকসান ও ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
এ অবস্থায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর উৎপাদনে এলে সংকট অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি মাসে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রূপপুরের বিদ্যুতের দাম এখনো নির্ধারণ না হলেও এলএনজি, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় এটি সস্তা হবে।
রূপপুরে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে টানা প্রায় দেড় বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এরপর জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। নির্মাণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রথম দুই চালান অর্থাৎ তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান টিভিইএল।
রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। মূল সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে দফায় দফায় সময়সীমা পিছিয়েছে।
এরপর অন্তত সাতবার সময়সীমা পেছানো হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে গত ১২ মে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশের কাজ শেষ হয়। তখন বলা হয়েছিল, চলতি মাসে প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পরে উৎপাদনের সময় আগামী মাসে পিছিয়ে নেওয়া হয়। এখন সেটি নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রথম ইউনিট পিছিয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় ইউনিটের সময়সূচিও পিছিয়ে পড়ছে।
কেন্দ্রটি চালুর পর টানা সাত থেকে আট মাস পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নানা পরীক্ষা চলবে। এরপর পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। দুটি ইউনিট চালু হলে রূপপুর থেকে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি লোডিংয়ের ৪৫ দিনের মধ্যে রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু হওয়ার কথা। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তিন মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হওয়ার নিয়ম। সে হিসেবে জুলাইয়ের শেষে না হলেও আগস্টে উৎপাদন শুরুর কথা। একই প্রযুক্তির বেলারুশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন মাসের কম সময়ে গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হয় এবং পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে আরও প্রায় সাত মাস লাগে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরের প্রযুক্তি পরীক্ষিত হলেও বাংলাদেশে এমন জটিলতা দেখা যায়নি। অতিরিক্ত যন্ত্রাংশের মজুদ, প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান পরিচালক মো. কবির হোসেনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন। শুরু থেকেই এ নিয়োগ নিয়ে আপত্তি ছিল। তিনজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এ কেন্দ্রটির মেয়াদ চার বছর বাড়লেও চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। উৎপাদনে দেরি হওয়ায় কেন্দ্রটির বিভিন্ন যন্ত্রপাতির স্বাভাবিক আয়ুষ্কালও কমছে। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে না আসায় বাংলাদেশ আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ফলে রূপপুর এখন শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এটি বড় প্রত্যাশার নাম। কিন্তু বারবার সময় পেছানোর পরও উৎপাদনে যেতে না পারায় সে প্রত্যাশাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।