২০১৮ সালের জুলাই। দেশের তৎকালীন বিরোধীদল বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড অ্যালেক্স কার্লাইল দিল্লি গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে কথা বলা। কিন্তু দিল্লির বিমানবন্দর থেকেই তাকে ফিরিয়ে দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এর প্রায় আট বছর পর, ২০২৬ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারত থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেন। দুই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান অনেক। রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। তবে ভারতের অবস্থানের পার্থক্যটি এখন আলোচনায় এসেছে।
২০১৮ সালের ১১ জুলাই রাতে লর্ড কার্লাইল লন্ডন থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে তাকে ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে তাকে লন্ডনের ফিরতি বিমানে তুলে দেওয়া হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন জানায়, কার্লাইলের ভিসা তার সফরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তার নির্ধারিত কর্মসূচির মধ্যে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনও ছিল।
লর্ড কার্লাইলের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তিনি দাবি করেছিলেন, তার ভিসা বৈধ ছিল এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সরকারের চাপের কারণেই ভারত তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে কথা বলতেই তিনি দিল্লি গিয়েছিলেন।
তখন ঢাকার পক্ষ থেকে কার্লাইলের ভারত সফর নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কর্মকর্তারা ভারতীয় কূটনীতিকদের কাছে কার্লাইলের দিল্লির কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। তার সংবাদ সম্মেলনকে ‘বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে দেখছিল ঢাকা। ভারতের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু মহলও তার কর্মসূচি নিয়ে আপত্তি তুলেছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মুখপাত্র রবীশ কুমারও বলেছিলেন, কার্লাইলের ভিসার জন্য দেওয়া উদ্দেশ্যের সঙ্গে ভারতে তার পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের মিল ছিল না। তার সফর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
ঘটনাটি দেশের গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। ডেইলি স্টার ২০১৮ সালের ১২ জুলাই জানায়, বিএনপি কার্লাইলকে ভারতে ঢুকতে না দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। দলটির সেই সময়ের মহাসচিব ও আজ শপথ নেওয়া রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তখন বলেছিলেন, ঘটনাটি ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সেই ঘটনার সঙ্গে ২০২৬ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাটির তুলনা এখন সামনে আসছে। ওই দিন দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানান। আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান এবং রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে।
এবার ভারতের বক্তব্য ছিল, অনুষ্ঠানটি ভারত সরকার আয়োজন করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এটি একটি বেসরকারি আয়োজন এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ইন্ডিয়া টুডে ভারতের এই অবস্থান প্রকাশ করে।
তবে বক্তব্যটি ভারতের মাটি থেকে হয়েছে। এ কারণেই ঢাকার প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, ভারত থেকে শেখ হাসিনার এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত। সরকার দিল্লির কাছে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানায়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এখানে ২০১৮ সালের ঘটনার সঙ্গে ২০২৬ সালের ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার আইনজীবীকে ভারতে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। তার সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগও হয়নি। ২০২৬ সালে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। ভারত সরকার অবশ্য বলেছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে এরপরও দিল্লির সামগ্রিক অবস্থানকে শুধু ৫ আগস্টের ঘটনাটি দিয়ে বিচার করা যাচ্ছে না।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ ভারত পেয়েছে এবং বিষয়টি তারা আইনি প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করছে বলে জানিয়েছে। এখনো তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। রয়টার্স আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট) জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ শিবলী বলেছেন, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক আসামিকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
এই অবস্থানের শুরু অবশ্য তারেক রহমান সরকারের আমলে নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তুলেছিলেন। ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ইউনূস-মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পরদিন, ৫ এপ্রিল ২০২৫, ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাবে মোদির প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক ছিল না। তবে ভারত তখনও বিষয়টি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
এরপর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও একই প্রশ্ন সামনে রয়েছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে আসছে। ভারত বলছে, অনুরোধটি তারা পরীক্ষা করছে। এ অবস্থায় দিল্লির অবস্থানে মূল কোনো পরিবর্তনের ঘোষণা এখনো দেখা যায়নি।
বরং শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের বক্তব্যের পরও ভারতের পক্ষ থেকে তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর আগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ইন্ডিয়া টুডে বলেছে, দুই দেশই সম্পর্ককে নতুন করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
ভারত একই সঙ্গে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪ আগস্ট জানায়, ব্রিকস সম্মেলনের বাইরে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত সেই সফর চূড়ান্ত হয়নি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট তারিখের কথা প্রকাশ পেলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা নিশ্চিত করা হয়নি। রয়টার্সকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
এর মধ্যেই আজ ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানানো হয়, ২২ আগস্ট নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান হবে না। কারণ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়ার কথা বলা হয়। পরে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ ঘটনা প্রকাশ করেছে। সফর চূড়ান্ত না হওয়ার কথা ঢাকার পক্ষ থেকে জানানোয় বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের ঘটনাটি আরও আলোচনায় এসেছে।
এদিকে ১৬ আগস্ট রয়টার্স জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার বিষয়টি নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য আরও অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন বলে বাংলাদেশ জানিয়েছে। ভারতও বলেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা আইনি কাঠামোর মধ্যে পরীক্ষা করছে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থানের আরেকটি দিকও স্পষ্ট। দিল্লি তার বক্তব্যকে নিজেদের সরকারি বক্তব্য হিসেবে নেয়নি। কিন্তু তাকে ভারত থেকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ বন্ধও করেনি। এ কারণে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি শেখ হাসিনার বিষয়ে দিল্লির আগের অবস্থানও বহাল রয়েছে বলে ঘটনাগুলো থেকে দেখা যায়।
এখানে একটি তথ্যগত বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। নির্ভরযোগ্য দেশি-বিদেশি প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি যে তারেক রহমানের সরকার ভারতকে শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছে। বরং ২০২৬ সালের আগস্টে সরকারের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়েছে এবং দিল্লির কাছে আপত্তি জানানো হয়েছে। রয়টার্স, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে এর বিপরীত তথ্যই পাওয়া যায়।
তাই ২০১৮ থেকে ২০২৬—দুই ঘটনার সরকারি বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ভারতের নীতিতে একটি বিষয় এখনো অপরিবর্তিত। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০২৫ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিষয়টি মোদির কাছে তুলেছিলেন। ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সরকারও একই বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মাঝেই শেখ হাসিনা ভারত থেকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার আইনজীবীর দিল্লি সফর ঠেকাতে ভারত বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের আপত্তিকে গুরুত্ব দিয়েছিল। ২০২৬ সালে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ক্ষেত্রে ভারত বলেছে, অনুষ্ঠানটি বেসরকারি এবং এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু বক্তব্যটি হয়েছে ভারতের মাটি থেকেই। দুই ঘটনার পার্থক্য এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট। আর শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান—অনুরোধ গ্রহণ, আইনি পর্যালোচনা এবং এখনো হস্তান্তর না করা—সেটিও একই সময়ে অব্যাহত রয়েছে।