সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে চুলা জ্বালাতে গিয়ে নাদিয়া আক্তার দেখলেন আগুন নেই। নাশতা বানাতে পারছেন না, সন্তানদের স্কুলের টিফিন বানাবেন কীভাবে? শেষ পর্যন্ত টিফিন ছাড়াই কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হলো। সন্তানের টিফিন বক্সেও গ্যাস সংকটের আঁচ লাগতে পারে আগে ভাবেননি নাদিয়া আক্তার।
শুধু নাদিয়া নন, গ্যাসের সংকটে ঢাকার বহু পরিবারের রান্না ঘরের চেনা রুটিন বদলে গেছে। ঘরের রান্নার বদলে বাড়ছে দোকান-রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরতা। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে সংসারের খরচ।
গ্যাস সংকট এলোমেলো করছে ঘরের রুটিন
‘আমার বাচ্চা এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। প্লে থেকে চেষ্টা করেছি বাচ্চাদের টিফিনটা সকালে নিজে বানিয়ে দিতে। কখনও বাইরের কিছু টিফিনে দেইনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সকালে উঠেই গ্যাস নেই। নাস্তা বানাতে পারি না, টিফিন বানাবো কী করে। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে দিই, যা পারে বাইরে থেকে কিনে খেতে বলি। গত কয়েক বছরে এতটা খারাপ অবস্থায় কখনও পড়িনি। নাস্তাটাও আজকাল বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে।’ বনশ্রীর বাসিন্দা নাদিয়া আক্তার এভাবেই তার দিন শুরুর গল্পটা বলছিলেন।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাথি আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার প্রতিদিনের রুটিন, সকালে উঠে নিজেদের ও বাচ্চার টিফিন বানাই। এরপর সবার জন্য দুপুরের খাবার রান্না করে রেখে অফিসে যাই। গ্যাসের অভাবে সব রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। নাস্তাটা কিনে চালাই, টিফিনের টাকা মেয়ের হাতে দিয়ে দিই, আর দুপুরের রান্নাটা রাতে গ্যাস এলেই করে রাখি। সেটা ওরা ওভেনে গরম করে দুপুরে খায়। মাঝে মাঝে তো এমন অবস্থা হয়, দুপুরের খাবারটাও কিনে খেতে হয়।’
নেই গ্যাস, বাড়ছে খরচ
রামপুরা উলনের বাসিন্দা নিহার আহমেদ বলেন, ‘গ্যাস না পেলেও গ্যাস বিল তো দিচ্ছিই। এখন আবার রান্না না হওয়ায় খাবারও কিনতে হচ্ছে। দুই খরচে মধ্যবিত্ত এবার পাগল হয়ে যাবে। বেতন তো বাড়েনি। এমনিতে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এখন আবার খাবারের এই বাড়তি খরচের টাকা জোগাড় করা হবে আরেক বোঝার মতো।’
বসুন্ধরা থেকে রেহানা সুলতানা বলেন, ‘এতদিন গ্যাসের সংকট থাকলে টিমটিমে গ্যাসে কোনোমতে রান্না করা যেতো। এবার অবস্থা আরও খারাপ। ফলে বাধ্য হয়ে একটা ইনডাকশন চুলা আর একটা রাইস কুকার কিনেছি। এখন আবার নতুন বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। সন্ধ্যার পর কয়েক দফা লোডশেডিং হয়েছে কালও। এদিকে এসব চুলায় বিদ্যুৎ বিল আসে বেশি। গ্যাসের বিলের সঙ্গে এখন আবার বাড়তি বিদ্যুৎ বিলও দিতে হবে আমাদের। একটা সংসারে সবকিছুর দাম বাড়ছে। এখন রান্নাটাও যেন বিলাসিতা হয়ে গেছে।’
একই ধরনের সমস্যায় পড়ে মানিকনগরের এক বাসিন্দা শেষ পর্যন্ত এলপিজি কিনে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে বলে জানা যায়। তিনি জানান, গ্যাসের বিলও দিচ্ছি আবার বাড়তি দামে এলপিজিও কিনতে হচ্ছে। সংসারের খরচ বাড়ছে দিনের পর দিন।
গ্যাস সংকটে কমেছে সরবরাহ
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) সাইদুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাসের চাহিদা ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এলএনজি সমস্যা হওয়ার আগে ২১ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস পাচ্ছিলাম। বুধবার এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন গ্যাস পাচ্ছি ১ হাজার ৭০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।
অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী, এখন তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাস ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০০ মিলিয়নের মতো। এর মধ্যে ঢাকায় তিতাস দিচ্ছে ১১৮-১১৯ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। আগে যেখানে সরবরাহ করা হতো ১৬০-১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এছাড়া বিদ্যুতে দিচ্ছে ২৬০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। অন্যদিকে সার কারখানায় তিতাস সরবরাহ করছে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
এদিকে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে ২০ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টার হিসাবে সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার ১৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশের দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসছে ১ হাজার ৬২৬ মিলিয়ন ঘনফুট, আর এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। দুই টার্মিনালের মধ্যে কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট বন্ধ থাকায় এটা শুধু সামিটের টার্মিনাল থেকেই আসছে। বিপরীতে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ।
চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেরে গেলো বিদ্যুৎ
পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু এর বিপরীতে গত সোমবার পাওয়া যায় ৯৩১ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অন্যদিকে, গতকাল বুধবার গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর সরবরাহ করা হয়েছে ৮৯২ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি) সূত্র জানায়, ১৯ আগস্ট রাত ৯টা থেকে ২০ আগস্ট বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের হিসাবে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। গতকাল রাত ৯টায় সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিয়ে শুরু হয়। এরপর রাত ১০টায় ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, রাত ১১টায় ১ হাজার ১৭৯ এবং মধ্যরাতে ১ হাজার ১৩৮ মেগাওয়াট। কাল দিনগত রাত ১টায় ঘাটতি ৯১২ মেগাওয়াট ও ২টায় ৬৯৬ মেগাওয়াটে নেমে এলেও আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবার বাড়তে থাকে। দুপুর ২টায় ১ হাজার ১৩৮, ৩টায় ১ হাজার ৭৭৪, ৪টায় ১ হাজার ৩৯৯ এবং বিকাল ৫টায় ১ হাজার ২৯৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। তবে এই সরকারি হিসেবের বাইরেও লোডশেডিং রয়েছে দেশে।