Image description

চলতি মাসেই পূর্ণ হলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মপরিকল্পনার ১৮০ দিন। বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলেও চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ যেমন প্রশাসন আকাক্সক্ষা করেছিল, তার দেখা মিলছে না। এখন পর্যন্ত অস্থিরতার মধ্যেই সময় পাড় করছে প্রশাসন। রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর আগের বিশৃঙ্খল প্রশাসনে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও কাজের ক্ষেত্রে ধীরগতি। আমলারা সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই সচিবরা ‘খেই’ হারিয়ে ফেলছেন। তবে সরকার গতি ফেরাতে কাজ করছে।

সরকারঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, সুন্দর করে দেশ সাজাতে পরিকল্পনামাফিক কাজ করছেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী একটানা ১২ ঘণ্টা, এমনকি তার চেয়ে বেশি সময় ধরেও কাজ করছেন। অথচ ৯-৪টা অফিস করেই হাঁফিয়ে উঠছেন কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত সময় কাজ করা বা উদ্ভাবনী কাজ করতে পারছেন না অনেকে। এ অবস্থায় বিগত ৬ মাসের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকার নতুন কর্মপরিকল্পনাও সাজাচ্ছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম তুলে ধরতে গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে শিগ্গিরই ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, সংস্কার কার্যক্রমকে কার্যকর করতে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আগে যথাযথভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। প্রশাসনের ভিতরে থাকা বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত ও দূর করার পরই সংস্কার কমিশনকে কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চান তাঁরা।

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন করার জন্য নির্বাচনি ইশতেহারে যে কথা বলা আছে, সরকার সে পয়েন্ট থেকে সরে আসে নাই। বরং সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। কিছু কিছু কাজ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসনকে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে সেখান থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে বিগত ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে সরকার। প্রসংগত, নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের শুরুতেই নানা কর্মকৌশল গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।

ভিভিআইপি প্রটোকল প্রত্যাহার, কৃচ্ছ্রসাধন-নীতি অবলম্বন, দুর্নীতি ঠেকাতে কঠোর মনোভাবসহ অতিসাধারণ চলাফেরার মতো কিছু প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নেন সরকারপ্রধান। তারেক রহমানের এমন নীতিতে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন মন্ত্রী-এমপিরা। জানা গেছে, সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের পরও কিছু ইস্যুতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয়। ফলে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাছে ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত ৬ মাস বড় একটা সময় নয়, আবার কমও নয়। তবে এই সময় পর্যন্ত প্রশাসনিক গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে যেতে পারেনি। বলা যায়, প্রশাসনে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা তেমন একটা কমেনি। কাজের ক্ষেত্রে রয়েছে স্লেøা গতি। হয় আমলারা কাজ করতে দিচ্ছেন না, নয়তো কীভাবে কাজ করবেন বুঝতে পারছেন না। কারণ প্রশাসনে এখনো দলীয়করণ আছে। যোগ্যদের সবসময়ই নানাভাবে হয়রানি করা হয়। তাদের বিভিন্ন দলের ট্যাগিংয়ের শিকার হতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনে অনেক আগে থেকেই দুষ্টচক্র আছে। এরা ক্ষমতার কাছে থেকে প্রশাসনকে ভুল পথে পরিচালনা করে। আগের চেয়ে এই দুষ্টচক্র দিনদিন শক্তিশালী হচ্ছে। ফলে দায়িত্বশীল লোকজন নিজের কাছের লোকদের দেখে মূল্যায়ন করে, দূরের কর্মীদের বিবেচনায় নেন না। এতে সঠিক মূল্যায়ন হয় না। আর নানা কারণে সরকারপ্রধান বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাছে সঠিক তথ্যও পৌঁছায় না। এজন্য প্রশাসন আরও নাজুক হয়। এখনো যদি সরকার সঠিক পরিকল্পনা নেয়, দক্ষ ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করে তবে কিছুটা আশার আলো দেখা যেতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারকে গত ছয় মাসে পুলিশ প্রশাসন ও বেসামরিক প্রশাসন ঠিক করতেও নানা কৌশল গ্রহণ করতে হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বেশ চ্যালেঞ্জে পড়তে হয় সরকারকে। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদী সরকারের সাজানো প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে কার্যক্রম চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হয়। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হয়েছে। অবশ্য বর্তমানে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও কাজের গতি সেভাবে ফেরেনি। শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে অফিস করার সিদ্ধান্ত নেন। এতে সচিবালয়ে অফিস ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। সকাল ৯টার আগেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কর্মস্থলে হাজির হওয়ার কারণে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সচিবদের নিয়ম মানাটা জরুরি হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করে একাধিক সচিব স্বীকারও করেন ভঙ্গুর প্রশাসনের কথা। তারা এটাও বলেন, রাজনৈতিক সরকার চেষ্টা করছে, তবে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ কেউ ‘অতি রাজনৈতিক মনোভাব’ নিয়ে প্রশাসনের গতিকে বাড়তে দিচ্ছে না।  এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুুল বারী বলেন, ‘ছয় মাসের জনপ্রশাসনের কাজের বিবরণ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।’  প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোটামুটি শৃঙ্খলা ফিরেছে। এখন সব জায়গায় কাজ হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতাসহ অফিসগুলোকে ফাংশন করানো। এখন মোটামুটিভাবে আমাদের অফিসগুলো ফাংশন করছে।’ কাজের গতি ফিরেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকেই ব্যক্তিগত মত দিয়ে থাকেন যে, কাজে গতি নেই। এটা মোটেও ঠিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের কর্মকর্তারা ভালোভাবে কাজ করছেন। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, খাল খনন সব কিছুতেই গতি আছে। জেলা উপজেলার অফিসগুলোতেও সমানতালে কাজ হচ্ছে।’