Image description

বিনিয়োগ বাড়িয়ে আগামী কয়েক বছরে অর্থনীতির গতি পাল্টে দিতে চায় সরকার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই করা হয়েছে নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। গতকাল বুধবার যাত্রা শুরু করল সেই পরিকল্পনার কৌশলগত রূপরেখা। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) করা কৌশলপত্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কৌশলপত্রটি মূলত একটি পঞ্চবার্ষিক আর্থিক ও সংস্কার পরিকল্পনা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেখানে সামষ্টিক অর্থনীতির যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো যেমন উচ্চাভিলাষী তেমনি বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। কেননা চলমান জ্বালানি সংকট, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতাসহ আছে নানা চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে আর্থিক খাতে সংস্কার যদি করা না যায়, তাহলে এসব লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব বলেই মনে করছেন তারা।

কৌশলপত্রটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বিনিয়োগ ধরা হয়েছে জিডিপির ৪০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা হবে ৫ শতাংশে।

কৌশলপত্রটিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে জিডিপির ১১ শতাংশ। উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

কৌশলপত্রের রূপরেখাটি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা একটি নির্দিষ্ট মডেল দিয়ে এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। অর্থাৎ যদি বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হয় এবং অন্যান্য বিষয় ঠিক থাকে, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হবে না। তবে জ্বালানি সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ আছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথও উল্লেখ করা আছে পরিকল্পনায়। আপনারা বলতেই পারেন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। সমালোচনাকে আমরা সাদরে গ্রহণ করছি। কিন্তু এই ফ্রেমওয়ার্কটি যেকোনো বাস্তব পরিস্থিতিতে পরিবর্তনও করা যেতে পারে। আমরা ওইভাবেই এটি তৈরি করেছি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘চলতি অর্থবছর যদি জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ করা যায়, তাহলে পরের অর্থবছরগুলোয় বাড়তেই থাকবে। সেক্ষেত্রে শঙ্কা থাকলেও সাড়ে ৮ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।’

রূপরেখাটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। সেখানে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে সেটি বেড়ে হবে ৭ শতাংশ। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে আরও বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৭ শতাংশে। এ ছাড়া ২০২৯-৩০ অর্থবছরে সাড়ে ৭ এবং পরিকল্পনার শেষ ২০৩০-৩১ অর্থবছরে গিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৮ শতাংশ।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির যেসব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেগুলো অর্জন করা অসম্ভব নয়। তবে আর্থিকসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার ছাড়া এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বিএনপি সরকার নব্বইয়ের দশকে ক্ষমতায় এসে যেমন আর্থিক বিভিন্ন সংস্কার এনেছিল, এবার যদি আরেক রাউন্ড সংস্কার করে, তাহলে ৮ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। কেননা, বাংলাদেশের পটেনশিয়ার গ্রোথরেটের সঙ্গে সংস্কারের সুফল যোগ হলে লক্ষ্য অর্জন হবে।’

ফ্রেমওয়ার্কে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে জিডিপির সাড়ে ৩৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছর ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৮, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ৬ এবং পরিকল্পনা শেষ অর্থবছরে বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়াবে ৪০ শতাংশে।

রাজস্ব আদায়: চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে সেটি একই থাকবে। কিন্তু ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে রাজস্ব আদায় বাড়তে শুরু করে ১১ শতাংশে যাবে। সেটি পরের দুই অর্থবছর অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ শতাংশই থাকবে।

ফ্রেমওয়ার্কে চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছর সেটি কমে দাঁড়াবে সাড়ে ৬ শতাংশে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সেটি আরও কমে হবে ৬ শতাংশ। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে সাড়ে ৫ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে গিয়ে ৫ শতাংশে নেমে আসবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেছেন, ‘সংস্কার ও উন্নয়নের পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত রূপরেখা’ (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১)-এর যাত্রা শুরু হয়েছে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে এ নতুন রূপরেখাটি এসেছে, যখন বাংলাদেশের জনগণ ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই সরকারকে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জন্য বিপুল ম্যান্ডেট দিয়েছে। এটি সরকারের ‘২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার’-এর অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, যেখানে আর্থিক ও বাজারসম্পদের বৃহত্তর প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় কৃষক, শ্রমিক, নারী উদ্যোক্তা, তরুণ স্নাতক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।