প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে এ সফর হওয়ার কথা। তবে সফরের আগে ঢাকা কিছু শর্ত সামনে এনেছে বলে জানিয়েছে ভারতের দুটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের দ্রুত পদক্ষেপ চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সফরের জন্য একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির কথাও বলেছে ঢাকা।
গতকাল রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের পথ এখন শর্তের বেড়াজালে আটকে গেছে। পত্রিকাটির ভাষ্য, দেশের ভেতরে বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং জামায়াতে ইসলামীর মিত্র হিসেবে পরিচিত জাতীয় নাগরিক পার্টির চাপের মধ্যে সরকার নয়াদিল্লির কাছে এসব শর্ত দিয়েছে। শর্তের কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশে মামলায় অভিযুক্ত অন্য পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও বিষয়টিকে একইভাবে দেখেছে। তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবিকে বাংলাদেশের ‘রেড লাইন’ বা ‘চূড়ান্ত সীমারেখা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকাটি বলেছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের ক্ষেত্রে এখন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে তারেক রহমান ভারত যাবেন না। বরং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দুই দেশের কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে সফর নিয়ে আলোচনা করছেন। সফরের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ নষ্ট হয়েছে শেখ হাসিনার দিল্লিতে প্রকাশ্য বক্তব্যের কারণে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেছেন, ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের মধ্যে সফর নিয়ে চলমান আলোচনার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তার বক্তব্যের পর বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
শুধু শেখ হাসিনার বিষয় নয়। শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। এ ক্ষেত্রেও দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে ঢাকা।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার নয়াদিল্লির কাছে তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছিল। পরে চলতি বছর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও সেই অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা প্রযোজ্য আইন ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।
এদিকে তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণটি এখনো বহাল আছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছিল, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে তাকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। পরে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের সম্প্রসারিত অধিবেশনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন হওয়ার কথা। ফলে তারেক রহমানের ভারত সফরকে ঘিরে সময়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের পক্ষ থেকে ২১ আগস্টকে দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে। তবে সেই তারিখে সফর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কয়েক দিন আগেও টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, তারেক রহমানের ভারত সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। সফরের সময় নির্ভর করছে তার সময়সূচি এবং দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম নবভারত টাইমসও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে ঢাকা একাধিক শর্ত জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে দুই দেশের সম্পর্ক, বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও সম্ভাব্য আলোচনার অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।
এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে তারেক রহমানের সফর নিয়ে কিছুটা আশাবাদও ছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছিল, সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি নির্ভর করছে দুই দেশের আলোচনার ওপর। অর্থাৎ সফরের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন মূল প্রশ্ন হলো, দরজার সামনে জমে থাকা কূটনৈতিক জট কতটা দ্রুত সরানো যায়।
শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলন এই জট আরও বাড়িয়েছে। তিনি দিল্লিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। এমনকি দেশে ফিরলে তার প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও বলেন। বাংলাদেশ সরকার তার এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যকে কঠোরভাবে নেয়। ঢাকার বক্তব্য, ভারতে অবস্থান করে এমন কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়।
ভারত অবশ্য বলেছে, ওই সংবাদ সম্মেলনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আগেই জানিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে। ভারত সরকার এতে জড়িত ছিল না। অনুষ্ঠানে যে মতামত প্রকাশ করা হবে, সেটিও ভারত সরকার সমর্থন করে না।
এই অবস্থায় দিল্লির জন্যও বিষয়টি সহজ নয়। একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজন। অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ রয়েছে। আবার সামনে রয়েছে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর এবং ব্রিকস সম্মেলন। সব মিলিয়ে একই টেবিলে একাধিক হিসাব করতে হচ্ছে ভারতকে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলেছে, নয়াদিল্লির একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারতকে একটি স্পষ্ট ও যুক্তিসংগত জবাব দিতে হবে। কারণ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকলে তা দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাপের কথাও এসেছে। পত্রিকাটির একটি রাজনৈতিক সূত্র বলেছে, জ্বালানিসংকটসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি ধীর হয়ে যেতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা থমকে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর হলে এসব বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। ফলে একটি রাজনৈতিক বিরোধ যেন পুরো সম্পর্ককে ছায়ায় ঢেকে না ফেলে, সেটিও দুই দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমান ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার চাপ অব্যাহত থাকলেও ভারত বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করছে।
অর্থাৎ পরিস্থিতি এখনো শেষ সিদ্ধান্তের জায়গায় পৌঁছায়নি। তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা একেবারে বাতিল হয়নি। ভারতের আমন্ত্রণও বহাল রয়েছে। কিন্তু সফরের আগে ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রত্যাশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন সেই প্রত্যাশার সবচেয়ে আলোচিত অংশ।
আগামী কয়েক দিন তাই গুরুত্বপূর্ণ। ২১ আগস্টের সম্ভাব্য সফর বাস্তবে রূপ নেয় কি না, তা নির্ভর করবে ঢাকা ও নয়াদিল্লির আলোচনার ওপর। আর সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলন সামনে রেখে দুই দেশ যদি কোনো সমঝোতার পথ খুঁজে পায়, তবে সেটি শুধু একটি সফরের দরজা খুলবে না। বরং দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যেও সম্পর্কের জন্য নতুন একটি জানালা খুলতে পারে।
আর যদি সেই সমাধান না আসে, তাহলে তারেক রহমানের সফর ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক প্রত্যাশা আরও কিছুদিন অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে। দুই দেশের সম্পর্ক তখন দাঁড়িয়ে থাকবে এক কঠিন প্রশ্নের সামনে—রাজনৈতিক অস্বস্তির মাঝেও কি বৃহত্তর স্বার্থে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব?