Image description
কারাগারের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হতে পারে। প্রয়োজন সুষ্ঠু তদারকি, যাতে তারা পরে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক জীবন পেতে পারে।

একটাই শ্রেণিকক্ষ। চারজন খুদে শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একটু বড় যে মেয়ে, সে গান শোনাল—‘মোরা যদি ডানাওয়ালা পাখি হইতাম/ ওই মদিনা দেখার লাগি উড়ে যাইতাম—’। মদিনা তো দেশের সীমানা পেরিয়ে বহু দূরের স্থান, তার চারপাশের উঁচু দেয়ালের ওপাশটা দেখতেও শিশুটির ‘ডানা’ই লাগবে। কেননা বাইরে পা রাখার অনুমতি নেই তার।

শ্রেণিকক্ষটি কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কাশিমপুর-৩)। সেখানেই মেয়েশিশুটির সঙ্গে দেখা। তার মা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি। কারাগারে আসার সময় তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে কারাগারের ভেতর একদিন হুট করে প্রসববেদনা ওঠে, তখন ভবনের বাইরে ছিলেন। সেখানেই ঘাসের ওপর জন্ম হয় মেয়েটির; কারারক্ষীরা ঘাসের সঙ্গে মিলিয়ে শিশুটির নাম রাখেন।

কারাগারের কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে ৪৮ জন নারী বন্দীর সঙ্গে ৫২টি শিশু রয়েছে। কোনো কোনো মায়ের একাধিক সন্তান। অনেক শিশুর জন্ম কারাগারে, বেড়ে ওঠাও সেখানে। বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই।
গাড়ি নিয়ে খেলছে দুই শিশু
গাড়ি নিয়ে খেলছে দুই শিশুছবি: মানসুরা হোসাইন

কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজনস) বিশেষ অনুমতি নিয়ে গত ১৪ জুলাই এই প্রতিবেদক কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে মা বন্দীদের সঙ্গে কথা বলেন। সেদিন কয়েকটি শিশুর সঙ্গেও দেখা হয়।

কারাগারের কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে ৪৮ জন নারী বন্দীর সঙ্গে ৫২টি শিশু রয়েছে। কোনো কোনো মায়ের একাধিক সন্তান। অনেক শিশুর জন্ম কারাগারে, বেড়ে ওঠাও সেখানে। বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই।

১৪ জুলাই কারাগারটিতে ৭০১ নারী বন্দী ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক—১৭০ জন হত্যা মামলার, ১৬৯ জন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত। ৩০ জন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

দেশে কারাগারগুলোতে ৩১২ শিশু

শিশুকে পড়াচ্ছেন এক কয়েদি
শিশুকে পড়াচ্ছেন এক কয়েদিছবি: মানসুরা হোসাইন

দেশে কারাগার রয়েছে ৭৪টি। এর মধ্যে মা বন্দীদের শিশুদের জন্য ২৫টি কারাগারে দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে ২৬টি। সেসব কারাগারে দিবাযত্ন কেন্দ্র নেই, সেগুলোয় মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের বিকাশ ও শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

১৬ জুলাই কারা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে, কারাগারগুলোয় মোট বন্দী ৯১ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে নারী ৩ হাজার ৪৮৭। এসব নারীর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ১ হাজার ১২০ জন এবং হাজতি (মামলায় গ্রেপ্তার বা মামলা বিচারাধীন) ২ হাজার ৩৫০ জন। মা বন্দীর সঙ্গে শিশু রয়েছে ৩০৬টি। এর মধ্যে ছেলেশিশু ১৬০ ও মেয়েশিশু ১৪৬টি। তবে ২৬ জুলাই শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১২–এ। বন্দী মায়ের সংখ্যা ২৯১। কোনো কোনো মায়ের একাধিক সন্তান কারাগারে। আবদ্ধ পরিবেশ ও ধারণক্ষমতার চেয়ে বন্দীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এসব শিশুকেও গাদাগাদি করে থাকতে হয়।

গত ১৬ জুলাই পুরান ঢাকায় কারা অধিদপ্তরের কার্যালয়ে কথা হয় কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মাকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে থাকতে হয়, সে ক্ষেত্রে আবদ্ধ পরিবেশে শিশুদের মানসিক উন্নয়ন ও বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে লক্ষ্যে দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। কারাবিধি অনুসারে, ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা মায়ের সঙ্গে থাকতে পারে। শিশুর বয়স ছয় বছর হলে এবং বাইরে তার লালন-পালন করার মতো কেউ না থাকলে, মায়ের অনুমতি নিয়ে ওই শিশুকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু পরিবারে হস্তান্তর করা হয়।

১৪ জুলাই কারাগারটিতে ৭০১ নারী বন্দী ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক—১৭০ জন হত্যা মামলার, ১৬৯ জন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত। ৩০ জন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

এক প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, দিবাযত্ন কেন্দ্রের জন্য শিক্ষক আছেন। বন্দীদের মধ্যে যাঁরা পড়ালেখা জানেন, তাঁরাও পড়িয়ে থাকেন। যেসব কারাগারে দু-একজন করে শিশু থাকে, সেখানে দিবাযত্ন কেন্দ্র নেই। তবে সেগুলোয় খেলাধুলার কিছু সরঞ্জামসহ কারাগারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিশুদের দেখভাল করা হয়।

শিশুর জন্য একই ব্যবস্থা

জন্মের পর মায়ের সঙ্গেই থাকে, বড় হয় শিশুরা
জন্মের পর মায়ের সঙ্গেই থাকে, বড় হয় শিশুরাছবি: মানসুরা হোসাইন

গাজীপুরের কাশিমপুরে পাশাপাশি চারটি কারাগার আলাদা সীমানাঘেরা। এর মধ্যে ৩ নম্বর কারাগার নারী বন্দীদের জন্য। সেটির প্রধান ফটক থেকে পাকা সড়ক সোজা ভেতরে চলে গেছে। কিছু দূর পরপর ডানে–বাঁয়ে গেছে শাখা সড়ক। গাছপালাঘেরা এলাকাটিতে ঢুকতে বাঁয়ে দুটি ডিভিশন ভবন, সেখানে বন্দী রয়েছেন ১২ জন। ডানে মা বন্দীদের সন্তানদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। আরেকটু এগোলে সাধারণ বন্দীদের ভবন কলমীলতা। সেখানে ১৪টি ওয়ার্ডে থাকেন বন্দীরা। মাধবীলতা নামের একটি সেল ভবন রয়েছে, সেখানে থাকেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীরা।

২০১৬ সালের ১৯ জুন জাতীয় সংসদে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কারাবিধি অনুযায়ী বন্দীদের ঘুমানোর জন্য ৩৬ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ।

দুই মাস বয়সী সন্তান কোলে এক মা জানান, তিনি সন্তান নিয়ে মেঝেতেই ঘুমান। পাশে থাকা একজন কারারক্ষী তখন বললেন, সন্তান রয়েছে, এমন মায়েদের জন্য একটু বেশি জায়গা দেওয়া হয়।

১৪ জুলাই কারাগারটিতে ৭০১ নারী বন্দী ছিলেন। অথচ ধারণক্ষমতা ২১২ জনের। সে ক্ষেত্রে একজন বন্দীর ভাগে মাত্র ১১ বর্গফুট জায়গা। মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে থাকতে হয়। মা বন্দীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই।

দুই মাস বয়সী সন্তান কোলে এক মা জানান, তিনি সন্তান নিয়ে মেঝেতেই ঘুমান। পাশে থাকা একজন কারারক্ষী তখন বললেন, সন্তান রয়েছে, এমন মায়েদের জন্য একটু বেশি জায়গা দেওয়া হয়।

চার দেয়ালের ভেতর শৈশব

শৈশব কাটে চার দেয়ালে
শৈশব কাটে চার দেয়ালেছবি: মানসুরা হোসাইন

একতলা দিবাযত্ন কেন্দ্রটির সামনে ছোট একটি মাঠ আছে। তবে মাঠে থাকা খেলার কিছু রাইডের দশা জীর্ণ। ভেতরে একটি কক্ষে ক্লাস চলছিল। একটি কক্ষ গ্রন্থাগার। আরেক কক্ষে কয়েকটি দোলনা। ভেতরের খোলা জায়গায় বিভিন্ন খেলনা নিয়ে শিশুরা খেলছিল। শ্রেণিকক্ষে চারটি শিশুকে পাওয়া যায়। পড়ার উপযোগী শিশু পাঁচটি বলে জানান শিক্ষক কারারক্ষী আমেনা আক্তার।

শ্রেণিকক্ষে কয়েদিদের (সাদা শাড়িতে নীল ডোরা) শাড়ি পরা একজন বয়স্ক নারীর সঙ্গে দেখা হয়, তিনি শিশুদের পড়াশোনায় সহায়তা করছিলেন। জানালেন, তিনি ডিগ্রি পাস, হত্যায় মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। ২০ বছর ধরে কারাগারে আছেন। যখন এসেছিলেন, তখন তাঁর দুই শিশুসন্তান ছিল। তারা আত্মীয়স্বজনের কাছে বড় হয়েছে।

প্রতিবেদনের শুরুতে যে শিশুর কথা বলা হয়েছে, সে ‘ওই দেখা যায় তালগাছ’ ছড়াটিও শোনাল। আরেকটি মেয়েশিশু শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ইংরেজি নাম দিয়ে একটি জনপ্রিয় ছড়া শোনাল। একটি ছেলেশিশু চুপ করে বসেছিল। জানা গেল, সে অন্য কারাগার থেকে এসেছে, সেখানে দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকায় পাঁচ বছরেও সে কিছু শিখতে পারেনি। এখানে আসার পর স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ পড়া ও লেখা শেখানো হয়েছে উল্লেখ করে কারারক্ষী আমেনা আক্তার বলেন, এখানে তিন বছর বয়স থেকে শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়া ও একটু বড় শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ের বাংলা, ইংরেজি, গণিত শেখানো হয়। আরবি শেখানো হয়। এ ছাড়া নাচ, গান, ড্রইং শেখানো হয়।

শ্রেণিকক্ষে কয়েদিদের (সাদা শাড়িতে নীল ডোরা) শাড়ি পরা একজন বয়স্ক নারীর সঙ্গে দেখা হয়, তিনি শিশুদের পড়াশোনায় সহায়তা করছিলেন। জানালেন, তিনি ডিগ্রি পাস, হত্যায় মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। ২০ বছর ধরে কারাগারে আছেন। যখন এসেছিলেন, তখন তাঁর দুই শিশুসন্তান ছিল। তারা আত্মীয়স্বজনের কাছে বড় হয়েছে।

কারাগারে আছে দিবাযত্নকেন্দ্র
কারাগারে আছে দিবাযত্নকেন্দ্রছবি: মানসুরা হোসাইন

গ্রন্থাগার কক্ষের পাশে লম্বা খোলা জায়গায় তখন চলছিল অন্য শিশুদের কিচিরমিচির। এক নারী খেলতে থাকা এক শিশুকে দেখিয়ে বললেন, এটি তাঁর সন্তান। বয়স ২ বছর ২ মাস। ওই মা জানান, একটি হত্যা মামলায় তিনি, তাঁর স্বামী ও ননদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এক বছর ধরে কারাগারে আছেন। সন্তানের সঙ্গে বাবার দেখা হয় কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হাজিরা দেওয়ার সময় আদালতে গেলে বাবার সঙ্গে সন্তানের দেখা হয়।

আরেক নারী তাঁর সন্তানকে দেখিয়ে বলেন, তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এসেছিলেন। কারাগারেই তাঁর সন্তানের জন্ম হয়েছে। সন্তান নিয়ে তিন বছর ধরে কারাগারে আছেন।

ঘাসের নামে নাম শিশুটির মা বললেন, তিনি ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। মেয়ে বাংলা, ইংরেজি পড়তে পারে। স্কুলে টিফিন হিসেবে বিস্কুট দেয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসক দেখানো হয়। মেয়েকে নিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশে বাস করার আকাঙ্ক্ষা উঠে আসে তাঁর কথায়। তিনি বললেন, তাঁর আগের একটি সন্তান মারা গেছে। আরেক মেয়ে বাবার কাছে থাকে। তিনি আবার বিয়ে করেছেন। এই মা জানান, তাঁদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করে না। মেয়ের বয়স ছয় বছরের বেশি হয়ে গেছে। যেকোনো সময়ে সরকার অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে। এমন কোনো আত্মীয় নেই, যার কাছে মেয়েকে রাখবেন।

আরেক নারী তাঁর সন্তানকে দেখিয়ে বলেন, তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এসেছিলেন। কারাগারেই তাঁর সন্তানের জন্ম হয়েছে। সন্তান নিয়ে তিন বছর ধরে কারাগারে আছেন।

আরেক নারী বন্দী বলেন, তিনি ২১ মাস ধরে সন্তানসহ কারাগারে। সন্তানের বয়স তিন বছর। দিবাযত্ন কেন্দ্রে পড়ালেখা করে। কারাগার থেকে সকালে ছেলেকে রুটি, চিনি, দুধ, কলা দেয়। দুপুরে ডাল, ভাত, মাছ দেয়। সপ্তাহে দুই দিন মাংস দেয়।

আরেক নারী জানান, সন্তান প্রসবের পর সন্তানের জন্য পোশাক, গামছা, ডায়াপারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়।

বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশ ২০১২ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য প্রথম শিশু দিবাযত্ন পরিচালনা করে। পরে ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, দেশের যেসব কারাগারে মা বন্দীর সঙ্গে ১০ জনের বেশি শিশু রয়েছে, তাদের বয়স সাত-আট বছরের নিচে হলে ওই সব কারাগারে দিবাযত্ন কেন্দ্র করা হবে।

অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু ২০০৬ সাল থেকে পরের ছয় বছর দুই মেয়াদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ‘কারাগার পরিদর্শক’ ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সাজাপ্রাপ্ত মায়েদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের। ফলে সেসব মায়ের সঙ্গে যদি শিশুদের কারাগারে না রাখা হয়, তাহলে তারা নিখোঁজ হয়ে যেতে পারে, পাচারের শিকার হতে পারে। তাই জরুরি বিষয় হলো মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য পেশাদার শিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষক দিয়ে মানসিক বিকাশ ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।

মায়ের বিকল্প নেই, দরকার সুষ্ঠু তদারকি

গত ১১ মে প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মারামারির ঘটনায় আসামি হিসেবে দেড় বছর বয়সী সন্তানসহ মাকে পাঠানো হয় জেলা কারাগারে। এক মাস পর আদালতে হাজিরা দিয়ে কারাগারে ফেরার সময় ওই নারীর স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান কারাফটকে দাঁড়িয়েছিল মাকে একনজর দেখার জন্য। আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির প্রিজন ভ্যানের ভেতরে মায়ের কোলে থাকা শিশু ও কারা ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিশুর ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। ছবিটি আলোচিত হয়।

এর আগে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর একটি সংবাদপত্রে ফাঁসির সেলে সাজাপ্রাপ্ত মায়ের সঙ্গে ১০ মাসের এক শিশুর বাস করা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটি যুক্ত করে শিশুটির জন্য পর্যাপ্ত খাবার, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিতে নির্দেশনা চেয়ে ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ। হাইকোর্ট কারাগারের কনডেমড সেলে মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুর শারীরিক ও মানসিক উন্নয়ন নিশ্চিতে বিধি বা নীতিমালা বা প্রবিধান তৈরি করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলসহ আদেশ দেন। পরে ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাইকোর্টে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানানো হয়, আগেই হবিগঞ্জ থেকে সিলেটের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং শিশুটিকে নিয়ম অনুসারে প্রয়োজনীয় খাবার ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওই কারাগারে দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।

চলতি বছরের ৮ মে কারাগারের শিশুদের নিয়ে আরেকটি সংবাদপত্রের করা প্রতিবেদন যুক্ত করে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ জুন হাইকোর্ট বিভিন্ন কারাগারে কারাবন্দী মায়ের সঙ্গে কত শিশু রয়েছে, তাদের বয়সসহ সার্বিক বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে কারা মহারপরিদর্শককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

যেসব কারাগারে মা বন্দী রয়েছেন, সেখানে অবশ্যই দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকা উচিত। কারাগারে থাকা শিশুরা শিক্ষকের তদারকিতে পড়াশোনা, ছবি আঁকা, ছড়া–কবিতা ও নীতিকথা শেখানো উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের মায়ের সংস্পর্শে থাকার কোনো বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে কারাগারের ভেতেরেও শিশুটি মায়ের সঙ্গে আছে, এটা একদিক দিয়ে ইতিবাচক মনে হয়। তবে অন্যদিকে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি শিশুর শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ, সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার জন্য মা–বাবা, পরিবার ও সমাজের মধ্যে বড় হতে হবে। একটি শিশুর বিকাশে প্রথম পাঁচ বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কারাগারের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হতে পারে। একটু বড় শিশুরা অনুকরণ করে, ফলে অপরাধীদের দেখে বড় হলে সেই আচরণ তার মধ্যে চলে আসার আশঙ্কা থাকে।

অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনার মতে, যেসব কারাগারে মা বন্দী রয়েছেন, সেখানে অবশ্যই দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকা উচিত। কারাগারে থাকা শিশুরা শিক্ষকের তদারকিতে পড়াশোনা, ছবি আঁকা, ছড়া–কবিতা ও নীতিকথা শেখানো উচিত। শিশুদের সুষ্ঠু তদারক করা প্রয়োজন, যাতে তারা বাইরের জগতে প্রবেশের পর সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক জীবন পেতে পারে।