Image description

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দীর চাপে সারা দেশের কারাগারগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অভাবনীয় এই সংকটে জেলখানাগুলোতে যেমন মারাত্মক গাদাগাদি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কারাগারগুলোর ভেতরে দিন দিন এক চরম অমানবিক পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।

দেশের ৭৪টি কারাগারে মোট ৪৫ হাজার ২৮৬ জন বন্দী রাখার সক্ষমতা থাকলেও গত ১০ আগস্ট সেখানে বন্দীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ হাজার ৭৭৩ জনে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা কয়েকটি কারাগারে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি বন্দী অবস্থান করছেন।

কারা কর্মকর্তা ও আইন বিশেষজ্ঞরা এই অস্বাভাবিক অবস্থার পেছনে বিচারিক কাজের দীর্ঘসূত্রতা, জামিন পাওয়ার জটিলতা, পুরোনো মামলায় জামিনের পরপরই নতুন মামলায় ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ এবং সাম্প্রতিক গণগ্রেপ্তারকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

এই অতিরিক্ত বন্দীর চাপের ফলে কারাগারগুলোকে আধুনিক সংশোধনাগারে রূপান্তর করার বিষয়ে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরিচালক এএসএম নাসিরুদ্দিন এলান সতর্ক করে বলেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবে কারাগারের ভেতরে বন্দীদের মৃত্যুর ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কারণ, বেশিরভাগ কারাগারে কোনো স্থায়ী চিকিৎসক নেই।

অন্যদিকে, কারাগারের ভেতরে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা কেনাবেচার অভিযোগও সামনে এসেছে। ভালো খাবার, আরামদায়ক বাসস্থান, স্বজনদের সঙ্গে নির্জন সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে অবৈধভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ–টাকার বিনিময়ে সবই পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি কারামুক্ত হওয়া এক ব্যক্তি জানান, কারাগার পুরোপুরি টাকা আর পেশিশক্তির দখলে চলে গেছে। প্রিজনার ক্যাশ বা পিসি অ্যাকাউন্টে টাকা থাকলে উন্নত খাবার, আরামদায়ক থাকার জায়গা আর স্বজনদের সঙ্গে নির্জনে দেখা করার সব সুবিধাই অনায়াসে মেলে।

কারামহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, মামলার জট কমাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংস্কার কাজ চলছে। তিনি বলেন, এই সংকট কাটাতে দ্রুত জামিন দেওয়া এবং কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

গত ১০ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী ৯৬ হাজার ৭৭৩ জন বন্দীর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি মাত্র ৩১ হাজার। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বন্দীই বিচারাধীন মামলার আসামি, যাদের ভাগ্য আদালতের রায়ের ওপর ঝুলে আছে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে দুই হাজার ৫৮০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, যার মধ্যে ৭৬ জন নারী।

এই গাদাগাদি অবস্থা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার বন্দীর মধ্যে বিচারাধীন আসামি ছিলেন ৭৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৩ সালেও মোট বন্দীর ৭৪ শতাংশই ছিলেন বিচারাধীন আসামি।

বর্তমানে বন্দীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ মাদকসংক্রান্ত মামলার আসামি। এর পরেই রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন, চোরাচালান, বিস্ফোরক এবং হত্যা মামলার আসামি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বন্দী সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে আইনের অপব্যবহারকে বড় কারণ হিসেবে দায়ী করেন। তিনি জানান, বিপুল সংখ্যক বন্দী ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক মামলায় জেল খাটছেন। নিয়ম অনুযায়ী জামিন দেওয়া হচ্ছে না, এমনকি জামিন পাওয়ার পরেও আসামিদের নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই পুলিশকে এভাবে গ্রেপ্তারের চাপ দেওয়া মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

কারাগারে থাকা বন্দীদের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও আছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের ৪৫ জন মন্ত্রী, ৭৭ জন সাবেক সংসদ সদস্য, ৫৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১৮ জন জ্যেষ্ঠ আমলা।

এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলায় ৪৬৫ জন আসামি হত্যা মামলার এবং ৩৭১ জন হত্যাচেষ্টা মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৪১৪ জন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ৬৮ জন এবং মাদক মামলায় প্রায় ১৮ হাজার বন্দী আছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, কেবল গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যেই সারা দেশে এক লাখ ৪১ হাজার ৯৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি প্রতিদিন জামিন বা খালাসের মাধ্যমে গড়ে দুই হাজার বন্দী মুক্ত হওয়ার হারের চেয়ে অনেক বেশি।

বর্তমানে ঢাকা ও তার আশপাশের কারাগারগুলোতে বন্দীর চাপ সবচেয়ে আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। চার হাজার ৫৯০ জন ধারণক্ষমতার ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে জুলাই পর্যন্ত ১২ হাজার ৫৯ জন বন্দী ছিলেন, যা মূল সক্ষমতার প্রায় তিন গুণ।

কাশিমপুর কারাগার কমপ্লেক্সের অবস্থাও একই রকম। এই কমপ্লেক্সের ৫৪৮ জন ধারণক্ষমতার সেন্ট্রাল জেল-১-এ এক হাজার ৭৬৩ জন বন্দী, দুই হাজার জন ধারণক্ষমতার সেন্ট্রাল জেল-২-এ চার হাজারের বেশি বন্দী এবং এক হাজার ধারণক্ষমতার হাই সিকিউরিটি কারাগারে রাখা হয়েছে প্রায় তিন হাজার বন্দী।

অধিকার-এর পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলান এই পরিস্থিতির অবনতির পেছনে কারাগারের জায়গা না বাড়া, জামিন না হওয়া, বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রতা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বেশি সংখ্যায় গ্রেপ্তার করাকে দায়ী করেন।

তবে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জন্নাত-উল ফারহাদ জানান, ভিআইপি বন্দীদের জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে একটি বিশেষায়িত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পিরোজপুর, খুলনা ও বগুড়ায় নতুন কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। উখিয়ায় রোহিঙ্গা বন্দীদের জন্য আলাদা একটি বিশেষ বন্দিশালা তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া সিলেটে একটি মহানগর কারাগার চালু করা হয়েছে এবং চট্টগ্রামে অন্য একটি নির্মাণের কাজ চলছে। মাদক মামলার আসামিদের জন্য তিনটি বিশেষ কেন্দ্র রয়েছে, যার মধ্যে ফেনী-২ ও কিশোরগঞ্জ-২ চালু হয়েছে এবং মাদারীপুর-২ প্রস্তুত হওয়ার পথে।

কারাগারের প্রাতিষ্ঠানিক খাবার খুবই সাধারণ। সাধারণ রেশনে রুটি, শনিবারে হালুয়া এবং মঙ্গলবারে খিচুড়ি দেওয়া হলেও খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বাইরের ওষুধ আনা গেলেও ঘুমের ওষুধ দেওয়া নিষিদ্ধ।

তবে সাবেক বন্দীদের মতে, টাকা থাকলে ভেতরে অনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়। স্বজনদের পাঠানো পিসি অ্যাকাউন্টের টাকা দিয়ে বন্দীরা ভেতরে থাকা ক্যানটিন থেকে বিরিয়ানি, মিষ্টি, দুধের তৈরি খাবার, সিগারেট ও মৌসুমি ফল কিনতে পারেন।

এ ছাড়া নগদ টাকায় বিটিভি ছাড়া অন্য চ্যানেল দেখা, গান শোনা কিংবা পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগত মোবাইল বা ভিডিও কলে কথা বলার অভিযোগও আছে। অবৈধ যোগাযোগ রুখতে জ্যামার থাকলেও তা প্রায়ই অকেজো থাকার কথা স্বীকার করেন কর্মকর্তারা।

আইজি (প্রিজন) জানান, মোবাইল ফোন বন্ধে নতুন জ্যামার ও উন্নত স্ক্যানার বসানো হচ্ছে। পিসি অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার রোধে প্রতিবার সর্বোচ্চ ১০ হাজার ও মাসে ৩০ হাজার টাকা জমার নিয়ম চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জ কারাগারে একটি নগদহীন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বন্দীরা মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে ভেতরের কেনাকাটা করতে পারেন।