ইসলামী শিক্ষা দিবস উপলক্ষে ‘শিক্ষার বি-উপনিবেশায়ন: আবদুল মালেকের শিক্ষা-প্রস্তাবনা ও বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনার করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা। শনিবার বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হলস্থ জুলাই শহিদ স্মৃতি অডিটোরিয়ামে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে বক্তারা শহীদ আবদুল মালেকের শিক্ষা-ভাবনা ও প্রস্তাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, একটি জাতির শিক্ষা কেবল জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর হলে চলবে না; এর সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়ের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার প্রভাব থেকে বেরিয়ে দেশের নিজস্ব মূল্যবোধ, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, আধুনিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তারা।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এজিএস মহিউদ্দিন খান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মু. সাজ্জাদ হোসাইন খান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন সম্পাদক ও প্রাবন্ধিক শিহান বিন ওমর। এছাড়া আবদুল মালেক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো. মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শহীদ আবদুল মালেক শিক্ষাব্যবস্থা ও নৈতিকতার প্রশ্নে গভীরভাবে চিন্তাশীল একজন বিপ্লবী তরুণ ছিলেন। তার কাছে শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষ তৈরি করা ছিল না; বরং নৈতিক ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলাও শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল।
তিনি বলেন, আবদুল মালেকের শিক্ষা-প্রস্তাবনায় জ্ঞান, সামাজিকীকরণ ও নৈতিকতার সমন্বিত বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক ছিন্ন হলে জ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আরও বলেন, তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আবদুল মালেকের স্বতন্ত্র অবস্থানের কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময় বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মম হামলার শিকার হয়ে তিনি শহীদ হন। জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিকতার বিকাশকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, শহীদ আবদুল মালেকের শিক্ষা-প্রস্তাবনা বর্তমান সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি এমন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা চাননি, যার মাধ্যমে কেবল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের জন্য কেরানি তৈরি হবে। বরং ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও আধুনিকতার সমন্বয়ে একটি শিক্ষা কাঠামোর কথা তিনি বলেছিলেন।
সাদিক কায়েম বলেন, ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট আবদুল মালেকের শিক্ষা-ভাবনার বিরোধিতা থেকেই তাঁর ওপর হামলার সূত্রপাত হয় এবং ১৫ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রথম ছাত্রহত্যা।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে আধুনিকতা ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শহীদ আবদুল মালেকের শিক্ষা-ভাবনা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও ডাকসু এজিএস মহিউদ্দিন খান বলেন, আবদুল মালেক এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে কিছু সাধারণ মূল্যবোধ (Common Values) থাকবে। এসব মূল্যবোধ কেবল ঔপনিবেশিক চিন্তা ও মূল্যবোধের ওপর নির্ভরশীল হবে না; বরং একটি জাতির নিজস্ব পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করবে।
তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ‘প্রোডাক্ট’ হিসেবে আমরা যে ধরনের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছি, তা মূলত আমাদের নৈতিক মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারছে না। নৈতিকতা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থেকে এবং সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে শিখে নিতে হচ্ছে।
মহিউদ্দিন খান বলেন, শহীদ আবদুল মালেকের যৌক্তিক বক্তব্য ও শিক্ষা-ভাবনার কারণে ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট যে হামলার পটভূমি তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ১৫ আগস্ট তার শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছিল, তা বর্তমান শিক্ষা সংস্কারের প্রস্তাবনা তৈরির সময় স্মরণে রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে বিবেচনায় নিলে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হবে না। এর সঙ্গে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও জাতির নিজস্ব পরিচয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মু. সাজ্জাদ হোসাইন খান। ‘শিক্ষার বি-উপনিবেশায়ন: আবদুল মালেকের শিক্ষা-প্রস্তাবনা ও বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রবন্ধে শহীদ আবদুল মালেকের শিক্ষা-ভাবনা এবং বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আলোচনায় শিক্ষার উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, সামাজিকীকরণ, জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক চিন্তার প্রভাব থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো উঠে আসে। একই সঙ্গে দেশের বাস্তবতা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক-সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।