Image description

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পাঠ্যবইয়ে বেশকিছু পরিবর্তন আনলেও এখনো সব শ্রেণির বাংলা বইয়ে বিতর্কিত লেখকদের বহু গদ্য-কবিতা রয়ে গেছে। চলতি শিক্ষাবর্ষের বাংলা বই পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিতর্কিত ও সমালোচনার মুখে থাকা কয়েকজন লেখকের একাধিক কবিতা ও গদ্য এখনো বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা বইয়ে বহাল রয়েছে। এছাড়া অপরিচিত লেখকের কবিতাও রয়ে গেছে।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জাতীয় পাঠ্যবই কেবল সাহিত্য শেখানোর মাধ্যম নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের ভাষাবোধ, ইতিহাসচেতনা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গঠনেরও অন্যতম উপকরণ। তাই পাঠ্যসূচি প্রণয়নের সময় এক বা দুজন লেখকের একাধিক রচনা অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ের ও বিভিন্ন ধারার লেখকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চলতি বছরের বাংলা পাঠ্যবই পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত টানা চার শ্রেণিতে বিতর্কিত লেখক হুমায়ুন আজাদের গদ্য রয়েছে। সেগুলো হলোÑষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘ফাগুন মাস’, সপ্তম শ্রেণিতে ‘শব্দ থেকে কবিতা’, অষ্টম শ্রেণিতে ‘বাংলা ভাষার জন্মকথা’ এবং নবম শ্রেণিতে ‘বাঙলা শব্দ’। ‘বাংলা ভাষার জন্মকথা’ ভাষাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হলেও অন্য দুটি গদ্যের পরিবর্তে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. এনামুল হক বা অন্য গবেষকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে আরো বিস্তৃত ধারণা পেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে কবি শামসুর রাহমানের কবিতা রয়েছে প্রথম থেকে নবম শ্রেণির মধ্যে পাঁচটি শ্রেণিতে। এসব হলোÑপ্রথম শ্রেণিতে ‘ট্রেন’ (ছড়া), চতুর্থ শ্রেণিতে ‘প্রিয় স্বাধীনতা’, পঞ্চম শ্রেণিতে ‘সাইক্লোন’, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘বাঁচতে দাও’ এবং নবম-দশম শ্রেণিতে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’। এর মধ্যে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত কবিতা হিসেবে বিবেচিত হলেও অন্য কয়েকটি কবিতা একই ভাবে সমাদৃত নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট কবিরা । তাদের মতে, বিভিন্ন কবির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পাঠ্যবইয়ে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন।

প্রথম থেকে নবম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মোট সাতটি শ্রেণিতে কবি সুফিয়া কামালের কবিতা ও ছড়া রয়েছে। তার লেখাগুলো হলোÑপ্রথম শ্রেণিতে ‘ইতল বিতল’, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ‘আয় দেখে যা নাচ’, তৃতীয় শ্রেণিতে ‘আজিকার শিশু’, চতুর্থ শ্রেণিতে ‘জন্মেছি এই দেশে’, সপ্তম শ্রেণিতে ‘সাম্য’, অষ্টম শ্রেণিতে ‘জাগো তবে অরণ্য কন্যারা’ এবং নবম-দশম শ্রেণিতে ‘আমার দেশ’। এ কবিতাগুলোর মধ্যে দুই-তিনটি কবিতা জনপ্রিয় হলেও বাকিগুলো পাঠ্যপুস্তকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ে কবি মহাদেব সাহার ‘এই অক্ষরে’ কবিতাটি এখনো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সপ্তম শ্রেণির আনন্দপাঠে জাহানারা ইমামের রূপান্তরিত উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কিং লিয়ার, নবম শ্রেণিতে একাত্তরের দিনগুলি গদ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া অষ্টম শ্রেণিতে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখাও রয়েছে। তবে ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’-এ কালজয়ী পঙ্‌ক্তির লেখক কবি হেলাল হাফিজের কোনো কবিতা নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে স্থান পায়নি।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবির বাংলা পাঠ্যবই থেকে কয়েকটি বিতর্কিত লেখা বাদ দেওয়া হয়। সেগুলো হলোÑষষ্ঠ শ্রেণি থেকে রোকনুজ্জামান খানের ‘মুজিব’ কবিতা, সপ্তম শ্রেণি থেকে সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ এবং গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ‘শোন একটি মুজিবুরের থেকে’। নবম-দশম শ্রেণি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘তথ্যপ্রযুক্তি’ গদ্য, নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ এবং কামাল চৌধুরীর ‘মিছিল’ কবিতা। এসব পরিবর্তনের পর ধারণা করা হয়েছিল, বাংলা পাঠ্যবইয়ে লেখক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরো বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস আসবে। কিন্তু ২০২৬ সালের বই পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, একাধিক বিতর্কিত লেখকের বহু রচনা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচনা, সম্পাদনা ও পরিমার্জনার কাজে বিভিন্ন সময় যুক্ত ছিলেন। তার মতে, গদ্য-কবিতার লেখক নির্বাচনের ব্যাপারে সুনির্ধারিত তালিকা বা ছক থাকা দরকার। কারণ, চাইলেই সব লেখককে পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করা যায় না। এনসিটিবির চাহিদামতো প্রত্যেক শ্রেণিতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে রাখতে হয়। আবার পুরুষ বা নারী লেখক কতজন, কোন ধর্মের বা মতের লেখক কতজনÑএমন হিসাবও বাইরে থেকে অনেকে করেন। এজন্য শুরুতেই কোন শ্রেণিতে কোন লেখককে রাখা হবে কিংবা কোন কোন লেখককে একাধিকবার রাখা হবে, সে তালিকা করে নিলে সমস্যা কমে যাবে।

বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন লেখককে ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘বিতর্কিত’ বলা হয়। অধ্যাপক তারিক মনজুর এরকম আখ্যা দেওয়ার বিরোধী। তিনি আমার দেশকে বলেন, প্রয়োজন ও শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে লেখক নির্বাচন করতে হবে। এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপার, অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি বা লেখকের লেখা পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত হয়ে যায়, যাদের চেয়ে উপযুক্ত লেখক নিশ্চিতভাবেই আরো অনেকে ছিলেন বা আছেন। এমনটি যাতে না হয়, সে ব্যাপারে পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাদের সচেতন থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের শিক্ষাক্রম উইংয়ের সদস্য প্রফেসর মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর আমার দেশকে বলেন, এসব আমাদের সময়ে হয়নি। বর্তমানে আমরা পাঠ্যক্রম সংশোধনের কাজ করছি। আশা করি ২০২৮ সালের পাঠ্যবইয়ে বিতর্কিত লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে পরিবর্তন আনতে পারব।