অবসরে যাওয়ার পর এককালীন কিছু আর্থিক সুবিধা পান বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। আর এই সুবিধা পেতে চাকরিকালীন তাদের প্রতি মাসের এমপিও (বেতন-ভাতার সরকারি অংশ) থেকে অবসর ও কল্যাণ ফান্ডে যথাক্রমে ৬ ও ৪ শতাংশ করে মোট দশ শতাংশ টাকা কেটে রাখা হয়। বিধান অনুযায়ী প্রায় ছয় লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর প্রতিমাসের এমপিও থেকে চাঁদা বাবদ কর্তন করা কোটি কোটি টাকা জমা থাকার কথা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। সেখান থেকে সুদ পাওয়া যায়। ফলে জমা টাকার মূলধন বাড়ে।
পদাধিকার বলে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের সভাপতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব। আর ২১ সদস্যের কমিটির দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি হলেন সচিব। যিনি কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ।
কল্যাণট্রাস্টের টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে সরিয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত হয় ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার যাত্রা শুরু করে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাস অবধি কল্যাণট্রাস্টের সচিব পদে ছিলেন অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভুইঁয়া। এরপর আওয়ামী লীগ নেতা ও পরে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট অবধি টানা কল্যাণট্রাস্টের সচিব পদে ছিলেন। পাঁচ আগস্ট থেকে তিনি পলাতক।
জানা যায়, ২০১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত শিক্ষাসচিব ছিলেন কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। ওই সময়ে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে অবসর ও কল্যাণ ফান্ডের সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন হিসেবে জমানো প্রায় সাতশ কোটি টাকার ৯৯ শতাংশ তুলে বিভিন্ন বেসরকারি নতুন ও রুগ্ন ব্যাংকে রাখেন। লুটপাট, খুন-গুমসহ নানা অভিযোগে একাধিক মামলায় ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ অক্টোবর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী অদ্যাবধি কারাগারে আছেন।
-medium.webp)
-medium.webp)
যদিও অর্থ বিভাগের নির্দেশ ২৫ শতাংশের বেশি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা যাবে না। কিন্তু, একেবারে নতুন অথবা রুগ্ন ব্যাংকে টাকা রাখায় ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হন কামাল চৌধুরী। সোনালী ব্যাংক থেকে বারবার তাগাদা দিলেও তাতে পাত্তা দেননি তখনকার দাপুটে শিক্ষাসচিব।
আমাদের বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, রুগ্ন ব্যাংকগুলোকে সবল করতে গিয়ে শিক্ষকদের টাকাগুলো আটকে রাখা হয়। বলা হয় ফান্ড নেই। তাতে বঞ্চিত হন বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। অবসরের পর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অবসর ও কল্যাণ ফান্ডের টাকা পান না তারা।
সোনালী ব্যাংক থেকে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সচিবদের কাছে পাঠানো চিঠির কপি আমাদের বার্তার হাতে রয়েছে। এতে লেখা রয়েছে, ‘বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনায় পরিদৃষ্ট হয় যে, অত্র ব্যাংক কর্তৃক বেসরকারি ব্যাংকের অনুরূপ সুদ হার প্রদানের পরও উক্ত প্রতিষ্ঠানদ্বয় কর্তৃক অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে পূর্বাপর বেসরকারি ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে যা খুবই দুঃখজনক।’
উল্লেখ্য, অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থবিভাগ বাজেট অধিশাখা -১১ এর ১৫-২-২০১২ তারিখের নং-০৭.১১১.০৩১.০০.০৫২.২০১২৬৯ সংখ্যক পত্রের ১(খ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে যে, পাঁচ বা ততোধিক বছর বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবসায় নিয়োজিত বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি, আধা- সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থা তাদের মোট নিজস্ব আমানতের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ অর্থ জমা রাখতে পারবে।
ব্যাংকটির জেনারেল ম্যানেজার কাজী তসলিমা বানু স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরো বলা হয়, এ প্রেক্ষিতে তহবিল সংরক্ষণ বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং অর্থ বিভাগের গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আপনাদের প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সরকার কর্তৃক এককালীন প্রদানকৃত টাকাসহ মাসিক ভিত্তিতে প্রদেয় তহবিল অত্র ব্যাংকে সংরক্ষণের জন্য পুনরায় অনুরোধ করা হলো। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যেকোন সেবা প্রদানে শতভাগ সক্ষম সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ও অত্র ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ থেকে সরকারি নীতিমালার বাইরে বেসরকারি ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরের একান্ত আবশ্যকতা দেখা দিলে সেক্ষেত্রে ব্যাংকে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং অর্থ বিভাগ বাজেট শাখা-১১ এর অনুমোদন সম্মতিপত্রসহ অর্থ স্থানান্তর বিষয়ক চেক/অনুরোধপত্র প্রেরণ করার জন্য আপনাদেরকে সবিনয় অনুরোধ করা হলো।
আমাদের বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, অদ্যাবধি মোট সাতটি রুগ্ন বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের জমানো টাকা রাখা আছে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর টাকা চব্বিশের পাঁচই আগস্টের আগে লুট হয়ে গেছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ একাধিকবার বলেছেন অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের সাত হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। একই কথা বলেছেন পরবর্তী উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার। কিন্তু কেউই সেই টাকা উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেননি।
তবে, শিক্ষকদের সেই টাকা উদ্ধার করতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
ফিরে দেখা কল্যাণ ট্রাস্টের অনিয়মের তদন্ত প্রতিবেদন ও অধ্যক্ষ কাজী ফারুকের সংশ্লিষ্টতা : বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্মলগ্ন থেকে নানা ফন্দিফিকির করে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ৫ সদস্যের একটি দল প্রথমবারের মতো কল্যাণ ট্রাস্টের দুর্নীতির তদন্ত করে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে। প্রতিবেদনের কপি দৈনিক আমাদের বার্তার হাতে রয়েছে।
১৯৯০ থেকে ২০০২ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া লুটপাটের কাহিনীর সঙ্গে জড়িত অনেক শিক্ষক নেতা ও কল্যাণট্রাস্টের সদস্য-সচিব। ১৯৯৭ থেকে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সদস্য-সচিব ছিলেন কাজী ফারুক আহমেদ। এই সময়ে লুটপাট বেশি হয়েছে। শিক্ষা বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকমের আর্কাইভে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন সংরক্ষিত আছে।
১৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের শুরুতেই ‘সার্বিক পর্যালোচনায়’ বলা হয়: “বর্তমান নিরীক্ষাদল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীগণের আবেদনগুলি পূর্বের ন্যায় অগোছালো অবস্থায় পায়। বর্তমান সদস্য-সচিব কর্তৃক তার সময়কালের রেকর্ডপত্র যথা ক্যাশ বই, বিলভাউচার, নথি ইত্যাদি যথাযথভাবে সংসক্ষণ করতে দেখা যায়। পূর্বের সদস্য-সচিবের সময়কালের লেনদেনের জন্য কোন ক্যাশ বই, প্রাপ্তি ও পরিশোধ হিসাব, স্থিতিপত্র কিছুই সংরক্ষন করেন নি। তাছাড়া প্রাপ্ত আবেদনপত্রগুলিও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন নি। এমনকি দায়িত্ব হস্তান্তরকালে মোট প্রাপ্ত টাকা, পরিশোধত টাকা, উদ্বৃত্ত অর্থ এবং সমর্থনে ব্যাংক সনদপত্র, মোট ইসস্যূকৃত চেক ও টাকার পরিমান, অবশিষ্ট আবেদনপত্র চেক লেখা হয়েছে কিন্তু ইস্যু হয় নি, সেগুলির সংখ্যা ও টাকার পরিমান ইত্যাদি বিস্তারিত উল্লেখপূর্বক দায়িত্ব হস্তান্তর করেন নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাস্টের তহবিল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মহাসচিব মাউশি অধিদপ্তর এবং সদস্য সচিবের যুগ্ম স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু শুধু একটা ব্যাংক হিসাব ব্যতীত অন্যান্য হিসাব ও আমানত ভাইস প্রেসিডেন্টের একক স্বাক্ষরে পরিচালিত হয়েছে। মহাপরিচালক দায়িত্ব হস্তান্তরকালে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্টের হিসাব ও উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংক সনদসহ পরবর্তী মহাপরিচালককে হাস্তান্তর করেছন এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া মহাপরিচালক অফিসে রেকর্ডপত্র চাইলেও সন্তোষজনক রেকর্ডপত্র সরবরাহ করতে পারে নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিরীক্ষাকালে বিভিন্ন রেকর্ডপত্র চেয়ে যেগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো যাচাইয়ে যেসব অনিয়ম নিরীক্ষাদলের পক্ষে উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রযোজ্য বিধির আলোকে যে বিষয়গুলো অনিয়মিত ও বিধিবহির্ভূতভাবে চিহ্নিত হয়েছে তার ভিত্তিতে আপত্তিগুলো নিন্মে অনুচ্ছেদ আকারে লিপিবদ্ধ করা হল।
হাতে নগদ টাকা: নিরীক্ষাকালে ২০০২ এর ১ অক্টোবর সকাল ১০টায় হাতে নগদ ২১ হাজার ৮২৫ টাকা পাওয়া যায়। তার আগে ৩০ জুন হাতে নগদ টাকার পরিমান ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪৯ টাকা। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের জারীকৃত প্রবিধানমালার ৭(৪) বিধিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ট্রাস্টের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য অনধিক তিন হাজার টাকা রাখার বিধান আছে। এক্ষেত্রে ওই বিধি লংঘিত হয়েছে।
ব্যাংক উদ্বৃত্ত: নিরীক্ষাকালে ২০০২ এর তা ৩০ সেপ্টেম্বর লেনদেনের পর সোনালী ব্যাংক, তোপখানা শাখার চলতি হিসাব নম্বর ৩৩০০৯৮৮৮ তে ৬ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার ৩২৯ টাকা এবং হিসাব নম্বর ৩৩০০১১০৮৪ তে ৬ কোটি ২৬ লাখ ৬৯ হাজার, ৯৭৯ টাকা জমার ব্যাংক প্রত্যয়ন পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়তঃ সোনালী ব্যাংক তোপখানা শাখা পত্র নং সুপ্রীম/স্থায়ী আমানত (২০০২ এর ২০ জানুয়ারি) এর মোতবেক অবসর প্রকল্প নামের চলতি হিসাব নং ৩৩০১১৩০৮ তে ৪০ কোটি ১ লাখ ১০ হাজার ৬০১ টাকা জমার প্রমাণ পাওয়া যায়।
কল্যান ট্রাস্টের যাবতীয় টাকা স্থায়ী হিসাবে জমা না করে কোটি কোটি টাকা চলতি হিসবে রাখা হচ্ছে। ফলে ট্রাস্ট সুদ বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ কল্যাণ ট্রাস্ট আইন ও প্রবিধান এ ট্রাস্টের যাবতীয় টাকা লাভজনক হিসাবে জমা রাখার উল্লেখ আছে। ইহা গুরুতর অনিয়ম। এজন্য সংশ্লিষ্ট ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালকরা দায়ী।
শিক্ষাসহ সব খবর সবার আগে জানতে দৈনিক আমাদের বার্তার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গেই থাকুন। ভিডিয়োগুলো মিস করতে না চাইলে এখনই দৈনিক আমাদের বার্তার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন এবং বেল বাটন ক্লিক করুন। বেল বাটন ক্লিক করার ফলে আপনার স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিয়োগুলোর নোটিফিকেশন পৌঁছে যাবে।