ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা নেই চাঁদপুরের মেঘনায়। এ নদীতে মাছ ধরতে অনীহা দেখাচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা। একদিকে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম, অন্যদিকে জালে মাছ না ওঠায় প্রতিদিনের খরচটুকুও উঠছে না।
সরেজমিনে চাঁদপুরের মেঘনা তীরের বিভিন্ন ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, ঘাটে নোঙর করা আছে জেলেনৌকা। চিরচেনা সেই কর্মব্যস্ততা নেই; নেই ইলিশ বিক্রির হাঁকডাক। এই সময়ে জেলা শহরের রেলওয়ের বড় স্টেশন এলাকার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মণ ইলিশ বিক্রি হতো, সেখানে বর্তমানে সারা দিনে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই মণের মতো। একই অবস্থা হরিণা ফেরিঘাটের আড়তেও। সেখানে সারা দিনে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, মেঘনায় ইলিশের আকাল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন নদীতে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তারা। অনেক জেলে নৌকা ও জাল মেরামত করার কাজও বন্ধ করে দিয়েছেন। একবার নদীতে জাল ফেলতে নৌকাপ্রতি যে পরিমাণ জ্বালানি খরচ হয়, জালে ওঠা মাছ বিক্রি করে তার অর্ধেকও উঠে আসছে না।
চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট এলাকার একাধিক জেলে জানান, সারা দিন নদীতে ঘুরে ৫-৬টি মাছ পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে নৌকার তেলের টাকাও হয় না। অনিশ্চয়তার কারণে জেলেদের মধ্যে নদীতে নামার অনীহা আরও তীব্র হয়েছে।
অধিকাংশ জেলেই বিভিন্ন সমিতির কাছ থেকে টাকা নিয়ে নৌকার সরঞ্জাম গুছিয়েছিলেন। মাছ না পাওয়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইলিশের এই সংকট শুধু জেলেদের নয়, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপরেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সদর উপজেলার আনন্দ বাজার এলাকার জেলে ইসমাইল দেওয়ান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ভোর ৬টায় পদ্মা-মেঘনায় নেমে সকাল ৯টা পর্যন্ত ছিলাম। পেয়েছি মাত্র ছয়-সাতটি ইলিশ। জ্বালানি খরচ বাদ দেওয়ার পর নৌকায় থাকা সাতজনের ভাগে ১০০ টাকা করে এসেছে।’
লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া গ্রামের জেলে হান্নান গাজীর অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ইলিশ ধরতে নদীতে যাই না। একদিন গিয়ে ইলিশ বিক্রি করে পেয়েছি ৪০০ টাকা, আরেক দিন পেয়েছি ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু জ্বালানি খরচই ওঠে না। তাই অনেকে ইলিশ ধরা বাদ দিয়ে অন্য কাজ করছেন।’
ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপরও। হরিণা ফেরিঘাটের প্রবীণ মাছব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকা কেজি দরে। আর ছয় থেকে সাতটি ইলিশে এক কেজি হলে দাম পড়ছে ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি। ইলিশের পাশাপাশি কিছু পাঙ্গাশও পাওয়া যাচ্ছে। এসব পাঙ্গাশ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, গত তিন বছর ধরে ইলিশ আসা কমে গেছে। আগে এই সময়ে প্রতিদিন আড়তগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ মণ ইলিশ বিক্রি হতো। এখন সারা দিনে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন মণ ইলিশ বিক্রি হয়।
তাঁর দাবি, দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা ইলিশও আগের মতো নেই। এতে শুধু জেলেরা নন, আড়তদার, শ্রমিকসহ মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই সমস্যায় পড়েছেন। কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করছেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, মূলত বর্ষা মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যায়। এ বছর ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে। আগামী মাস থেকে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের বিচরণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অক্টোবর মাসে এসব নদীতে ইলিশের বিচরণ আরও বাড়বে। তবে মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে।