Image description

খন্দকার রাকিব

বাংলাদেশের যেসব জায়গায় বড় আকারে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল, সেসব জায়গায় ‘ভারতীয় বাহিনী' এসে আক্রমণ করেছে, এমন একটা ধারণা সেখানকার জনমানসে, এবং একই সাথে দেশের জনপরিসরেও বাড়ছে। সম্প্রতি বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের গুমের মামলায় এক সাবেক র্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপ ওঠে যে, তিনি যশোর সেনানিবাসের কমান্ডিং অফিসার থাকাকালীন সাতক্ষীরায় যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল, সেই সাতক্ষীরা অপারেশনে ভারতীয় বাহিনীর অনেকেই যোগ দিয়েছিল। মুহূর্তেই অনেকে এটা নিয়ে নানা আলাপ শুরু করেন। কোন সামরিক অভিযানের কোন প্রমাণাদি না থাকার পরও, জনমানসে এই আলাপটা কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ? যেহেতু আমি সাতক্ষীরায় ফিল্ডওয়ার্ক করেছি, সহিংসতাকে বুঝার চেষ্টা করেছি, সেখানে যারা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়েছে, তারা আসলে এই বিষয়টাকে কীভাবে দেখেছেন সেটাও বুঝার চেষ্টা করেছি।

সাতক্ষীরার ঘটনায় যাওয়ার আগে আমি জুলাইয়ের বিপ্লবের সময়ের দুটি অভিজ্ঞতার কথা বলি।

জুলাইয়ের আগে, মুজিব বর্ষের সময়ে বাংলাদেশ সরকার হঠাৎ করেই বাংলাদেশ আনসার নামক প্যারামিলিটারি ফোর্সের পোশাক পরিবর্তন করে। পোশাকটা এমনভাবে কমব্যাট আকারে বদলানো হয় যে, পরে খুঁজে দেখলাম প্রায় ভারতের নৌবাহিনীর পোশাকের মতো। আনসারের যে খাকি পোশাক ছিল, যা পরিধান করে তারা দীর্ঘদিন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করত এবং মানুষ তাদের সেভাবে চিনত, জুলাইয়ের আগে কমব্যাট পোশাকে অনেকেই তাদের চিনতে পারেনি ঠিকভাবে । জুলাইয়ের তীব্র আন্দোলনের মুহূর্তে চন্দ্রা, কালিয়াকৈর থেকে কোনাবাড়ি হয়ে দলে দলে মানুষ যখন রাস্তায় নেমেছিল, রাস্তায় আলাপ ছড়িয়ে যায় যে ভারতীয় বাহিনী নেমেছে। আনসার ব্যাটালিয়ানের পোশাককে ভারতীয়দের পোশাক আকারে অনেকেই ট্রিট করেছেন । এই সময় আমি ক্লাস সেভেন পড়ুয়া এক ভিক্টিমের জবানবন্দি শুনি, যে বলে যে তার হাতের বাহুতে বুট জুতা দিয়ে পিষে ডান হাতের পুরো কবজির ভেতরে শ খানেক ছররা গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে। ছেলেটা বহুদিন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। হাতটা তার আদৌ টিকবে নাকি গ্যাংগ্রিনে শেষ হয়ে যাবে জানি না। সে বলছিল, তাকে যে গুলিটা করেছে, সে ভারতীয়, উঁচা-লম্বা। চোখ হারানো কয়েকজন ভিক্টিমও একই আলাপ করে যে, সেখানে ভারতীয় বাহিনী এসেছিল।

আরেকটা ঘটনার স্বাক্ষি হই সিলেটে। গোলাপগঞ্জ শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়ন। শহর থেকে দূরে হলেও ওই উপজেলার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু এই ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়ন। আয়রনিক্যালি, বাংলাদেশ সরকারের কেপিআই-ভিত্তিক যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেখানে গোলাপগঞ্জের একটা গ্যাসক্ষেত্র ছিল। ফলে জুলাই আন্দোলনে নিরাপত্তার নামে কেপিআইকে প্রটেকশন দিতে সেখানে স্থানীয় প্রশাসন এসিল্যান্ডের (ভূমি কর্মকর্তা) মাধ্যমে বিজিবিকে (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ডেকে আনে। সেখানে একদম গ্রামাঞ্চলে গ্রামের মানুষ হঠাৎ আগে কখনো এত কাছ থেকে বিজিবিকে দেখেনি, তাই মানুষের মাঝে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এরা কারা, কোত্থেকে এল। বহু অস্ত্রশস্ত্র ঝাঁকে ঝাঁকে গাড়িসহ অপরিচিত সৈনিকদের গণহারে মরণাস্ত্রসহ মার্চ করতে দেখে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিনা উস্কানিতে পুলিশের কয়েক দফা ফাঁকা ফায়ারিংয়ে মানুষ দিগ্বিদিক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কয়েকজন আহত হয়। পুলিশের পেছনে এমন সারিবদ্ধ মার্চ আকারে বিজিবির বাহিনী এবং মরণাস্ত্র মানুষ দেখে মাইকে ঘোষণা দেয় যে, "ভারতীয় সৈন্য এসেছে"। যার ফলে আতঙ্কিত হয়ে লোকজন চারদিক থেকে বিজিবিকে ঘেরাও করে। উত্তেজনা তৈরি হলে বিজিবি নির্বিচারে গুলি চালায় এবং পাঁচজনকে শহীদ করে।

এবার সাতক্ষীরার ঘটনায় আসি।

২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সাতক্ষীরাতেও এর একটা ধাক্কা লাগে। ২০১৩ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলন শুরু হলে সারা দেশের মতো পুলিশ স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের লোকদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একটা অভিযানে পুলিশ রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেফতার করতে এলে মানুষ পুলিশের গাড়ি আটকিয়ে প্রতিরোধ করে, আর সেখানেই হ্যান্ডকাফ পরা একজন বন্দীকে সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলা হয়। পুলিশের গ্রেফতারের কাজে বাধা দেওয়ার এই ঘটনার জেরে পরের সপ্তাহেই র্যাব এসে স্থানীয় বিএনপির এক চেয়ারম্যানকে দিনেদুপুরে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলে। তার এক কাজিন যশোরে পলাতক থাকা অবস্থায় তাকেও একইভাবে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, গণগ্রেফতারের ধোঁয়াশা, আর পুলিশ-র্যাবের ক্রসফায়ার মানুষের মাঝে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা নিয়ে আসে। এরই মাঝে এক উপজেলার স্থানীয় এক যুবলীগ কর্মীকে রাতের আঁধারে কুপিয়ে সেসময় হত্যা করে কিছু ব্যক্তি। আমি সেই পরিবারে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে একটু ধাক্কাও খাই । দুইটা সন্তান নিয়ে তার বেঁচে থাকা তরুণ স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রী এখনও মনে করেন, তার নিজ দলেরই প্রতিপক্ষের (তিনি সরাসরি কিছু অভিযুক্তের নামও বলেন) নির্বাচনের আগে তার স্বামীকে হত্যা করে। আরেকটা উপজেলায় জামায়াতের লোকদের আক্রমণে দুইজন লীগ কর্মী মারা যান। এদের একজন আক্রমণের ভয়ে রাতে পালিয়ে কবরস্থানে যান, এবং সেখানে ভয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গভীর রাতে মারা যান। এই প্রত্যেকটা পরিবারকে আমি চরম তটস্থ এবং ভীত আকারে দেখেছিলাম। আরেকটা উপজেলায় বিএনপি এবং জামায়াতের লোকদের সম্মিলিত মিছিলে আওয়ামী লীগ আর পুলিশের সাথে সংঘর্ষে এক আওয়ামীলীগের কর্মী মারা যান।
এই প্রতিটা ঘটনার আগপাছ আমি বোঝার চেষ্টা করেছিলাম সেখানে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা আকারে পড়ার কিছু বিপদও আছে। সেই বছরই সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে ফেব্দ্রুয়ায়রিতে অন্তত দশজন আন্দোলনকারীকে পুলিশ এবং বিজিবি হত্যা করে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় দেখলাম, একটা মেসে একসাথে অভিযান চালিয়ে একসাথে শিবিরের আটজন ছাত্রকে পায়ে গুলি করে নিক্যাপিং করে ফেলে।

সাতক্ষীরার প্রতিটা ঘটনার কনসিকোয়েন্সই ছিল ভয়াবহ। স্কুলশিক্ষিকার স্বামী যুবলীগের কর্মী নিহত হওয়ার পর, সেখানে সন্দেহের বশত এক রাতেই তিনজনকে ধরে এনে ক্রসফায়ার দেয় স্থানীয় পুলিশ। যাদের দুইজনই ক্ষেতখামার করে পরিবার চালানো শ্রমিক, একজন মাইনর মাদ্রাসাছাত্র। সেই শিক্ষিকা এক অনিশ্চিত জীবন এখনও যাপন করে চলছেন, এবং এখনও নিজের স্বামী হত্যার বিচার চান। কিন্তু যাদের মেরেছে, এটা নিয়ে তিনি কিছুটা বিব্রত ছিলেন।

সেই ঘটনায় নির্বিচার গ্রেফতার শুরু হলে একজনকে পুলিশ ধরতে এলে সে ভয়ে পাশের হিন্দু বাড়িতে দৌড়ে পালিয়ে যায়। দৌড়াতে গিয়ে তার পোশাকটাও খুলে যায়। পুলিশ খুঁজে চলে যাওয়ার আগে এক ব্যক্তি সেটা দেখিয়ে দেয়, এবং পালিয়ে থাকা খাটের নিচ থেকে বের করে। সেই ছেলেকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়। ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ার ঘটনা শুনে হিন্দু বাড়ির সেই মানুষেরা এই ঘটনার আরও পরে ভয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। নিহত সেই ভিক্টিমের স্ত্রী আজ তেরো বছর একা একটা মেয়ে নিয়ে জিন্দেগি পার করে দিচ্ছেন।

আরেক উপজেলায় একজন আওয়ামী লীগ নেতা নিহতের ঘটনায় অন্তত চল্লিশের অধিক ঘরবাড়ি এবং দোকানপাটে আগুন লাগিয়ে দেয় স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক কর্মীরা। সারাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতায় সেসময় অন্তত কয়েকশ মানুষ মারা যাওয়ার খবর আসলেও, পত্রিকাগুলো সাতক্ষীরাকে আলাদা সেনসিটাইজ করে। রাজশাহী, চাঁপাই, দিনাজপুর, লালমনি, সিলেটসহ অন্তত কয়েক জেলার স্থলবন্দরের ট্রাক যাওয়া-আসা বাধাগ্রস্ত হলেও, স্রেফ সাতক্ষীরার ভোমরার স্থলবন্দরে ট্রাক আসা-যাওয়া না করতে পারাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সাতক্ষীরাকে মিনি পাকিস্তান আকারে মিডিয়াগুলো হাজির করে। এরপরের এপিসোডগুলো হয়ে পড়ে এক তরফা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সাক্ষী। রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং হত্যাকাণ্ডের বিচারের পরিবর্তে সরকার প্যারামিলিটারি ক্র্যাকডাউনের পথ বেছে নেয়।
চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর নামে একজন এসপিকে আলাদা দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর পরদিন থেকেই তিনি অন্তত সারি সারি বিজিবির গাড়ি এবং সৈন্য নিয়ে প্রতি রাতে একেকটা ইউনিয়নে অভিযানে নামেন বলে আমি কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর আলাপ শুনি। দেবহাটার পারুলিয়া বাজারের এক ভিক্টিম বলেন যে, পুরুষ মানুষেরা ভয়ে মাছের ঘের, কবরস্থান, খোলা জমিতে-রাস্তায় আশ্রয় নিচ্ছিল, এবং দেখছিল সারি সারি গাড়ি ঢুকছে তাদের দিকে। মাসের পর মাস তারা এভাবে রাতের অন্ধকারে ঘেরে, জমিতে পালিয়ে থাকত । এইসব অভিযানে রাজনৈতিক পদ-পদবি আছে এমন মানুষদের ঘরবাড়ি একের পর এক বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিতে থাকে। এক বাজারে নেমে কোনো আসামি ধরতে না পেরে সেখানকার বাজারের নিরাপত্তাপ্রহরীকে পায়ে গুলি করে নিক্যাপ করে দেয়। পায়ে গ্যাংগ্রিন নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন তিনি। আরেক উপজেলায় দেখি, লাইনের পর লাইন ধরে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। প্রতিটা উপজেলায় রাতে এভাবে সারি সারি গাড়ির অভিযান সাধারণ মানুষদের মনে গভীর দাগ কাটে। অনেক পুরুষ সদস্য পালিয়ে যায়। মেয়েরা বাড়িতে থাকে, চোখের সামনে ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে যেতে দেখে, পুড়িয়ে যেতে দেখে কান্নাকাটি করে অনেকে। এই ঘটনাগুলো সেসময়ে শেষ হয়ে যায়নি। যখনই কোনো পালিয়ে থাকা পুরুষ ব্যক্তি পরের বছরগুলোতে দেশের বাড়িতে আসত লুকিয়ে, সোর্সের মারফত খবর নিয়ে রাতেই তাদের ধরে নিয়ে নিক্যাপিং করত। কালীগঞ্জ, পারুলিয়া, আগরদাঁড়ি নানান জায়গায় এখনও বুলডোজারের সেই চিহ্নগুলো চলমান।

তো রাতে চলা সেইসব অভিযানে ক্রসফায়ারে ত্রিশের অধিক ব্যক্তিকে হত্যা করার পর অন্তত ৯০০-র অধিক মামলায় পুরো জনপদকে প্যারানয়া করে দেয়। একটা গ্রামে গিয়ে দেখি নি ক্যাপিংয়ের ভিক্তিম এক ছেলে ক্ষেত খামার করছে । ঢাকায় কৃত্রিম পা যেটা বানিয়ে নিয়েছে সেটা এত ভারি এবং এক্সফায়ার হয়ে গেছে যে জানেই না । নিয়িমিত চিকিৎসা নিতে না পাড়ায় পায়ে ঘা হয়ে আছে । সেই গ্রামে অন্তত তিনজনকে এইভাবে নি ক্যাপড দেখেছি । সবচাইতে বড় আকারের নি ক্যাপিং ঘটে কলারোয়াতে ।
স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী রেশিও কমে যায়, শিক্ষকদের অনেকেই পালিয়ে অন্য জেলায় চলে যায়। রাত দুইটা তিনটায় মেয়েদের ঘরে বাহিনীগুলো যখন কড়া নাড়ত , সেইসব নারীদের ভয়গুলো ছিল ভয়ার্ত । অনেক পরিবারে রুটিন বাহিনীর লোকেরা আসত , এবং রাতে টর্চ মারত জানালা বা অন্য কিছুর ফাঁক দিয়ে । বাহিনীর মানুষ এসে রাতে রেইড দিবে, এইটা অনেক মেয়েদের জীবনকে আলাদা করে গভর্ন্মেন্টালাইজ করেছিল ।
রাতের আঁধারে এই যে সারি সারি গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করেছে, যেটা কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বিজিবির গাড়ি আকারে অভিহিত করলেও, কয়েকজন মনে করেন ভারতীয় বাহিনী এসে তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজারে ভেঙেছে। সদর উপজেলার এক বিধবা নারী বলতেছেন তাঁর স্বামীকে গুলি করেছে ভারতের বাহিনী এসে ।

পারুলিয়া এলাকাটা ভোমরা বন্দরের খুব কাছেই। কোনোমতেই নিজের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে ক্র্যাকদাউন করেছে , তাদের ওপর এমন নিপীড়ন করেছে, এটা মেনে নিতে পারছিলেন না সেখানকার এক ভিকটিম। তাঁর মতে এরা রাতে ভোমরা দিয়ে আসত , কাউকে ওইদিকে যেতে দিত না । ঐ রোড ছিল ভুতুড়ে।

অনেক সাক্ষাতকার নিলেও, কোন প্রত্যক্ষদর্শী-ই সরাসরি ভারতীয় বাহিনীকে তাদের পোশাকে দেখেছেন এমন কিছু বলতে পারেননি আমাকে। কিন্তু অন্তত দশজন থেকে একই গল্প শুনেছি যে সেখানে ভারতের বাহিনী এসেছে। সেইসময়ে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা অবশ্য ভিন্ন কথা বলেন। তালা থানায় কাজ করেছেন এমন এক পুলিশ সদস্য আমাকে বলেছিলেন এই ধরনের অভিযানে যেটা ঘটে তা হলো পুলিশ-বিজিবি-র্যাব যৌথ বাহিনী মিলে অভিযান চালায়। সেনাবাহিনী নামার তেমন রেওয়াজ নেই, একদম ইমার্জেন্সি ছাড়া।

এই তিনটা ঘটনায় যা পরিষ্কার তা হোল, মানুষের ভয় রিয়াল। সেখানে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন রিয়াল। কিন্তু মানুষ এই নিপীড়ককে ভারত মনে করছে, যদিও ভারতিয় বাহিনী থাকার কোন প্রমাণ কোথাও নেই । ফলে এই তিনটা ঘটনার ভেতরে একটা কমন থ্রেড আছে, যেটা আমি বহুদিন ফিল্ডে বসে বুঝতে চেষ্টা করেছি।ফিলডওয়ার্ক করতে নৃবিজ্ঞানের ক্লাসে রেনাটো রোজালদোকে অনেকেই পড়ান। রোজালদো "Grief and a Headhunter's Rage" নামে একটা লেখা লিখেছিলেন । ফিলিপিনের ইলোঙ্গোতদের মাথাশিকারের ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। ইলোঙ্গোতরা বলত, শোক থেকে জন্ম নেওয়া ক্রোধই তাদের মাথাশিকারে ঠেলে দেয়। এই দাবিকে রোজালদো শুরুতে নিছক লোকাল আত্মব্যাখ্যা মনে করে সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু ফিলিপাইনে ফিল্ডয়ার্ক করতে গিয়ে খুব স্বল্প বয়সে তার স্ত্রী মিশেল রোজালদো পাহাড়ি পথে পা ছিটকে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন । মিশেলের মৃত্যুর পর রোজালদো হতবহবল হয়ে পড়েন। নিজের শরীরে সেই ক্রোধের বলটা অনুভব করেন। শোক তার কাছে আর কোনো ধাপে-ধাপে সাজানো প্রক্রিয়া থাকে না, বরং একধরনের প্রবল, প্রায় অসহনীয় শক্তি হয়ে ওঠে, যার একটা লক্ষ্যবস্তু দরকার হয়, যেখানে সেই শক্তিকে ছুঁড়ে ফেলা যায়।

আমি যখন সাতক্ষীরায় বসে সেই বাজার পাহারাদের জবানবন্দি যখন শুনছিলাম, বা পঙ্গু হাসপাতালের সেই সপ্তম শ্রেণির ছেলেটার কথা শুনছিলাম, তখন এই একই বল আমি টের পেয়েছিলাম তাদের কথায়। তাদের ওপর যে সহিংসতা নেমে এসেছে, তার জন্মদাতা যৌক্তিকভাবে তাদেরই রাষ্ট্র। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার, যারা প্রকৃতপক্ষে গুলি চালিয়েছে। ঘর ভেঙেছে, মানুষ মেরেছে। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি, এই ক্রোধ ও শোকের শক্তি সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর তারা নামাতে পারছে না। কারণ রাষ্ট্র এখানে কেবল একটা প্রাতিষ্ঠানিক সত্তাও না, এটা একই সাথে জাতি-রাষ্ট্রের কল্পিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী "নিজস্ব" সত্তা। নিজের রাষ্ট্র নিজের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে, এই স্বীকৃতি জাতীয় আত্মপরিচয়ের অন্তর্গত ধারাবাহিকতাকে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে দেয়। ফলে তাদের ক্রোধের শক্তিটা একটা বিকল্প, বহিরাগত, ঐতিহাসিকভাবে ইতিমধ্যে-অর্থবহ বস্তুর দিকে সরে যাচ্ছে।সেটা হচ্ছে ভারত।

মাইকেল তসিগেরও এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপুর্ন কাজ আছে। তসিগ তার "Culture of Terror, Space of Death" প্রবন্ধে দেখান যে, চরম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পরিস্থিতিতে একধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক অন্ধকার তৈরি হয়। সহিংসতা এত অতিরিক্ত ও অবর্ণনীয় হয়ে ওঠে যে এর স্বাভাবিক ব্যাখ্যা মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এই অবস্থায় গুজব সবসময় নিছক ভুল তথ্য মনে হয়না। এটা একধরনের বিকল্প জ্ঞান-উৎপাদন পদ্ধতি আকারেও হাজির হতে পারে, যা দিয়ে মানুষ তাদের অভিজ্ঞতার প্রবল, প্রায় দুর্বোধ্য মাত্রার সহিংসতাকে বোধগম্য করে তোলার চেষ্টা করে। "ভারতীয় বাহিনী এসেছে", সিলেট বা সাতক্ষীরার এই গুজব তাই নিছক ভুল সংবাদ হয়ে এসেছে তেমন না, বরং সহিংসতার তীব্রতা ও দুর্বোধ্যতাকে ভাষা দেওয়ার একটা বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে হাজির হয়েছিল । বীণা দাসও অবশ্য লিখেছিলেন, সহিংসতা কীভাবে সাধারণ জীবনের বুননের ভেতরে ঢুকে যায়, এবং ভুক্তভোগীদের ভাষ্য প্রায়ই আক্ষরিক সত্যকে অতিক্রম করে এমন এক প্রতীকী সত্যে পৌঁছায় যা তাদের অভিজ্ঞতার নৈতিক ভারকে ধারণ করে। পঙ্গু হাসপাতালের সেই ছোট ছেলেটার ভাষ্য , 'যে তাকে যে গুলি করেছে সে ভারতীয়', আমার কাছে আক্ষরিক অর্থে হয়তো অসত্য। কিন্তু যে সহিংসতা তার ওপর নেমে এসেছিল, একটা নাবালক ছেলের হাতের কব্জিতে কয়েশ পিলেট গান, তা তার নিজের রাষ্ট্র, নিজের সমাজের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল না। তাঁর কাছে এইটা এটা ছিল সম্পূর্ণ বহিরাগত, দখলদারিসুলভ।

বাংলাদেশের মত উত্তর-ঔপনিবেশিক ও নয়া-উদারনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে ক্ষমতা অস্বচ্ছ, বিচারবহির্ভূত ও খামখেয়ালিভাবে কাজ করে, যেমন ক্রসফায়ার, গুম, রাতের আঁধারে অভিযান, যার কোনো জবাবদিহি নেই, সেখানে মানুষ একটা সুসংগত, নামযুক্ত, শনাক্তযোগ্য এজেন্টের গল্প খোঁজা অস্বাভাবিক ছিল না। সাতক্ষীরায় যখন এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীরের রাতের কনভয় অভিযানের গল্প শুনছিলাম, তখন খেয়াল করেছি, সেই অভিযানের পেছনে কোনো ব্যাখ্যাযোগ্য যুক্তি মানুষের কাছে ছিল না। এই অস্বচ্ছতাই এক ধরনের ভয়াবহ মুখহীন ক্ষমতার অভিজ্ঞতা হাজির করেছে । "ভারত করেছে" এই বয়ান সেই মুখহীন, বিমূর্ত সন্ত্রাসকে এক অর্থে একটা মুখ, একটা এজেন্সি, একটা ব্যাখ্যাযোগ্য কাঠামো দিচ্ছে।এটা স্রেফ ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব আকারে পাঠ করাও বিপজ্জনক, কেননা ক্ষমতার অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে একধরনের পালটা রাজনৈতিক রেটরিক তৈরি করছে।

নেক্রোপলিটিক্স নিয়ে বলতে গিয়ে এমবেম্বে লিখেছিলেন, সার্বভৌম ক্ষমতা তার সবচেয়ে চরম রূপে প্রকাশ করে ব্যতিক্রম অবস্থার মধ্য দিয়ে, যেখানে আইন স্থগিত থাকে অথচ আইনের নামেই সহিংসতা চলে। ক্রসফায়ার, নিক্যাপিং, রাতের কনভয় অভিযান, বুল্ডজারে ঘরবাড়ি ঘুড়িয়ে দেয়া এসব সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ার বাইরের, প্রায়- আধা সামরিক এক ধূসর জায়গায় ঘটেছে। ফলে এই ধূসরতা কাঠামোগতভাবেই অনেকের কাছে দখলদারির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়েছে। নিজের ভূখণ্ডেই এক বহিরাগত, দখলদার শক্তির উপস্থিতির মতো অনুভূত হওয়ার মতো। অর্থাৎ "ভারতীয় বাহিনী" রূপকল্পটি তার কাছে নিছক ভুল বোঝাবুঝি না, এটা ব্যতিক্রম অবস্থার প্রকৃত কাঠামোগত চরিত্রকেই ধরে ফেলছে, যদিও এজেন্টের নাম ভুল বসাচ্ছে। এটা যে আবার যে নিছক মনস্তাত্ত্বিক অভিক্ষেপ তেমনও না, এর একটা বাস্তব, বস্তুগত ভিত্তিও কিন্তু মানুষ দেখেছে। আনসারের নতুন কমব্যাট ইউনিফর্ম সত্যিই ভারতীয় নৌবাহিনীর পোশাকের সাথে দৃশ্যত সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল, আর সে পোশাকেই সে যখন আন্দোলনকারীদের গু*লি করা শুরু করে তখন তা গুজবকে বাস্তব দৃশ্যগত ভিত্তি দিয়েছে। আবার আয়রনিক্যালি, বিজিবি, যে বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ই গড়ে উঠেছে সীমান্তে ভারত ঠেকানোর প্রতীক হিসেবে, সেই বাহিনীকেই স্থানীয়ভাবে ভারত বলে ভুল করা হচ্ছে।

ফলে দেখা যাচ্ছে, জাতি-রাষ্ট্রের আত্মকল্পনায় নিজস্ব জনগণের বিরুদ্ধে নিজস্ব রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম সহিংসতা একটা ডিজরাপশান তৈরি করে, যা এই কাঠামোর মধ্যে ধারণ করা কঠিন।আর ভিন্ন দিকে ভারত-নির্ভরতা, সীমান্তে নির্বিচার মিলিটারাইজ করা ও আঞ্চলিক আধিপত্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্মৃতি ইতিমধ্যে একটা প্রস্তুত শত্রু-কাঠামো সরবরাহ করে, যার মধ্যে নতুন ট্রমাকে সহজেই বসিয়ে দেওয়া যায়।

ফলে এই তিনটা ঘটনায় শেষ পর্যন্ত একটা অভিন্ন সুতো দৃশ্যমান। রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের ওপর এক ব্যতিক্রমী, আইনবহির্ভূত, নৈশকালীন, মুখোশহীন সহিংসতা চালিয়েছে। যার বস্তুগত চিহ্ন ছিল ভিনদেশি বাহিনীর ইউনিফর্মের সাদৃশ্য, রাতের কনভয়, অচেনা অস্ত্র। ফলে এটা আগে থেকেই 'নিজস্ব' ও 'ভারতীয়'র মধ্যে একটা হাল্কা ঝাপসা সীমারেখা তৈরি করে রেখেছিল। এই সহিংসতার জন্ম দেওয়া ক্রোধ ও শোকের শক্তি, রোজালদোর ভাষায় বলতে গেলে, একটা লক্ষ্যবস্তু দাবি করে, যা জাতীয় আত্মপরিচয়ের কাঠামোর মধ্যে নিজের রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি বসছে না। ফলে এই শক্তি সরে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিকভাবে ইতিমধ্যে-অর্থবহ, ভূরাজনৈতিকভাবে উপলব্ধ বহিঃশত্রুর দিকে। আর সেটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভারত। যে ইতিমধ্যেই আঞ্চলিক আধিপত্য, ঐতিহাসিক নির্ভরতা ও সীমান্ত-উদ্বেগের বয়ানে বোনা ছিল। ফলে পুলিশ-র্যাব-বিজিবিসহ যৌথ অভিযানের দায় যেখানে অস্পষ্ট থেকে যায়, সেখানে জনতার বয়ানে একটা স্পষ্ট, নামযুক্ত দায়ী পক্ষ বসিয়ে দেয়া হচ্ছে।


লেখক: ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া আরভাইনের
পিএইচডি গবেষক এবং শিক্ষক