Image description

কুমিল্লায় একের পর এক খুন, চুরি-ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত আট মাসে জেলায় ৯৩টি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি অসংখ্য অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। গ্রেপ্তারের পরও আইনের ফাঁক গলে অপরাধীদের কেউ কেউ ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

গত রোববার জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৯৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ডিসেম্বরে ৯টি, জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে ১৭টি, জুনে ১০টি এবং জুলাইয়ে ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২২টি। 

এছাড়া গত ছয় মাসে ৩৩৩টি চুরি, ৩৫টি ডাকাতি ও ১৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৩৯৫টি। পুলিশ ৫১টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে।

কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় কিছুদিন পরপর দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও এ পর্যন্ত নামমাত্র কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদিকে বয়স কম হওয়ায় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবার সক্রিয় হয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রসহ আটক হওয়া কয়েকজন অপরাধীর সঙ্গে পুলিশের ওঠাবসার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এছাড়া বুড়িচং থানার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়িতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সদস্য ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটকের কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, নগরীর প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলিতে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। কারা এদের প্রশ্রয় দিচ্ছে?

কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, মাদকে সয়লাব কুমিল্লার অলিগলি। ছিনতাই বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রতিদিন মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতেও কিশোর গ্যাংয়ের অবস্থান রয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু আমার দেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সমাজের মূল্যবোধেরও সম্পর্ক রয়েছে। গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে লুটপাট ও দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হয়েছে। এই মূল্যবোধের পরিবর্তন হতে সময় লাগবে।

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিঙ্কু বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর তাদের বয়স নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা হয়। এ ক্ষেত্রে স্কুলের সার্টিফিকেটে উল্লেখিত বয়সকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তা না হলে আইনের ফাঁক গলে তারা বেরিয়ে গিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এসব বিষয়ে কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল টিম বাড়ানো হয়েছে । গত মাসে ১৯২ জন ছিনতাইকারীদের আটক করেছি। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা চলছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধপ্রবণতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনের অনুকূল পরিবেশ বিনষ্ট করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন।