স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় দেশের ১০টি জেলায় শুরু হয়েছিল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। ‘মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ কর্মসূচি শীর্ষক এই উদ্যোগ চলমান থাকলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান সুফল মিলছে না। প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবসহ নানামুখী সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো জেলা আত্মহত্যাপ্রবণ জনপদ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই কর্মসূচিটি শুরু হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সমন্বিত করে মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যার চিকিৎসায় ঘাটতি কমানো ছিল এই বিশেষ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
শুরুর দিকে জেলাজুড়ে কয়েক মাস এই কর্মসূচির যাবতীয় কার্যক্রম বেশ জোরালো ছিল। বর্তমানে নানামুখী সংকটে কর্মসূচিটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে মানসিক রোগীর সঙ্গে বাড়ছে আত্মহত্যার ঝুঁকি।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহীন কাউসার এশিয়া পোস্টকে বলেন, মানুষ কোনো ঘটনার জন্য সামাধনের পথ খুঁজে না পেলে নিজেকে দায়ী মনে করতে শুরু করে, তখনই সে মানসিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পেতে একপর্যায়ে মানুষ আত্মহত্যার মতো চরম ও আত্মঘাতী পথ বেছে নেয়।
বাড়ছে মানসিক রোগী
জেলায় প্রতি মাসে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। সাধারণ শারীরিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও চিকিৎসকরা তাদের মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ খুঁজে পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম্পত্য কলহ, অভাব-অনটন, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক এবং প্রেমের সম্পর্কের বিচ্ছেদের মতো বহুমুখী আর্থসামাজিক সংকট মানুষ চরম হতাশা থেকে মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই ধরনের সংকট অবসাদগ্রস্তদের ঠেলে দিচ্ছে আত্মহত্যার দিকে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল উপজেলা শিবগঞ্জে মানসিক রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই উপজেলাতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০০ জন নতুন মানসিক রোগী চিহ্নিত হচ্ছে।
গোমস্তাপুর উপজেলায় প্রতি মাসে গড়ে ৬০-৭০ জন মানসিক রোগী চিহ্নিত হচ্ছে। এ ছাড়া নাচোল উপজেলায় প্রতি মাসে গড়ে ৪০ জন এবং ভোলাহাট উপজেলায় ৮-১০ জন মানসিক রোগী সরকারি হিসাবে শনাক্ত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহীন কাউসার বলেন, শরীরের যেভাবে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন হয়, ঠিক একইভাবে মানসিক স্বাস্থ্যেরও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। মানুষ কখনও হঠাৎ করে বা একদিনে মানসিক অসুস্থতায় ভোগে না। এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে এই রোগে আক্রান্ত হতে থাকে।
তিনি বলেন, একজন মানুষ যখন ক্রমান্বয়ে মানসিক রোগে ঢলে পড়ে, তখন তার আচার-আচরণ ও দৈনন্দিন স্বভাবে কিছু বিশেষ লক্ষণ বা পরিবর্তন প্রকাশ পেতে শুরু করে। পরিবার এবং সমাজের মানুষ যদি একটু সচেতন হয়ে এই লক্ষণগুলো খেয়াল করে এবং তা চেনার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সঠিক সময়ে সহযোগিতা করা সম্ভব।
প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বদলি
প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেও জেলার সরকারি স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্টের অভাব। সাধারণ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে চালু হওয়া ‘মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ এর আওতায় জেলায় মোট ১৩০ জন চিকিৎসককে মানসিক রোগী চিহ্নিতকরণ ও সেবাদানসহ যাবতীয় বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
একইসঙ্গে এই চিকিৎসকদের মধ্য থেকে ১২ জনকে দেওয়া হয়েছিল আরও বিশদ বা উচ্চতর প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরও ৪০ জন নার্সকেও এই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর সরকারি চাকরির নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই ১৩০ জন চিকিৎসকের মধ্যে ১১০ জনই দেশের বিভিন্ন কর্মস্থলে বদলি হয়ে গেছেন।
সেবাগ্রহীতারা বলছেন, বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে গড়ে তোলা এই প্রশিক্ষিত জনবলের সিংহভাগ জেলাটি থেকে চলে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে তীব্র শূন্যতা তৈরি হয়েছে। জেলাজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পুরো আয়োজন ভেস্তে যেতে বসেছে এবং সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। এখন যে কয়েকজন জেলায় কর্মরত আছেন তারাও অন্যান্য রোগীর চাপে মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে প্রায় ব্যর্থ।
এ বিষয়ে জেলায় কর্মরত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ এর প্রোগ্রাম অফিসার ডা. আশরুফুজ্জামান শাহিন বলেন, আমাদের জেলায় যতজন চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তাদের সিংহভাগ বদলি হয়ে গেছেন। এই শূন্যতা পূরণে নতুন আরও দুটি ব্যাচের ৫০ জন চিকিৎসককে শিগগির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
চিকিৎসক-নার্সদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২২ জন শিক্ষককে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এই শিক্ষকরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ের দুই হাজার শিক্ষার্থীকে মানসিক স্বাস্থ্য ও এই বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করেছেন। আগামী দিনের লক্ষ্য আরও তিন হাজার শিক্ষার্থীকে এই বিষয়ে অবগত করা। শিক্ষার্থীদের এই সচেতনতার আওতায় আনা সম্ভব হলে কর্মসূচিটি আরও সফল হবে।
স্থবির ‘টেলি মেন্টাল হেলথ সেবা’ ও ‘মনের জানালা’
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রসারে চালু হওয়া ‘টেলি মেন্টাল হেলথ’ বা অনলাইনে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম গত ২০২৪ সাল থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ঘরে বসে মানসিক রোগ নির্ণয় ও কাউন্সেলিং নেওয়ার যে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার রোগীরা।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে জেলা সদরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় নুতন করে এই সেবাটি চালু করা হয়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন করে এই টেলি মেন্টাল হেলথ সেবা চালু হয়েছিল। জেলার নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আগে থেকেই এই সেবার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় সেটআপ ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখা ছিল।
অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই সেবাটি চালুর পর হাতে গোনা মাত্র কয়েক মাস কোনোমতে এর কার্যক্রম চলেছিল। এরপর ২০২৪ সালের শুরু থেকেই এই আধুনিক চিকিৎসাসেবাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালগুলোতে থাকা মূল্যবান ডিজিটাল যন্ত্রপাতিগুলো এখন পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘মনের জানালা’ কর্নারগুলোর কার্যক্রমও এখন প্রায় বন্ধের পথে। জেলা হাসপাতালের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলাসহ বাকি চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই বিশেষ কর্নারগুলো চালু করা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ে মানসিক রোগীদের চিহ্নিত করে দ্রুত চিকিৎসাসেবা ও কাউন্সেলিং দেওয়াই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে প্রশিক্ষিত জনবলসহ নানা সংকটে ভেস্তে যেতে বসেছে এই মানবিক আয়োজনটি।
সরেজমিনে এসব কর্নারে গিয়ে দেখা গেছে, কর্নারগুলো অধিকাংশ সময় তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে। শুরুতে এই কর্নারগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ দেওয়া হলেও এখন তা মাঝেমধ্যে খোলা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানসিক রোগীরা দিনের পর দিন সরকারি হাসপাতালে এসেও কোনো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না এবং চরম ভোগান্তি নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
সেবাগ্রহীতারা বলছেন, সরকারি এই চিকিৎসাকেন্দ্রে এসে সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে মানুষ বেসরকারি ক্লিনিকে মোটা অঙ্কের ভিজিট দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষজন যেমন চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমন মুখ থুবড়ে পড়ছে জেলার সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন বলেন, বর্তমানে টেলি মেন্টাল হেলথ সেবা বন্ধ রয়েছে এবং এটি পুনরায় চালু করা নিয়ে কাজ করা হবে। তবে এই সেবাটি পুরোপুরি সচল করতে চিকিৎসকদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। এই নেটওয়ার্ক তৈরিতে সফল হলে জেলার তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে পর্যাপ্ত জনবলের ব্যাপক অভাব রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে ৪৮তম বিসিএসের নতুন চিকিৎসকরা যোগদান করেছেন। তাদের মধ্য থেকে ৫০ জনকে ‘মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ এর আওতায় প্রশিক্ষণ দিয়ে জেলার মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে পুনরায় চাঙা করা হবে।