সিলেট নগরের মিতালী আবাসিক এলাকায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় বাবুল মিয়া (৪০) নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার (১২ আগস্ট) বিকাল ৩টার তাকে আটক করা হয়েছে। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বাকীর করেছেন। তিনি একাই তিন জনকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
এর আগে সকালে নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাসার ভেতরে ঢুকে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন- ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা আক্তার (২০)। গৃহকর্মী তাহমিনা নগরীরর জল্লারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফতাব মিয়ার মেয়ে।
বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ওই বাসায় রংমিস্ত্রির কাজ করতেন বাবুল মিয়া। ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ওই বাসায় রংমিস্ত্রির কাজ করতেন। সেই সুবাদে কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঘটনার আগে সকাল ৯টার দিকে বাসার দোতলায় প্রবেশ করেন। এরপর কাজের মেয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন।
তিনি বলেন, ‘এরপর কাজের মেয়ের সঙ্গে রান্নাঘরে যায় বাবুল। তখন তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এ সময় ছুরিকাঘাতে কাজের মেয়েকে হত্যা করে। চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে। স্ত্রীর চিৎকারে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাসার ভেতর থেকে চিৎকার শোনেন প্রতিবেশীরা। পরে আর কোনও সাড়াশব্দ পাননি তারা। সকাল ১০টার দিকে ১১১ নম্বর বাসার দোতলার বারান্দায় রক্ত দেখে পুলিশে খবর দেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং তিন জনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
তবে দুপুরে পুলিশ সাংবাদিক জানিয়েছিল, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। তখনই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতদের বাসা ও পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে কোনও ফুটেজ ধরা পড়েনি খুনি। এমনকি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও কাউকে দেখা যায়নি। তবে পাশের এলাকার যে গলি দিয়ে খুনি পালিয়ে গিয়েছিল, সেখানের সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বাবুলকে শনাক্ত করে আটক করে পুলিশ।
বুধবার রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মূলত বাসার সিসিটিভির ফুটেজ দেখেই খুনিকে শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। তখন বাসার সিসিটিভির ফুটেজের কথা গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ এতে করে খুনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতো। বাসার তিনটি কক্ষে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এর মধ্যে একটির সিসিটিভির ক্যামেরা অকেজো করে দিয়েছিল খুনি। বাকি দুটির ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই ফুটেজের সূত্র ধরেই ৬ ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
তিনি বলেন, প্রথমে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ না পেলেও পরে পুলিশ দুটি রুমের ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। এর সূত্র ধরেই আসামিকে শনাক্ত এবং নজরদারিতে রেখে তার বাসা থেকে আটক করা হয়। ফুটেজের তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় আসামি বিকাল ৩টার দিকে একই পোশাকে নিজের বাসায় প্রবেশ করে। তখন সেও মনে করেছিল, যেহেতু ফুটেজ নেই আর ধরা পড়বে না। কারণ ওই এলাকায় লোডশেডিংয়ের প্রতি নজর রেখে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ওই ব্যক্তি।
বাসার দুটি রুম থেকে উদ্ধার সিসি ক্যামেরার ফুটেজের বরাত দিয়ে উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সকালে গৃহপরিচারিকা তাহমিনা প্রথমে বাসার ছিটকিনি খুলে দেয়। ছিটকিনিটি সেই (গৃহপরিচারিকা) আবার আটকে দেয়। এ সময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে বাবুল। তাহমিনার চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে। স্ত্রীর চিৎকারে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় সাত্তারের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে চাকুর রক্ত বাবুলের পোশাকে লেগে যায় এবং ফ্লোরে রক্ত পড়ে। হত্যাকাণ্ডের সময় বাবুলেরও দুটি হাত রক্তাক্ত হয়। হাতের রক্ত বাসার ফ্লোরে পড়ে। তখন ওয়াশরুম থেকে পানি নিয়ে রক্ত মোছার চেষ্টা করেছিল। শরীরের পোশাকে লাগা রক্তও পরিষ্কার করতে দেখা যায় ফুটেজে। এরপরে বারান্দার ছিটকিনি খুলে দেয়াল টপকে সে বেরিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ধস্তাধস্তি, চাকুর দাগ ও কাপড় অভিন্ন হওয়ায় বাবুলকে সহজে শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যার দায় স্বীকার করেছে। আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রয়োজনে রিমান্ডে নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি। লাশ তিনটি মর্গে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার লাশ তিনটির ময়নাতদন্ত হবে। বাবুলের স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। সে একই এলাকার আনোয়ার মিয়ার কলোনিতে বসবাস করে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, ‘বাবুল মিয়া পেশায় রংমিস্ত্রি এবং একজন কসাই। গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকায় ওই বাসায় তার যাতায়াত ছিল। বুধবার সকালে তাহমিনার সম্মতিতে বাসায় প্রবেশ করে বাবুল। একপর্যায়ে কথা কাটাকাটির জেরে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। তাহমিনাকে হত্যার পর সেখানে সুরাইয়া বেগম ও আব্দুস সাত্তারকে দেখতে পেয়ে তাদেরও গলা কেটে হত্যা করে বাবুল। এরপর বাড়ির বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তার দম্পতি মিতালী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও আওয়ামী লীগের একজন পুরোনো কর্মী হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তাদের। দুই জনই সপরিবারে লন্ডনে থাকেন। মিতালী আবাসিক এলাকা পুরোটা সিসি ক্যামেরা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। তাদের বাসায়ও ছিল নিজস্ব সিসি ক্যামেরা। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটে।