Image description

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষোভ বাড়ছে। কবে গেজেট হবে, কমিশনের সুপারিশের কতটা বাস্তবায়ন করা হবে এবং নতুন বেতনকাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন তারা।

শুধু চাকুরিরত ২১ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, গেজেটের অপেক্ষায় আছেন নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে পেনশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সংশ্লিষ্ট থাকায় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে সুপারিশ বাস্তবায়ন, বিভিন্ন গ্রেডে বেতনের হার এবং কার্যকরের তারিখ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সচিব কমিটির সবশেষ বৈঠক, নতুন প্রশ্ন
পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে আলোচনা চললেও বুধবার (১২ আগস্ট) সচিব কমিটির একটি বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার অংশ নেননি বলে জানা গেছে।

 

বৈঠকে পে-স্কেল নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। অর্থ সচিবের অংশ না নেওয়ার কারণ জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় পে-স্কেল বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক উপসচিব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতির কথা বলা হয়। কিন্তু আমরা কীভাবে সংসার চালাচ্ছি, সেটিও দেখা দরকার। জিনিসপত্রের দাম কি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার কারণেই বাড়ে?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, একেক সময় একেক ধরনের তথ্য শুনছি। কোথাও বলা হচ্ছে নভেম্বরের আগে গেজেট হবে না। আবার আইএমএফের সঙ্গে পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা হবে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। বাস্তবে কী হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন। গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দুশ্চিন্তা কাটছে না।

তিনি বলেন, যেহেতু সরকার নতুন পে-স্কেল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তাই এখন মূল প্রশ্ন হলো কবে থেকে তা কার্যকর হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘কবে বাস্তবায়ন’
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে আগস্টেই গেজেট প্রকাশ হতে পারে এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে।

আবার কেউ কেউ বলছেন, সব প্রক্রিয়া শেষ করে অক্টোবরের আগে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী তথ্যের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তিও বাড়ছে। নির্ভরযোগ্য সরকারি ঘোষণা না আসায় অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ওপর নির্ভর করছেন।

২১ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীর নজর মূলত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেটের দিকে। দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের দাবি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে যত দেরি হবে, ততই জটিলতা তৈরি হতে পারে। এটি কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বিষয় নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অংশই এর সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। তাই সরকারের উচিত দ্রুত গেজেট প্রকাশ করা।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে। এতে তাদের প্রত্যাশা বেড়েছে। কিন্তু বেতন কত বাড়বে, কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে এবং বকেয়া বেতন বা এরিয়ার কীভাবে সমন্বয় হবে এসব এখনো স্পষ্ট নয়।

কমিশনের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়ন হবে
নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশে পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশেষ করে কোন গ্রেডে বেতন কত হবে, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের মধ্যে ব্যবধান কতটা থাকবে, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন চাকরিজীবীরা।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। ২০টি গ্রেড বহাল রাখারও প্রস্তাব ছিল।

তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা বিবেচনায় কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের পথে সরকার হাঁটছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা কাটছাঁট বা পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার কথা ওই কমিটির।

জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা কমিটি
এদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি করে সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটির সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটির প্রধান দায়িত্ব জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা। প্রয়োজনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং অর্থ বিভাগ সচিবালয় সহায়তা দেবে।

আর্থিক চাপ বড় বাধা
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ও বেড়েছে। এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। একইসঙ্গে ডিজেলে ভর্তুকি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপও রয়েছে।

এ অবস্থায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করলে প্রতিবছর সরকারের অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বিষয়টিও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ফলে আর্থিক সক্ষমতা ও চাকরিজীবীদের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রেখে বেতনকাঠামো চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।