দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এর মাত্রা বেশি। বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার নেসকোর আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসার পাশাপাশি কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
ধান কাটাই ও ছাঁটাইয়ের ভরা মৌসুমে প্রয়োজন মতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উপজেলার অধিকাংশ চালকলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় দুই শতাধিক হাসকিং মিল ও ১২টি স্বয়ংক্রিয় চালকল রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটে এসব মিলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এর সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিকও প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদমদীঘিতে মাছ চাষের জন্য রয়েছে অর্ধশতাধিক বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারি ও একটি মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে হ্যাচারিগুলোতে মাছের রেণু উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাবে মাছের রেণু-পোনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন হ্যাচারি মালিকরা।
সান্তাহার শহরের মুসফিক চালকলের মালিক মতিয়ুর রহমান স্বপন বললেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে চালকলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। চাল উৎপাদন কম হলে এর প্রভাব পড়বে বাজারে, বেড়ে যেতে পারে চালের দাম।’
সান্তাহার শহরের একটি স্বয়ংক্রিয় চালকলের মালিক আতিকুর রহমান মিলন বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মিলে চাল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে বাজারে চালের দাম বেড়ে যেতে পারে।’
মৎস্য হ্যাচারি মালিক রবিউল ইসলাম জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাবে মাছের রেণু-পোনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে সান্তাহার শহরে রয়েছে দেশের বৃহত্তম খাদ্য সংরক্ষণাগার। সেখানে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার দুটি সাইলো, প্রায় ৭৩ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি সিএসডি এবং ১২ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার তিনটি এলএসডি খাদ্যগুদাম রয়েছে। দুটি সাইলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সেখানে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা প্রয়োজন। কিন্তু লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় সাইলোতে মজুদ চাল ও গম সংরক্ষণ নিয়েও ঝুঁকি বাড়ছে।
মৎস্য হ্যাচারি মালিকদের তথ্যমতে, হ্যাচারিতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় মাছের রেণু উৎপাদন ও সংরক্ষণে ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এতে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সান্তাহার নেসকো সূত্রে জানা গেছে, নেসকোর আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ২৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট। সান্তাহার নেসকোর আওতায় বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৪৯ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৪৩৯টি আবাসিক ও প্রায় ৭ হাজার বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে। কৃষির সেচে ব্যবহৃত সংযোগ রয়েছে ৫৯২টি।
সান্তাহার নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জল আলী বললেন, ‘চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
স্থানীয়দের মত, নেসকোর আওতাধীন এলাকার তুলনায় পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, কলকারখানা, চালকল, মৎস্য হ্যাচারি ও কৃষি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও মৎস্য উৎপাদন খাত আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।