তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। এর মধ্যেই বিদ্যুতের ভয়াবহ ঘাটতিতে নাকাল জনজীবন। দিনের পর দিন বাড়ছে লোডশেডিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী, ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেনারেটর চালিয়ে বাড়তি জ্বালানি খরচ করতে হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) আওতাধীন দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকাল ১০টায় চাহিদা ছিল ৬৫১ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৫৩৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ১১২ মেগাওয়াট।
ওজোপাডিকোর খুলনা সদর দপ্তরের নির্বাহী পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান মঙ্গলবার সকাল ১১টা পর্যন্ত এ তথ্য জানান।
ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত খুলনায় ২৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। একই সময়ে বরিশালে ২৮, রাজবাড়িতে ১২, কুষ্টিয়ায় ৯ এবং ঝিনাইদহে ৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। মাগুরা ও গোপালগঞ্জে ৪ মেগাওয়াট করে, পটুয়াখালীতে ৩ মেগাওয়াট এবং চুয়াডাঙ্গা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ঝালকাঠিতে ২ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং ছিল। পিরোজপুর ও চরফ্যাশনে ছিল ১ মেগাওয়াট করে।
ওজোপাডিকোর সদর দপ্তরের নির্বাহী পরিচালক জ্যোতিষ চন্দ্র রায় জানান, গতকাল সোমবার খুলনাসহ ২১ জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭১৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ৫৯৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১২২ মেগাওয়াট। তবে এই ঘাটতির কারণ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
শুধু বিদ্যুতের ঘাটতির হিসাবেই নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্প-ব্যবসায়।
খুলনা ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্ট লিমিটেডের কমার্শিয়াল ম্যানেজার গোবিন্দ কুমার বাইতী জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। উৎপাদন চালু রাখতে বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ লিটার তেল প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে জ্বালানি খরচের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মেশিনপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ছয় মাস ধরে তারা লোডশেডিংয়ের ভুক্তভোগী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর মাত্রা আগের তুলনায় আরও বেড়েছে।
শিল্প-কারখানার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। খুলনা মহানগরের নিরালা এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, দিন-রাত সমানতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমে শিশুদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বয়স্করাও গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ১১২ মেগাওয়াট ঘাটতির চাপ সামলাতে গিয়ে লোডশেডিংয়ের বোঝা গিয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ওপর। তীব্র গরমে যখন বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, ঠিক তখনই কেন সরবরাহ পরিস্থিতির এমন অবনতি এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে।
বিদ্যুৎ সংকটে একদিকে যেমন বাসাবাড়িতে চরম দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। জেনারেটরের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং যন্ত্রপাতি ক্ষতির ঝুঁকি সব মিলিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।