লালমনিরহাট সদরের হরিণচওড়া মাঝের চরের রাশেদুল ইসলাম। এসএসসি পাস করেছেন ২০২১ সালে। যাতায়াত দুর্গমতা ও আর্থিক সংকটে পড়াশোনা আর হয়ে ওঠেনি। পাঁচ বছর ধরে এই তরুণ সময় পার করছেন অলস বসে। পাননি কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণও, যার অভিজ্ঞতায় করবেন চাকরি। রাশেদুল বলছিলেন, টাকাপয়সা থাকলে করতেন ব্যবসা। কিন্তু নেই সেই পুঁজিও। এখন ভাবছেন, কৃষিকাজ করবেন গ্রামে।
এটি শুধু রাশেদুলের একার দুর্দশা নয়। এটি দেশের লাখ লাখ তরুণ-যুবার নিত্যদিনের বাস্তবতা। দেশে রয়েছেন এমন এক কোটি তরুণ-যুবা, যারা চাকরি, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ— নেই কোনোটির মধ্যেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বিশ্বব্যাংকসহ দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের শুমারি অনুযায়ী, দেশে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা ৩ কোটি ১৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বলছে, এই বয়সী ৫৫ লাখ ২০ হাজার তরুণ অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়। অর্থাৎ, তারা নেই কাজের মধ্যে, খুঁজছেন না চাকরিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সামনে রয়েছে জনমিতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ কাজে না লাগালে সেটি রূপ নিতে পারে জনমিতিক বোঝায়। কারণ তরুণদের হতাশা শুধু কর্মসংস্থানে নয়; বরং অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গেও যুক্ত।
প্রতি তিন তরুণের একজন নেই কোনো কিছুতেই: আইএলওর ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে যুবাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলেদের বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, মেয়েদের ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের হলো নিটের (নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অর ট্রেইনিং) হার ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিন তরুণের একজন চাকরি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণের বাইরে। এর মধ্যে মেয়েদের হার ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ছেলেদের হার ১১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে চার গুণের বেশি।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের নভেম্বরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ১ কোটি ২৬ লাখ (২৭ দশমিক ১ শতাংশ) যুবা শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ— নেই কোনোটার মধ্যেই। এই বিপুল যুবার মধ্যে ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশই নারী, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ নারী এই সংকটের মধ্যে আছেন।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচ তরুণ নারীর একজন বেকার এবং প্রতি চার শিক্ষিত তরুণ নারীর একজন কাজহীন। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশের অভাব। রংপুরের গঙ্গাচড়ার নোহালীর বাসিন্দা জিন্নাত মনিরা (২৮)। এইচএসসি পাস করেছেন ২০১৬ সালে। এরপর বিয়ে ও সন্তানের জন্ম, এরই মধ্যে ডিগ্রিতে (পাস) ভর্তি হলেও চালু রাখতে পারেননি লেখাপড়া। বললেন, তার মতো অনেক নারী রয়েছেন, যারা ইচ্ছে থাকলেও পাননি কোনো সরকারি প্রশিক্ষণ।
৪২ শতাংশ ডাক পান না ভাইভার: সানেম ও অ্যাকশনএইডের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৮৫ লাখ ৬০ হাজার তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ— কোনোটির মধ্যে নেই। তরুণদের ক্যারিয়ার পছন্দে সরকারি চাকরি শীর্ষে (৩২ শতাংশ), এরপর ব্যবসা বা উদ্যোক্তা (২৯ শতাংশ)। কিন্তু বাস্তবে চাকরির বাজারে প্রবেশ কঠিন। ৬১ শতাংশের নেই আপডেটেড সিভি, ৩০ শতাংশ জানেন না ইমেইল পাঠাতে, ৪৫ শতাংশ চিঠি লিখতে পারেন না কম্পিউটারে। ফলে যারা চাকরির আবেদন করেন, তাদের ৪২ শতাংশ যেতে পারেন না ভাইভা পর্যন্ত। অবশ্য তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং ও বিদেশে কাজকে বিকল্প পথ হিসেবে দেখছে। অর্ধেকের বেশি ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী, কিন্তু ডিজিটাল দক্ষতা, ইংরেজি ও ইন্টারনেটের অভাব বাধা।
সামাজিক ঝুঁকির মুখে তরুণরা: জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যার ৮০ শতাংশ তরুণ (১৮-৩৫ বছর)। প্রায় ৫০ লাখ অনলাইন জুয়ায় সম্পৃক্ত, যা ২০২৭ সালের মধ্যে পৌঁছাতে পারে ২ কোটিতে।
শিক্ষা-কর্মসংস্থানের অমিল: জিইডির মতে, শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে বাড়ছে ব্যবধান। মাধ্যমিক শিক্ষায় বিশ্লেষণী ও ব্যবহারিক দক্ষতার অভাব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে বেড়েছে, শ্রমবাজারের পরিকল্পনা ছাড়াই। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সামাজিকভাবে অবহেলা করা হয়, যদিও এর চাকরির ফলাফল ভালো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সম্পন্নকারীদের মধ্যে প্রায় ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেকার। ২০২৪ সালে আনুমানিক ২৬ লাখ বেকারের মধ্যে ৯ লাখের ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না, যেখানে শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণরা নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। দীর্ঘ সময় কাজের বাইরে থাকলে তরুণদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।’
সংকট আরও বেশি যেখানে: ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) গত জুনে ‘বাংলাদেশে মানবিক সংকটপীড়িত এলাকায় তরুণদের নিট অবস্থার কারণ বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, কক্সবাজারের টেকনাফে ১৪-২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে নিট হার ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি। মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক তরুণদের নিট হার ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ, স্থানীয় তরুণদের মধ্যে তা ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ। নারী তরুণদের নিট হার ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ, পুরুষ তরুণদের ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রান্তিক ও সংকটপীড়িত এলাকায় তরুণদের জন্য টার্গেটেড শিক্ষা ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
সরকারের পরিকল্পনা: পরিকল্পনা কমিশনের কর্তারা বলছেন, কর্মসংস্থাননির্ভর শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে আগামী তিন অর্থবছরে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার বললেন, চলতি অর্থবছরের এসব কৌশলগত লক্ষ্য সামনে রেখে এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরগুলোতেও পরিকল্পিত বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই দপ্তরের আওতায় চলমান ১০টি প্রকল্প। এর মধ্যে চালু রয়েছে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৯ লাখ নিট তরুণকে প্রশিক্ষণ দিতে আর্ন প্রকল্প। এ ছাড়া ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড এবং কর-ভ্যাট ছাড় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য উৎসাহ সৃষ্টি করবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন ও সুশাসনের ওপর।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: তরুণদের এমন নিষ্ক্রিয়তা দেশের অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন বলে মনে করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, সরকারকে যুব কর্মসংস্থানকে একটি জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প ও সেবা খাতের বহুমুখীকরণ এবং বাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষভাবে তরুণ নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।
‘একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সারা জীবন থাকবে না। তাই এখনই তরুণদের শিক্ষা থেকে দক্ষতা এবং দক্ষতা থেকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে নিয়ে যাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’— যোগ করলেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক।