Image description

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও রোববার নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে দলটি। এর পরই সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোন দিকে যাচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় থাকা কোনো নাম, নাকি একেবারে অপ্রত্যাশিত কাউকে বঙ্গভবনের জন্য বেছে নেয় বিএনপি, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

দলটির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। অন্যটি সংগ্রহ করেছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি। তবে এই দুটি ফরম কার নামে জমা দেওয়া হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

আর এখানেই তৈরি হয়েছে মূল রাজনৈতিক কৌতূহল। দুটি ফরম কি শুধু আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি, নাকি এর আড়ালে রয়েছে শেষ মুহূর্তের কৌশল?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আলোচনার কেন্দ্রে কয়েকটি নাম

বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং গত কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম সামনে আসে। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান এবং স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

তবে প্রকাশ্য সূত্রে গত জুলাইয়ের আলোচনায় মির্জা ফখরুল, মঈন খান ছাড়াও খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খানের নামও এসেছে।

মির্জা ফখরুল নিজেও একাধিকবার বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবেন সেটি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। গত ২৫ জুলাই তিনি জানিয়েছিলেন, বিএনপি বৈঠক করবে, স্থায়ী কমিটির সভা হবে এবং এরপরই সিদ্ধান্ত জানা যাবে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার–চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

কেন মির্জা ফখরুল?

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিনের ভূমিকা, সরকার ও দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তার তুলনামূলক সংলাপমুখী ভাবমূর্তি–এসব বিষয় তার পক্ষে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

এমনকি বিএনপির বাইরে থেকেও তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনার আলোচনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্তরে একটি পরিবর্তন আসবে। কারণ তিনি একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। ফলে তাকে বঙ্গভবনে পাঠানো হলে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।

এই জায়গাটিই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মঈন খান কেন আলোচনায়?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খানের নাম রাষ্ট্রপতি পদে নতুন করে আলোচনায় এলেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে তার নাম নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মঈন খানের শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতাও তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রাখছে। উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে তার প্রোফাইলকে শক্তিশালী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজ দুটি ফরম সংগ্রহের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে–বিএনপি কি আগে থেকেই একজনকে চূড়ান্ত করেছে, নাকি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখা হয়েছে?

স্পিকার নির্বাচনের সময়ও তার নাম আলোচনায় ছিল। তখন বিএনপির অভ্যন্তরে তাকে স্পিকার হিসেবে বিবেচনার আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সিদ্ধান্তে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার হন।

এই ঘটনা এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন করে তাৎপর্য পাচ্ছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে–আলোচনায় থাকা নামই যে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিজ্ঞাপন

মঈন খান রাষ্ট্রপতি হলে সেটি হবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নেতাকে সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের পদে বসানোর সিদ্ধান্ত।

আর তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নেওয়া হলে সেটিও বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক হিসেবের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হবে।

হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে ঘিরে অন্য সমীকরণ

হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নামটি এই আলোচনায় কিছুটা আলাদা মাত্রা তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তিনি এরই মধ্যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির দায়িত্ব পালন করছেন।

তার নাম যদি স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতি পদে আসে, তাহলে সেটি হবে এক ধরনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা–ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রপতি।

তবে একই সঙ্গে এটি হতে পারে বড় রাজনৈতিক চমক। কারণ স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া এবং পরে সেই পদে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে।

দুটি ফরম কেন?

রোববার দুটি ফরম সংগ্রহই এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

তবে দুটি ফরম নেওয়া মানেই দুটি নির্দিষ্ট প্রার্থী চূড়ান্ত–এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট হবে যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

অর্থাৎ বিএনপির হাতে এখনো কয়েক দিন সময় রয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা, সম্ভাব্য প্রার্থীর সম্মতি, মনোনয়ন ফরম জমা এবং প্রয়োজন হলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত নাম সামনে আসতে পারে।

ফলে দুটি ফরমকে এখনই দুটি চূড়ান্ত প্রার্থীর ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিকল্প রাখার কৌশলও এর পেছনে থাকতে পারে।

সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে তারেক রহমান?

এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল প্রকাশ্যে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামের মাধ্যমে ঠিক হবে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে দলীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত সমন্বয়কারীর ভূমিকা যে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে থাকবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

আগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও শেষ মুহূর্তে প্রত্যাশার বাইরে নাম আসার নজির তৈরি হয়েছে। স্পিকার হিসেবে মঈন খানের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্বাচিত হন।

ফলে রাষ্ট্রপতি পদেও একই ধরনের কৌশল দেখা যাবে কি না–সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মির্জা ফখরুল, মঈন খান, হাফিজ উদ্দিন–আলোচনায় থাকা নামগুলোর বাইরে শেষ মুহূর্তে অন্য কাউকে সামনে আনা হবে কি না, সেটিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

চমকের রাজনীতি নাকি হিসাবি সিদ্ধান্ত?

রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।

ফলে বিএনপির বিপুল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে দল যাকে মনোনয়ন দেবেন, বাস্তবে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি বিএনপির জন্য শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি সরকারের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য, দলের নেতৃত্বের কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

মির্জা ফখরুলকে বঙ্গভবনে পাঠানো হলে দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসবে। মঈন খানকে বেছে নিলে দলের একজন অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাবেন। আর হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার বর্তমান ভূমিকারই ধারাবাহিকতা তৈরি হবে।

তবে এই তিন নামের বাইরে শেষ মুহূর্তে কোনো নাম সামনে এলে সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় চমক।

আসল নামটি কোথায়?

রোববার দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির প্রস্তুতি দৃশ্যমান হলো। কিন্তু দুটি ফরমের আড়ালে আসল নামটি এখনো অপ্রকাশিত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে আলোচিতদের একটি। অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান দীর্ঘ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে আলোচনায় থাকা আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম। আর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্থায়ীভাবে বঙ্গভবনে রাখার সিদ্ধান্ত এলে সেটি হতে পারে বড় ধরনের রাজনৈতিক চমক।

তার ওপর আজ দুটি ফরম সংগ্রহের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে–বিএনপি কি আগে থেকেই একজনকে চূড়ান্ত করেছে, নাকি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখা হয়েছে?

উত্তর মিলতে অপেক্ষা করতে হবে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার দিন পর্যন্ত।

আর সেই অপেক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গাটি এখন বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকে।