Image description
পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি চেয়েছে কিন্তু কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার উদ্দেশ্যে নয় বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএস মং।
 
রোববার (৯ আগস্ট) সকালে বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী রাজার মাঠে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
 
কেএস মং বলেন, ‘নিজেদের অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাওয়া হয়েছে। পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার সঙ্গে সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি জড়িত। কিন্তু এসব দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি থাকায় পাহাড়ে নানা সংকট এখনো বিদ্যমান।’
 
তিনি জানান, পাহাড়ের মানুষ যখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাংবিধানিক অধিকার ও স্বীকৃতির দাবি জানায়, তখনই পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু ‘ভুঁইফোঁড়’ সংগঠন এর বিরোধিতা করে। এমনকি পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
 
কেএস মং বলেন, ‘তাই স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, এসব অপপ্রচার থেকে বেরিয়ে আসুন। বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।’
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছিল পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতা এবং দেশের সংবিধানকে বিবেচনায় নিয়ে স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করে নিজস্ব শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।’
 
কেএস মং আরও বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির তিন দশক পেরিয়ে গেলেও চুক্তির অন্যতম মূল বিষয় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যক্রম এখনো ঝুলে আছে। আইনের শাসন বা ‘রুল অব ল’ তখনই সার্থক হবে, যখন ভূমি কমিশনকে বিশেষ মহলের প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে কার্যকর করা হবে।’
 
তিনি বলেন, ‘আদিবাসীদের সম্মিলিত ও প্রথাগত ভূমির মালিকানাকে আইনের সুরক্ষায় পরিণত করতে হবে। এর মাধ্যমেই পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।’
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে নানা সংকট বিদ্যমান রয়েছে।’
 
পাহাড়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে কেএস মং বলেন, ‘পাহাড়, বন ও পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদ অতিরিক্ত আহরণ এবং বন ধ্বংস করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অথচ পাহাড়ের মানুষ প্রকৃতিকে শাসন করে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে বসবাস করে। প্রকৃতি থেকে কতটুকু নিতে হবে এবং কীভাবে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে-পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর সেই ঐতিহ্যগত জ্ঞান রয়েছে।’
 
আলোচনা সভায় বক্তারা আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে আদিবাসীদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের অবসানেরও দাবি জানানো হয়।
 
আলোচনায় আদিবাসী ফোরামে সভাপতি ডা. মং উষাথোয়াই সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইং চ প্রু মাস্টার। এছাড়াও আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম রাইটার্স ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ ক্যসামং মারমার সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন মেন রুং ম্রো, আদিবাসী ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক কৃপা ত্রিপুরা, রিপন চক্রবর্তী, জিরকুম সাহু ও উছোমং মারমা।
 
আলোচনা সভা শেষে রাজার মাঠ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি বান্দরবান শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজার মাঠে গিয়ে শেষ হয়। র‍্যালিতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমী, লুসাইসহ ১২টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির তরুণ-তরুনীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনের নেতৃবৃন্ধরা অংশ নেন।