Image description

সরকারের বিশেষ চাঁদাবিরোধী অভিযানেও থামছে না রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি। সময়ের সঙ্গে বাড়ছে চাঁদার হার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি এ বাজারকে ২৮টি ভাগে ভাগ করে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক। দোকান, ফুটপাত, পণ্যবাহী ট্রাক, ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাইক্রোস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন খাত থেকে দিনরাত মিলিয়ে কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পণ্য কেনাবেচায় চাঁদা দেওয়া এখানে অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চাঁদাবিরোধী অভিযান শুরুর পর কয়েকজন চাঁদাবাজ ও লাইনম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে নানা চাপের কারণে অভিযান অনেকটাই থেমে যায়। ব্যবসায়ীরাও চাঁদা দেওয়ার পর অভিযোগ করেন না। ফলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পেট্রোবাংলা থেকে টিসিবি ভবনের দিকে কাঠপট্টির প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ৮-১০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। চশমা জসিম ও ভাগনে ফারুক, সাদ্দাম, রহিম, ফয়সাল ও চশমা মিন্টু এই টাকা তোলেন। তারা রহমানের লোক।

বিআরডিবি ভবনের সামনে রাতে যে অস্থায়ী ফুটপাতের দোকান বসে সেখান থেকে প্রতি রাতে ৩০-৩৫ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে। সাইকেল বাদশার কর্মচারী সুমন এই টাকা তোলেন। চাঁদার ভাগ পান আনোয়ার নামে এক ব্যক্তি। বাপেক্সের সামনের ফুটপাত থেকে প্রতি রাতে চাঁদা ওঠে ৫০-৬০ হাজার টাকা। ইয়াছিন ও শাহিন নামে দুজন এই চাঁদা তোলেন। কিচেন মার্কেট থেকেই প্রতিদিন চাঁদা ওঠে ১০-১২ লাখ টাকা। এনায়েত নামে একজন এই চাঁদা তোলেন। এ মার্কেটে আসা পণ্যবাহী ট্রাক আনলোড করার নামে জিম্মি করে চাঁদা তোলে একটি গ্রুপ। 

চারুলতা রেস্টুরেন্ট ভবন ও এর সামনে বসা অস্থায়ী সবজি ও ফলের দোকান থেকে প্রতিদিন লাখ টাকারও বেশি চাঁদা উঠানো হয়। লাইনম্যান সাদ্দাম ও পানি আলম এই টাকা তোলেন। বড় চারমাথা মোড় থেকে প্রিন্স হোটেল পর্যন্ত এলাকায় চাঁদা তোলেন ফুট মিন্টু, চশমা মন্টু ও ভাগনে ফারুক। এ এলাকা থেকে দৈনিক চাঁদা ওঠে দেড় লাখ টাকার মতো। প্রিন্স হোটেল থেকে কামারপট্টি হয়ে মাছ বাজার পর্যন্ত প্রতি মাসে চাঁদা ওঠে ৫ লাখ টাকা। নাটা আজাদ, মুক্তার, কারেন্ট জসিম ও মিন্টু পর্যায়ক্রমে এই চাঁদা তোলেন। চারুলতা রেস্টুরেন্টের বাঁ পাশের সড়কে মেট্রোস্টেশন পর্যন্ত সড়কে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা চাঁদা তোলেন সাইকেল বাদশা ও গুলিবিদ্ধ মাসুদ। 

প্রগতি বিল্ডিংয়ের সামনে থেকে পূবালী ব্যাংক পর্যন্ত প্রতি দোকান থেকে প্রতি মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এই টাকার ভাগ পান ভাগনে আলম, আওলাদ ও সেলিম। প্রগতি ভবন থেকে সিটি করপোরেশনের অফিস পর্যন্ত ১০ দোকান থেকে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। জঙ্গি রাসেল ও শাহ আলম রাজা এই টাকা ভাগ করে নেন। এ এলাকার ফুটপাতে থাকা ৫ দোকান থেকে চাঁদা তোলেন টাকলা সেলিম ও মশারি শাহিন। ওয়াসার গলির ১৫টি দোকান থেকে মাসে ৩০ হাজার করে চাঁদা তোলেন মিঠু, তাজু ও ফর্সা সেলিম। 

আবু সাঈদের প্লট থেকে নবী সোলায়মানের প্লট পর্যন্ত ১৪টি দোকান থেকে মাসিক ৪৫ হাজার টাকা করে তোলেন শাহ আলম খাঁ ও রাসেল। এই টাকার ভাগ পান কাজী বাবু ও হানিফ মাস্টার। ইত্তেফাক গলি থেকে প্রতি মাসে চাঁদা ওঠে ৬-৭ লাখ টাকা। গলিটি নিয়ন্ত্রণ করেন রাসেল। টাকা তোলেন তাজু ও তার বড় ভাই। ফলপট্টি থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। আওলাদ ও সেলিম তাদের লোক পাঠিয়ে এই চাঁদা তোলেন। হোটেল লা-ভিঞ্চির সামনের ডাবের ১২টি দোকান থেকে মাসে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। দেশি ফলপট্টির ২৭টি দোকান থেকে চাঁদা তোলেন পাতা মহসিন। 

প্রতি দোকানের মাসিক চাঁদার হার ২৫-৩০ হাজার টাকা। কামারপট্টির দোকানগুলো থেকে মাসিক ৪০ হাজার হারে চাঁদা তোলেন মুক্তার। ছোট মাছ বাজার থেকে মাসে চাঁদা ওঠে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। দ্বিতীয় কাঠপট্টি থেকে মাসে চাঁদা ওঠে ২ লাখ টাকা। ডিআইটি ১ নম্বর মার্কেট গলির ৭ দোকান থেকে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলেন মুক্তার। এই টাকার ভাগ পান বিল্লাল হোসেন। পাঁচ তারা মার্কেট (মূল মাছ বাজার) থেকে মাসে ১৮-২০ লাখ টাকা চাঁদা উঠানো হয়। এই চাঁদার ভাগ পান জননী বাবুল ও ফখরুল ইসলাম রবিন। ২ নম্বর ইলেকট্রিক মার্কেটের পশ্চিম পাশ থেকে মাসে চাঁদা ওঠে ১২-১৩ লাখ টাকা।

অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, কারওয়ান বাজার গোলচত্বরের আশপাশে ফুটপাতের ১২০টি দোকান থেকে প্রতিদিন ১০০০ টাকা হারে চাঁদা নেওয়া হয়। জিদান ও রাজু নামে দুজন মাস শেষে এই টাকা এককালীন উত্তোলন করেন। প্রতি মাসের ১-৫ তারিখের মধ্যে এই টাকা তোলা হয়। সোনারগাঁও সিগনাল থেকে পেট্রোবাংলা পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তোলেন লাইনম্যান মিজান। প্রত্যেক দোকান থেকে প্রতি মাসে ৮-১৫ হাজার টাকা তোলা হয়। মিজান জামালের লোক হিসেবে পরিচিত।

এ এলাকার ফুটপাতে স্থানীয় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত রহমানের তিনটি ও চাঁদাবাজ জামালের পাঁচটি দোকান রয়েছে। কর্মচারী রেখে তারা দোকান পরিচালনা করছেন। একুশে টেলিভিশনের গলিতে যে ভ্যানগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন কিশোর গ্যাং লিডার সাব্বির। প্রতিটি ভ্যান থেকে প্রতি রাতে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়।

পেট্রোবাংলার সামনে ফুটপাতের উভয় পাশে ১১টি চায়ের দোকান থেকে মাসে ৫ হাজার করে চাঁদা নেন শরীয়তপুরী বাদশা। পেট্রোবাংলার সামনের সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ৪ হাজার ৫০০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এই চাঁদার ভাগ পান লিটন, মাসুদ, রুবেল, হুসাইন, জামাল, জিএম জাহাঙ্গীর, আক্তার ও রাজন। সিনএজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে কারওয়ান বাজার রেলগেটের দিকে এগুলে মাইক্রোস্ট্যান্ড। এখান থেকে মাসে ৩৫ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। এই টাকা তোলেন মাইক্রো মাসুদ। 

গত মঙ্গলবার গভীর রাতে সরজমিনে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, রাত যত গভীর হয় ততই বাড়ে চাঁদাবাজদের সংখ্যা। বিক্রেতারা বড় অঙ্কের চাঁদা দিলেও ক্রেতাদের কাছ থেকে অল্প পরিমাণ নেওয়া হয়। ওই চাঁদা না দিলে মালামাল নিয়ে বের হতে দেওয়া হয় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, দুই সপ্তাহ আগে ইত্তেফাক গলিতে মোর্শেদ নামে এক সবজি বিক্রেতাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। তার অপরাধ বাড়তি রেটের চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো। তাকে মারধর করার পর অন্য ব্যবসায়ীরা নতুন ধার্য করা চাঁদাই দিচ্ছেন। 

তবে বিএনপি নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যার পর থেকে পাল্টেছে চাঁদা নেওয়ার ধরন। কারও কাছ থেকে মাসিক, কারও কাছ থেকে সাপ্তাহিক হারেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। সবাই পুরোনো ব্যবসায়ী হওয়ায় দীর্ঘ বছরের অভ্যাস মেনে চাঁদা দিচ্ছেন সবাই। তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চাঁদা নেওয়া হচ্ছে-এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর বাইরে আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। চাঁদাবাজ যে-ই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’