বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন নদ-নদীতে মাছ ধরার জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবী ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা সোয়েব খানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বদলির আগে তিনি ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হস্তান্তর ছাড়াই নীরবে কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
এ অভিযোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ২০ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ড। এতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা সোয়েব খানের সঙ্গে কয়েকজন ভুক্তভোগীর কথোপকথন শোনা যায়। কথোপকথনে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং যাদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। ওই সময় নবনিযুক্ত বিট কর্মকর্তা জহির উদ্দিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
অডিওতে সোয়েব খানকে বলতে শোনা যায়, চর বরাদ্দকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষ থেকেই টাকা নেওয়া হয়েছে। যাদের বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কারও এক টাকাও আমার কাছে থাকবে না। সব হিসাব মিটিয়েই আমি এলাকা ছাড়ব।
ভুক্তভোগী জেলে ইলিয়াস পাটোয়ারী বলেন, নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরার প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার আশ্বাসে তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রত্যয়নপত্র না পাওয়ায় তিনি ও আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী গত ২২ জুলাই রাতে বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে টাকা ফেরত চান। ওই বৈঠকের কথোপকথনই গোপনে মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়।
সোয়েব খানের স্থলাভিষিক্ত বিট কর্মকর্তা জহির উদ্দিন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আগের কর্মকর্তার আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তার দাবি, সোয়েব খান কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়েই কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। ফলে টাকা ফেরতের আশায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এখন তার কাছেই ধরনা দিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরতে ট্রলার মালিকদের বন বিভাগের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের জন্য রাজস্ব ফি ৫৭৫ টাকা। অথচ নদী-খালে মাছ ধরা এবং চরাঞ্চল থেকে গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহের অনুমতির কথা বলে জনপ্রতি ২৫ হাজার থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
মৌডুবী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি তানবীন বিশ্বাস অভিযোগ করেন, প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার আশ্বাসে তার কাছ থেকে ৮৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো অনুমোদন না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে দীর্ঘসূত্রতা শুরু হয়। পরে তিনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার একটি ভিডিও বক্তব্য ধারণ করেন।
তার দাবি, ২৫ জুলাই রাঙ্গাবালী উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব নিয়াজ আকনের মাধ্যমে তাকে ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। একইভাবে অন্তত ৩০ জন প্রতারিত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মহাসীন উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, তার কাছ থেকেও এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। নতুন রেঞ্জ কর্মকর্তা আমীর হোসেন যোগ দেওয়ার পর তিনি বিষয়টি তার নজরে আনেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোয়েব খান বলেন, বদলিকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তবে অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত জানাবেন বলে ফোন কেটে দিলেও পরবর্তী সময়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি আর সাড়া দেননি।
রাঙ্গাবালী রেঞ্জ কর্মকর্তা আমীর হোসেন বলেন, তিনি ২২ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরদিন মৌডুবী এলাকায় গেলে স্থানীয় কয়েকজন সোয়েব খানের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার মৌখিক অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগকারীদের কাছ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ বা স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পটুয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জাহিদুর রহমান মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে, গত ৪ আগস্ট ভুঁইয়াকান্দা বাজারে সোয়েব খানের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন ভুক্তভোগী জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা। সেখানে বাদল হাওলাদার, মহাসীন ভূঁইয়া, মনির তালুকদারসহ অর্ধশতাধিক জেলে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ ওঠার পর বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বদলি করেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।