ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বেশ উত্তপ্ত। এরমধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফলে ছাত্র সংসদের নির্বাচনের এক বছরের মাথায় ক্যাম্পাসগুলোতে এমন পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শুধু তাই নয় অধিকাংশ ক্যাম্পাসে শিবির সমর্থিত প্যানেল জয়ী হওয়ায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা নিয়েও অসন্তুষ্ট সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে অনেকটাই ক্ষুব্ধ তারা। তারা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনি ইশতেহারে জয়ীদের ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
জাতীয় নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেলের জয় আলোড়ন তুলেছিল। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনেও জয়ী হয় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। ভিপি ও জিএসসহ বেশ কয়েকটি পদে জয় পায় তারা। নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট শিক্ষার্থীদের জীবনমানে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩৬ দফার নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল সে সময়।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রতিশ্রুতিসমূহ
প্রথম বর্ষ থেকেই সব শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন নিশ্চিত করা, হলের খাবারের মানের উন্নয়ন, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক সেবার ডিজিটালাইজেশন, শিক্ষার্থীদের জন্য আইনি সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণসহ ৩৬ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় শিবিরের প্যানেল থেকে। তবে শিবির-সমর্থিত ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১০ মাস পার হলেও ইশতেহারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
আবাসন সংকট আরও তীব্র
ছাত্রশিবিরের ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল প্রথম বর্ষ থেকেই সব শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে অস্থায়ী আবাসন, আবাসন ভাতা এবং নতুন আবাসিক হল নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মতে, এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এখনো শত শত শিক্ষার্থী হলের আসন পাননি। আবাসিক হলগুলোতে তীব্র আসন সংকট রয়েছে। চারজনের কক্ষে আটজন বা তারও বেশি শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে ঠাঁসাঠাঁসি করে।
খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ
হলের খাবারের মান ভালো করা ছিল ইশতেহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। এতে পুষ্টিবিদের অনুমোদিত ম্যানু, প্রতি তিন মাস অন্তর খাবারের মান পরিদর্শন, অনুষদভিত্তিক মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য মিল ভাউচার চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনগুলোর খাবারের মান এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশের এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনের খাবারে ভাঙা ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, মাছে অতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের অভিযোগে শিক্ষার্থীরা তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় প্রায় সাত দিন ধরে বন্ধ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন।
মাস্টারদা সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, খাবারের মান উন্নয়নে হল প্রশাসন ডাকসুকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখেননি। তিনি বলেন, নতুন ক্যাটারারকে এক মাস পরীক্ষামূলকভাবে মূল্যায়নের কথা থাকলেও কোনো মূল্যায়ন ছাড়াই স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নারীবান্ধব ক্যাম্পাসের প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে। এসবের মধ্যে ছিল নিরাপদ পরিবহন, হলে প্রবেশের নিয়ম শিথিল করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দেখিয়ে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নারী হলে প্রবেশের সুযোগ, অভিভাবকদের জন্য লাউঞ্জ, প্রক্টরিয়াল টিম ও হল স্টাফে নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ব্রেস্টফিডিং রুম এবং শিশু পরিচর্যা কর্নার স্থাপন।
নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সুমাইয়া আক্তার সারা বলেন, হলে প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম এখনো আগের মতোই রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দেখিয়েও আমরা এখনো অন্য নারী হলগুলোতে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি না।’
তার দাবি, ইশতেহারে প্রতিশ্রুত অভিভাবক লাউঞ্জ, ব্রেস্টফিডিং রুম এবং শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র এখনো স্থাপন করা হয়নি। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা। আমার পরিচিত অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছেন।’
অন্যান্য প্রতিশ্রুতিও ভেসতে গেছে
৩৬ দফা প্রতিশ্রুতির আরও বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। ইশতেহারে নিবন্ধিত চালক, নির্ধারিত ভাড়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাস রিকশা ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল। পরিবেশ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলোরও তেমন অগ্রগতি নেই। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে ‘পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ক্যাম্পাস’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের দাবি, জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কিছুটা চললেও বর্তমানে তা আর চোখে পড়ে না। একইভাবে যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে খুব একটা অগ্রগতি পায়নি।
যদিও ডাকসু নেতাদের অনেকে দাবি করছেন, প্রশাসনিক জটিলতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং অর্থসংকটের কারণে অধিকাংশ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।
ডাকসুর ক্যাফেটেরিয়া ও কমনরুম সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, অভিভাবক লাউঞ্জ, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র এবং নারী হলগুলোর জন্য ডিজিটাল প্রবেশ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে তারা স্পন্সর সংগ্রহ করেছিলেন। তবে প্রশাসনিক বিলম্ব ও অনুমোদন না পাওয়ায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি।
তার ভাষ্য, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র, আঙুলের ছাপ বা ফেস রিকগনিশনের মাধ্যমে হলে প্রবেশ করতে পারতেন। তিনি বলেন, ‘একাধিক বৈঠক হলেও হল প্রাধ্যক্ষরা এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মতি দেননি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসব সংকটের বিষয়ে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার নতুন আবাসিক হল নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তার ভাষ্য, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিটি ভবন ২০ তলাবিশিষ্ট করে পুনর্নকশার নির্দেশ দিয়ে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে।
ফরহাদ বলেন, ‘অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে আবাসন সংকটের সমাধান হবে না। নতুন ভবন নির্মাণই একমাত্র টেকসই সমাধান। চলতি বছর প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসন সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানোয় তা বিলম্বিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এক বছরের মধ্যে নতুন হল নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
তবে এমন উচ্চাভিলাসী প্রতিশ্রুতি কেন নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তেমন কিছু বলেননি তিনি।
তিনি আরও বলেন, খাবারের মান নিয়ে ডাকসু পুষ্টিবিদদের একটি প্যানেল গঠন করেছিল। কিন্তু বাজেট সংকটের কারণে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, কলাভবনে একটি ক্যাফেটেরিয়া চালুর অনুমোদন পেতে প্রায় পাঁচ মাস সময় লেগেছে। একই ধরনের প্রকল্প কার্জন হল ও মুকাররম হোসেন খোন্দকার বিজ্ঞান ভবনে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।