Image description

চলতি বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু নাও হতে পারে। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল অক্টোবরে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সূচনা করা। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও রাজনৈতিক সূত্র বলছে, সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত যেতে পারে। যদিও ইসি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। কমিশন বলছে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘অক্টোবরকে লক্ষ্য করেই প্রস্তুতি চলছে। তবে প্রস্তুতি থাকলেই নির্বাচন হবে, এমন নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আবহাওয়া, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত ভোটকেন্দ্র এবং অন্যান্য বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।’

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগস্টের পর অর্থ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ বৈঠকে কোন নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ স্তরই প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে নতুন সরকারও ধাপে ধাপে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। পৌরসভাগুলোতেও একই ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদে এখনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ফিরিয়ে আনতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।

ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন সম্ভব নয়। তাই ধাপে ধাপে ভোট করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সীমানা পুনর্নির্ধারণ, আইন ও বিধিমালা সংশোধন এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা করা হবে না।

নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, আচরণবিধি এবং নীতিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। আগামী ৩১ আগস্ট হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালাও সংশোধন করা হচ্ছে।

তবে নির্বাচন আয়োজনের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণত তৃণমূলে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন এবং আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এবার রক্তপাতহীন নির্বাচন আয়োজনই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের মতো সেনা মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখার সুপারিশ করেছে ইসি।

আবহাওয়াও বড় অনিশ্চয়তার কারণ। সাম্প্রতিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অনেকগুলো ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া অক্টোবর-নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম হওয়ায় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকি রয়েছে। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেছেন, এ সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নির্দিষ্ট পূর্বাভাস সাধারণত ১৫ থেকে ২১ দিন আগে পাওয়া যায়।

প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইও কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে। ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি, তাদের জামিনদার এবং দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে চায় ইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যোগ্যতা যাচাই নিয়ে বিতর্কের পর এবার কমিশন আরও কঠোর হতে চায়। তবে এসব প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে বাম জোট বলছে, শুধু আইন সংশোধন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়েও কমিশনের ওপর চাপ বাড়ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিভিন্ন এলাকায় সীমানা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বললেন, কোথায় কোথায় জটিলতা রয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট মনিরা খান বলেছেন, নির্বাচন এমন সময়ে আয়োজন করা উচিত, যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কম থাকে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। তার মতে, নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।