নাগরিক সেবা আরও সহজ, আধুনিক ও সময় সাশ্রয়ী করতে আবেদনকারীর বাসায় সরাসরি পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার (হোম ডেলিভারি) উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
একইসঙ্গে দেশের ইমিগ্রেশন ও ভিসা ব্যবস্থায় গতি আনতে বড় ধরনের আধুনিকায়ন পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বর্তমানে প্রচলিত স্টিকার ভিসার পরিবর্তে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ‘অনলাইন ভিসা সিস্টেম’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট ৮ লাখ ৭০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা) বরাদ্দের প্রয়োজন ধরা হয়েছে
ঢাকা পোস্টের কাছে থাকা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত সময়, যাতায়াত ও খরচ কমাতে সরাসরি ঘরে বসেই পাসপোর্ট পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেবাটি চালুর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট ৮ লাখ ৭০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা) বরাদ্দের প্রয়োজন ধরা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা) এবং পরবর্তী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-আগস্ট) অবশিষ্ট ৫ লাখ ৮০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা) বরাদ্দের প্রয়োজন হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পাসপোর্ট হোম ডেলিভারি চালুর বিষয়টি এখন নীতিগতভাবে ইতিবাচক বিবেচনায় রয়েছে। নাগরিক সেবা আরও সহজ ও আধুনিক করার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ, নিরাপদ বিতরণব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, পাসপোর্ট একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় নথি। তাই হোম ডেলিভারি ব্যবস্থায় আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই, নিরাপদ হস্তান্তর এবং প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে ট্র্যাক করার ব্যবস্থা রাখা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, পাসপোর্ট নাগরিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র। তাই এর বিতরণব্যবস্থাকে আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব করা সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, হোম ডেলিভারি চালু হলে মানুষের সময় ও ভোগান্তি কমবে, একইসঙ্গে সেবার মানও বাড়বে। তবে পাসপোর্ট যেন ভুল ব্যক্তির হাতে যাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে সে জন্য প্রতিটি ধাপে শক্তিশালী পরিচয় যাচাই (ভেরিফিকেশন), নিরাপদ চেইন অব কাস্টডি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, পাসপোর্ট হোম ডেলিভারি চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি জনবান্ধব পদক্ষেপ। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি জবাবদিহি, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রের দেওয়া একটি সংবেদনশীল পরিচয়পত্র। তাই ডেলিভারির প্রতিটি ধাপে গ্রহণকারী ব্যক্তির পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ভিসা ও ইমিগ্রেশন খাতে বড় আধুনিকায়নের উদ্যোগ
ইমিগ্রেশন ও ভিসা ব্যবস্থায় গতি আনতে বড় ধরনের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে বর্তমানে চালু থাকা স্টিকার ভিসার পরিবর্তে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অনলাইন ভিসা সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রশাসনিক অনুমোদন গ্রহণ ও পাইলটিং (পরীক্ষামূলক) কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ভ্রমণকারীরা সহজেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবেন, যা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবে ভিসা সফটওয়্যার আধুনিকায়ন ছাড়াও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে দক্ষ জনবল পদায়নে ১২১টি নতুন পদের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসে থাকা পাসপোর্টবিহীন বাংলাদেশি নাগরিকরা যাতে জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফিরতে পারেন, সেজন্য সব দূতাবাস থেকে ই-ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর ব্যবস্থা পাইলটিং আকারে চালুরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সেবা সহজ ও দ্রুত করতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর পিএসসির সুপারিশ সাপেক্ষে ১৪ জন সহকারী পরিচালক, ৫ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, ২ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামার এবং ৭ জন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদে নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস কুমিল্লায় গ্রাহকদের অতিরিক্ত চাপ কমাতে কুমিল্লার গৌরীপুরে একটি নতুন ‘পাসপোর্ট প্রসেসিং সেন্টার’ (এপিসি) স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমাবে।
অন্যদিকে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে সেবা আধুনিকায়নে ভিসা ব্যবস্থাপনা চালুর লক্ষ্যে ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে আন্তঃখাত সমন্বয়ের মাধ্যমে ২৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে, যার জন্য সরকারের নতুন করে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না। আর অবশিষ্ট ৩ কোটি টাকা সেবা চার্জ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাত থেকে সংস্থান করা হবে।
এছাড়া, বিদেশে মিশনগুলোতে দক্ষ জনবল পদায়নের উদ্দেশ্যে ১২১টি পদের অনুমোদন মিললে, পরবর্তীতে তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয় রাজস্ব খাত থেকে বহন করা হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, একই সঙ্গে অনলাইন ভিসা, ই-ট্রাভেল পারমিট এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে দক্ষ জনবল নিয়োগের উদ্যোগও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে যাবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল কাজী শরীফ উদ্দিন (অব.) বলেন, অনলাইন ভিসা, ই-ট্রাভেল পারমিট এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে দক্ষ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এসব সেবায় সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের ডেটা প্রোটেকশন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, অনলাইন ভিসা ব্যবস্থা, ই-ট্রাভেল পারমিট এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে দক্ষ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে প্রয়োজন শক্তিশালী আইনগত কাঠামো, স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নাগরিকের তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ। তা না হলে আধুনিকায়নের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে।