দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বেনজীরের জামিন বাতিল করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি অভিজ্ঞ আইনজীবী প্রতিষ্ঠান (ল ফার্ম) নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় আইনি ও তদন্ত-সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শিগগিরই পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল দুবাই সফরে যাবে— যোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আজ রবিবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না—এমন শর্তে জামিন পেয়েছেন বলে সরকার তথ্য পেয়েছে। তবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি জানতে জামিন আদেশের সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
‘বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া ল ফার্মকে বেনজীরের জামিন বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জামিন বাতিল করে দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার আশাবাদী’— যোগ করেন সালাহউদ্দিন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে ল ফার্ম নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পুরো বিষয়টির সমন্বয় করছেন আবুধাবিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। এ জন্য তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র দ্রুত পাঠাতে বলা হয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, শিগগিরই বাংলাদেশ থেকে পুলিশ ও দুদকের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল দুবাই যাবে। তারা স্থানীয় আইনজীবী প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরও জোরদারের উদ্যোগ নেবে।
জানা গেছে, নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে জামিন বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত জামিন বহাল থাকবে নাকি বাতিল হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট আদালত।
এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দুবাইয়ের একটি আদালত বেনজীর আহমেদকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দিয়েছেন। আদালতের শর্ত অনুযায়ী, তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না।
যদিও বাংলাদেশ পুলিশের ইন্টারপোল শাখা (এনসিবি) জানিয়েছে, বেনজীরের জামিন বা মুক্তির বিষয়ে তাদের কাছে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা আসেনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে দুবাই পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলের আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীরের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত করছে দুদক। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা হয়।
সেই নোটিসের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তার করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ১২ জুন ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি জানায়।
এরপর ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেছিলেন, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত বেনজীরকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেবে সরকার।
সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করে প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠানো হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এর এক মাস পর বেনজীরকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ‘নীতিগত সম্মতি’র পাশাপাশি আরও কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দেয় দুবাই পুলিশ।
এই নথি চালাচালির মধ্যেই বেনজীরের জামিনে মুক্তি পাওয়ার খবর এলো, যা তার প্রত্যপর্ণের বিষয়টিই অনিশ্চয়তায় ফেলে দিল।
পাসপোর্টে জালিয়াতি এবং জ্ঞাত-আয়বর্হিভূত সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অভিযোগে বেনজীরের বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতির মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে। বাকি মামলাগুলো তদন্তাধীন।