মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে পাওয়া বাংলাদেশে অশালীন ও অসভ্য ভাষাকে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
তিনি বলেন, এমন সংস্কৃতি নতুন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায় যথাযথভাবে পালনের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর সেগুনবাগিচার কচিকাঁচার মেলা মিলনায়তনে জাগ্রত জুলাই ফোরামের উদ্যোগে ‘শহীদদের আত্মত্যাগ, আমাদের দায় ও নতুন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ইশরাক হোসেন বলেন, নতুন বাংলাদেশের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন দিন আনে দিন খাওয়া মানুষ, একজন পেশাজীবী কিংবা একজন রাজনীতিবিদের কাছে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ভিন্ন হতে পারে। রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব হলো সবার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে এক জায়গায় নিয়ে এসে সবাই যাতে উপকৃত হয়, সেই চেষ্টা করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবার। এটি কোনো এক ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো এক ব্যক্তি বা দল করেনি। বিগত দিনে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছিল এবং একজন ব্যক্তিকে সব কৃতিত্ব দিয়ে দেশ লুটপাট করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আহত ও শহীদদের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর গঠন করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা, খরচ ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত বিষয় সমন্বয় করে নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়া এই অধিদপ্তরের কাজ। তিনি এই অধিদপ্তরের সরাসরি দায়িত্বে রয়েছেন।
জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিতে দেশের যেকোনো হাসপাতাল বাধ্য। তবে অনেক হাসপাতাল প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি হাসপাতালের পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য তাগাদা দিয়েছেন।
ইশরাক বলেন, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে পেয়েছে।
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদদের তালিকা প্রণয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৭ আগস্ট যে সরকার শপথ নিয়েছিল, তাদের পরবর্তী দেড় বছর ছিল শহীদ ও আহতদের তালিকা সঠিকভাবে নির্ণয় ও প্রণয়নের সবচেয়ে ভালো সময়। কারণ তখন ফার্স্ট ইনফরমেশন বা প্রাথমিক তথ্য সহজলভ্য ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময়ে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদল, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত অনেক আহত ব্যক্তি গেজেটভুক্ত হননি। অনেককে ক্যাটাগরিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে পছন্দের ব্যক্তিদের গেজেটভুক্ত করে বিদেশে চিকিৎসায় পাঠানো হয়েছে।
ইশরাক বলেন, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন তথ্য ও নথি তার সামনে এসেছে। এতে গাফিলতি ও পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি তাকে বলতে হচ্ছে। এটি তার কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। বাইরের অডিটের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গেজেটভুক্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ইশরাক বলেন, তিন-চার দিন আগে যাত্রাবাড়ী এলাকায় পাঁচজন শহীদ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আরও দুই শহীদ পরিবারের সঙ্গে তার দেখা হয়। তাদের একজনের স্ত্রী জানান, তার স্বামী এখনো গেজেটভুক্ত হননি। আবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে ফোন করে সাত দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা ডেস্ক খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে আবেদন নেওয়া হবে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর যোগ্য ব্যক্তিদের গেজেটভুক্ত করা হবে।
বিদেশে চিকিৎসারত আহতদের বিষয়ে তিনি বলেন, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী দূতাবাসের মাধ্যমে কোনো বিষয় এলে দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইশরাক রাজনীতিতে অশালীন ভাষার ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি অসভ্য ভাষা ব্যবহার করে সেটিকে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের বক্তব্য ও আচরণ তরুণদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এসব দেখতে থাকলে একসময় তরুণদের কাছে এ ধরনের ভাষা স্বাভাবিক মনে হতে পারে।
ইশরাক বলেন, তারা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? তাদের বাবা-মায়েরা কি তাদের এ ভাষায় কথা বলার শিক্ষা দিয়ে গেছেন? সমালোচনা করা যাবে। কেউ দুর্নীতি করলে তাকে দুর্নীতিবাজ, কেউ চাঁদা তুললে তাকে চাঁদাবাজ এবং কেউ খুন করলে তাকে খুনি বলা যাবে। কিন্তু গালাগালি, অশালীন ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত ভাষা ব্যবহার করে কাউকে হেয় করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, গালাগালিকে স্বাভাবিক করে তোলার যে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে তাদের লড়াই ও প্রতিবাদ। এ ধরনের সংস্কৃতি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের সংস্কৃতির প্রচার বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
ইশরাক বলেন, তারা একটি শ্রদ্ধাশীল জাতি হিসেবে দাঁড়াতে চান। স্বাধীন, সার্বভৌম ও শক্তিশালী বাংলাদেশ এবং গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চান। এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকার ভোগ করবে।
জুলাই অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হবে। যারা এখনো এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি, তাদের দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কর্মক্ষম আহত জুলাই যোদ্ধাদের কর্মদক্ষ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। শহীদ পরিবারগুলোকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে এবং সব সময় গভীর শ্রদ্ধায় তাদের স্মরণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য আইন ও অধিদপ্তর গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মৌখিকভাবে অনুমোদন দিয়েছেন। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।