জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের লক্ষ্যে প্রতি বছর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দরজায় দরজায় ঘোরে ১০ লাখ মানুষ। দিনে এই সংখ্যা দেখা যায় প্রায় তিন হাজার।
জানা গেছে, নানা কারণে এনআইডিতে ভুল সংশোধনে এসব নাগরিক কখনো উপজেলা, কখনো জেলা, আবার কখনো আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে দৌঁড়াচ্ছেন। কাউকে কাউকে আসতে হচ্ছে ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে।
পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. মহসীন আলীর সঙ্গেই কথা হলো নির্বাচন ভবনে। ফরিদপুরের বাসিন্দা এসেছেন মায়ের তথ্য সংশোধনে।
নির্বাচন কমিশনের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২ আগস্ট পর্যন্ত এনআইডি সংশোধনের মোট আবেদন জমা পড়েছে ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি। যেহেতু এনআইডি সংশোধন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলমান, তাই ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৬ বছর ৭ মাসে এই আবেদনগুলো জমা হয়েছে। এ হিসাবে বছরে গড়ে আবেদন পড়েছে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছরে এই আবেদনগুলো জমা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার এবং প্রতি মাসে গড়ে ৮০ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। দিনে আবেদন পড়েছে ২ হাজার ৭০০-এর মতো আবেদন।
জানা গেছে, এনআইডি সংশোধনের বিপুল চাহিদার মধ্যে নির্বাচন কমিশন অধিকাংশ আবেদন নিষ্পত্তি করেছে। মোট আবেদনের মধ্যে ৬২ লাখ ৩০ হাজার ৫৯২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ৯৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৬১ হাজার ১৪৬টি আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন কারণে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫৪টি আবেদন বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৮টি আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, জন্মতারিখ, নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন বাড়লেও অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির কারণে দীর্ঘসূত্রতা আগের তুলনায় কমেছে।
এনআইডি সংশোধনের ৬৫ শতাংশ আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিতে, সবচেয়ে কম ‘খ’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনআইডি সংশোধনের জন্য মোট ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত (ক) ক্যাটাগরিতে জমা হয়েছে ৪১ লাখ ২৭ হাজার ৯৩৭টি আবেদন, যা মোট আবেদনের প্রায় ৬৫ শতাংশ। ফলে এই ক্যাটাগরিতেই সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা হয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবেদন জমা হয়েছে সিনিয়র জেলা বা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত (খ) ক্যাটাগরিতে। এ পর্যায়ে আবেদন সংখ্যা ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৬। মোট আবেদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই ক্যাটাগরির আওতায় পড়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত (গ) ক্যাটাগরিতে ৬ লাখ ২ হাজার ৭১৭টি এবং এনআইডি মহাপরিচালকের (ঘ) ক্যাটাগরিতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮৮টি আবেদন জমা হয়েছে।
অন্যদিকে সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ক-১) ক্যাটাগরিতে আবেদন সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭২ এবং অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার (খ-১) ক্যাটাগরিতে আবেদন সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ১০। সবচেয়ে কম আবেদন পড়েছে অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত খ-১ ক্যাটাগরিতে, প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ। এনআইডি সংশোধনের অধিকাংশ আবেদন মাঠপর্যায়ের উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এখতিয়ারভুক্ত (ক) ক্যাটাগরিতেই নিষ্পত্তির জন্য জমা হচ্ছে। বিপরীতে উচ্চতর পর্যায়ের কিছু ক্যাটাগরিতে আবেদন সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
এনআইডি সংশোধনের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী, ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ—এই ছয় ক্যাটাগরিতে আবেদন নিষ্পত্তি করে থাকে ইসি। এক্ষেত্রে আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক থেকে ঘ পর্যন্ত ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়। আবেদন জমা পড়ার পর নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে থাকেন।
ক-১ ক্যাটাগরি তথা, করণিক ভুল, স্বাক্ষরের পরিবর্তনের মতো আবেদনগুলোর জন্য সহকারী উপজেলা কর্মকর্তাকে নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মূল নাম ঠিক রেখে বানান ঠিক করার মতো আবেদনগুলো ক ক্যাটাগরিতে রাখা হয়, যা সংশোধনের ক্ষমতা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।
আবার বানান পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন হয়ে যায় এমন আবেদনগুলো খ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদনগুলো গ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। ধর্ম পরিবর্তনের কারণে নাম পরিবর্তন বা শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের মতো আবেদনগুলো খ-১ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। এদিকে খ ও খ-১ ক্যাটাগরিতে বাতিল আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। আর বয়স সংশোধনের আবেদন ঘ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির ক্ষমতা কেবল এনআইডি মহাপরিচালকের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদন বাতিল হলে আপিল করার সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে আপিলকারী কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে সচিবকে। সচিবের কাছেও চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সংশোধন হলে কমিশনের কাছে আবার রিভিশন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, অনিয়ম যেমন হয়, তেমনি অসৎ উদ্দেশ্যেও অনেকে সংশোধনের আবেদন করে থাকেন। কাজেই সবকিছুই বিবেচনায় নিয়ে আমাদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে হয়। আগের চেয়ে এখন দ্রুত এনআইডি সংশোধন সেবা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে এনআইডি সংশোধন সংক্রান্ত সেবা সহজ করতে ইতোমধ্যে একটি কমিটিও গঠন করে ইসি। এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালককে (নিবন্ধন ও প্রবাসী) আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটিকে সুপারিশ প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিটির সুপারিশ এলে এনআইডি সেবা আরও সহজ ও দ্রুত হবে।
নামের বানান সংশোধনে যে কাগজপত্র প্রয়োজন
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে- পি.ই.সি.ই/জে.এস.সি/এস.এস.সি/এইচ.এস.সি/ সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ/সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন কার্ড/অ্যাডমিট কার্ড, পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্টার্ড কাজী কর্তৃক প্রদত্ত কাবিননামা/ম্যারেজ সার্টিফিকেট (বিবাহিত হলে), স্বামী/স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র, সন্তানদের জাতীয় পরিচয়পত্র/অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ/শিক্ষা সনদ, সন্তানদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ/সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন কার্ড/অ্যাডমিট কার্ড।
নামের আমূল পরিবর্তনের জন্য যে কাগজপত্র চায় ইসি
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, নাম পরিবর্তনের কারণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখপূর্বক আবেদনকারী কর্তৃক স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র, পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণের (স্বাক্ষর ও এনআইডি নম্বর/জন্ম নিবন্ধন নম্বরসহ) অনাপত্তি পত্র, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে সম্পাদিত হলফনামা, যে সকল বৈধ প্রমাণাদি/দলিলাদি (এক বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে একাধিক) বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে, ক্রোনোলজিক্যাল অর্ডার বা জন্মের ক্রমানুসার উল্লেখপূর্বক ওয়ারিশ/পারিবারিক উত্তরাধিকার সনদ (সকল সদস্যগণের এনআইডি নম্বর/জন্ম নিবন্ধন নম্বরসহ), অফিসার কর্তৃক স্বাক্ষরিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির AFIS যাচাইয়ের রিপোর্ট, রেজিস্টার্ড কাজী কর্তৃক প্রদত্ত কাবিননামা/ম্যারেজ সার্টিফিকেট (বিবাহিত হলে), স্বামী/স্ত্রীর এনআইডি, সন্তানদের এনআইডি/জন্ম সনদ/শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, চাকরিবহি ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অফিস স্মারকে সুপারিশপত্র (চাকরিজীবী হলে), পেনশন বহির সত্যায়িত (সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক) কপি (অবসরপ্রাপ্ত হলে), পাসপোর্ট কপি/প্রবাসী Job ID/Residence Card/ড্রাইভিং লাইসেন্স, অন্যান্য বৈধ দলিলাদি (যদি থাকে), তদন্ত প্রতিবেদন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে- পি.ই.সি.ই/জে.এস.সি/এস.এস.সি/এইচ.এস.সি/সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ/সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন কার্ড/অ্যাডমিট কার্ড।
জন্মতারিখ সংশোধনের জন্য যা চাওয়া হয়
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, জন্ম তারিখ সংশোধনের কারণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখপূর্বক স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র, ক্রোনোলজিক্যাল অর্ডার বা জন্মের ক্রমানুসার উল্লেখপূর্বক ওয়ারিশ/পারিবারিক উত্তরাধিকার সনদ (সকল সদস্যগণের এনআইডি নম্বরসহ), পিতা-মাতার এনআইডি, পিতা/মাতার অনলাইন জন্ম সনদ/মৃত্যু সনদ/পাসপোর্ট (এনআইডি না থাকলে), ভাই-বোনের এনআইডি, ভাই/বোনের জন্ম সনদ/শিক্ষা সনদ/পাসপোর্ট (এনআইডি না থাকলে), রেজিস্টার্ড কাজী কর্তৃক প্রদত্ত কাবিননামা/ম্যারেজ সার্টিফিকেট (বিবাহিত হলে), স্বামী/স্ত্রীর এনআইডি, স্বামী/স্ত্রীর অনলাইন জন্ম সনদ/মৃত্যু সনদ/পাসপোর্ট (এনআইডি না থাকলে), যে সকল বৈধ প্রমাণাদি/দলিলাদি (এক বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে একাধিক), সন্তানদের জন্ম সনদ/শিক্ষা সনদ, সিভিল সার্জন কর্তৃক বয়স প্রমাণের রেডিওলজিক্যাল টেস্ট রিপোর্ট, চাকরিবহি/মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (MPO) এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অফিস স্মারকে সুপারিশ পত্র (চাকরিজীবী হলে), পেনশন বহির সত্যায়িত (সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক) কপি (অবসরপ্রাপ্ত হলে), পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স, মুক্তিযোদ্ধা সনদ কপি (মুক্তিযোদ্ধা হলে), অন্যান্য বৈধ দলিলাদি (যদি থাকে), তদন্ত প্রতিবেদন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে- পি.ই.সি.ই/জে.এস.সি/এস.এস.সি/এইচ.এস.সি সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ/সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন কার্ড/অ্যাডমিট কার্ড ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংশোধন/পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ প্রমাণাদি/দলিলাদি (এক বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে একাধিক)।
দেশে বর্তমানে ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন ভোটার রয়েছে। এদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৩১ জন, নারী ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন। আর হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৪৩ জন। নির্বাচন কমিশন ২০০৮ সাল থেকে করা ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই দেশের নাগরিকদের এনআইডি সরবরাহ করছে।