প্রায় দুই দশক পরে কলকাতায় ফিরেছেন তসলিমা নাসরিন। কলকাতার রবীন্দ্র সদনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাকে সংবর্ধনা দিয়েছেন। গতকাল শনিবার (১ আগস্ট) এ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবাদ মাধ্যমে তিনি তার স্বদেশের স্মৃতি চারণ করেছেন।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ক্যালেন্ডার এগোলেই সমাজ আধুনিক হয় না। হাতে আধুনিক প্রযুক্তি এলেই শহরে উঁচু ভবন উঠলেই সমাজ আধুনিক হয় না। আধুনিক হতে হলে আইন, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রচিন্তাকেও আধুনিক হতে হয়। যারা নিজেদের জন্য আধুনিকতা চান কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য চান মধ্যযুগীয় বিধান তারা মুসলমানের সবচেয়ে বড় শত্রু।
কলকাতায় নিজের ফেরা প্রসঙ্গে তসলিমা বললেন, আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি। এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার প্রায় ১৯ বছর লেগেছে। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয় প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা। প্রতিটি মাস অপেক্ষা, প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ। আজ সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি। আমার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছি।
তিনি বলেছেন, ‘আজ আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা ও সম্মান দিয়েছেন তার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আমাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সেকুলার মিশনের চেয়ারম্যান ওসমান গনি মল্লিক। প্রায় অসম্ভব বলে মনে হওয়া আমার ফেরার বন্ধ দরজায় তিনি প্রথম সাহস করে কড়া নেড়েছিলেন। তাকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমার মঞ্চে আসেন আমার দীর্ঘদিনের শুভাকাঙ্ক্ষী তথাগত রায় শাস্তি ঘোষ মোহিত রায় এবং আজকের অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। মুখ্যমন্ত্রী ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। তার এই উদারতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এ আসলে আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি বিস্মিত, মুগ্ধ, অভিভূত।’
‘আজ এই আনন্দের দিনে বাংলার দুই মনীষী শিবনারায়ণ রায় এবং অম্লান দত্তকে স্মরণ করছি, তারা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমাকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল বলে খুব ব্যথিত হয়েছিলেন। আজকের এই প্রত্যাবর্তন দেখলে নিশ্চয়ই খুব আনন্দিত হতেন। একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে আসতে পুলিশের পাহারা প্রয়োজন হওয়াটাই আমাদের সময়ের এক বেদনাদায়ক সত্য,’ বলছিলেন তসলিমা নাসরিন।
তসলিমার ভাষ্য, ‘আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি যেদিন কোন লেখককে তার লেখার জন্য পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না। কোন মুক্তচিন্তককে সত্য উচ্চারণের অপরাধে দেশ ত্যাগ করতে হবে না। আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে আবারও কৃতজ্ঞ।
১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট দেশ ছেড়েছিলেন আলোচিত, সমালোচিত এই লেখিকা। সেই দিনটি উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তখনকার সরকার। রাতের অন্ধকারে আমার স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর একের পর এক সরকার এসে কিন্তু সেই দরজা আর খুলে নেই। আর মাত্র সাত দিন পর আমার নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হবে। স্বদেশের বাইরে কাটানো সময় এরই মধ্যে স্বদেশে কাটানো সময়কে অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়ে কিন্তু আমার ভেতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি।’