Image description

বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সদস্য সংগ্রহ ও গড়ে তোলার ছিল সুপরিকল্পিত একটি প্রক্রিয়া। পুলিশের দাবি, সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-তরুণদের অল্প টাকার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে ৫০০ কিংবা ১ হাজার টাকার বিনিময়ে ছোটখাটো অপরাধে জড়ানো হতো।

এরপর ধাপে ধাপে তাদের অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে অস্ত্র ব্যবহার শেখানো এবং চাঁদাবাজি, হামলা থেকে শুরু করে হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধে ব্যবহার করা হতো। তদন্তে বাহিনীটির সদস্য সংগ্রহ, সেলভিত্তিক পরিচালনা এবং অপরাধ সংঘটনের কৌশল সম্পর্কে নতুন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাহিনীটি মূলত সমাজের প্রান্তিক, বেকার ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোর-তরুণদের টার্গেট করত। তাদের অনেকেই ছিলেন ফুটপাতে বসবাসকারী, টোকাই, দিনমজুর বা স্কুলছুট। অর্থের লোভ, দ্রুত প্রভাবশালী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাদের দলে ভেড়ানো হতো।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জুনায়েত কাউছার বলেন, শুরুতেই কাউকে বড় অপরাধে জড়ানো হতো না। ছোট ছোট কাজ করিয়ে তাদের আনুগত্য যাচাই করা হতো। পরে ধীরে ধীরে তারা অপরাধচক্রের স্থায়ী সদস্যে পরিণত হতো।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সদস্যদের প্রথম দায়িত্ব ছিল অস্ত্রধারী সদস্যদের সঙ্গে যাওয়া, নজরদারি করা এবং চাঁদা আদায়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন। কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ভবন বা প্রতিষ্ঠানে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ককটেল বিস্ফোরণ, মোটরসাইকেলে গিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা ভাঙচুরের মতো কাজও তাদের দিয়ে করানো হতো।

এসব কাজের জন্য একেকজনকে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতো বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জুনায়েত কাউছার। কয়েকবার এ ধরনের কাজে অংশ নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে অপরাধী চক্রের নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে উঠত। এরপর খাওয়া-দাওয়া, থাকার ব্যবস্থা, মোটরসাইকেল ব্যবহার এবং নিয়মিত হাতখরচসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হতো।

নগর পুলিশের ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, এই পর্যায়ে এসে অনেকেই অপরাধকেই নিজের পেশা হিসেবে ভাবতে শুরু করত। ফলে তাদের আর সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব হতো না।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, আনুগত্য নিশ্চিত হওয়ার পর সদস্যদের অস্ত্র ব্যবহার শেখানো হতো। প্রথমে অস্ত্র বহন, পরে ফাঁকা গুলি ছোড়া এবং শেষ পর্যন্ত হামলায় অংশ নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হতো। বাহিনীর অভিজ্ঞ শুটারদের তত্ত্বাবধানে নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পরে তাদের হত্যাচেষ্টা, গুলিবর্ষণ ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলার মতো ঘটনায় ব্যবহার করা হতো বলে পুলিশের দাবি।

কেন সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের টার্গেট

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের তরুণদের বেশিরভাগেরই স্থায়ী আয় বা পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কম থাকে। ফলে অল্প টাকার বিনিময়ে তাদের অপরাধে ব্যবহার করা তুলনামূলক সহজ হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা পাল বলেন, একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষকে অপরাধে জড়ানো কঠিন। কিন্তু অসহায় ও দরিদ্র কিশোরদের অনেকেই কয়েকশ টাকা পেলেই ঝুঁকি নিতে রাজি হয়ে যায়। অপরাধচক্রগুলো সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।

 

ডেভিড ইমনের ভূমিকা

পুলিশের দাবি, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন সাজ্জাদ বাহিনীর হয়ে নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ে অপরাধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বাহিনীর দ্বিতীয় সারির নেতা হিসেবে তিনি বিভিন্ন অভিযানে সদস্যদের সমন্বয় করতেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাহিনীর সদস্যদের সবাই এক জায়গায় কাজ করতেন না। চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া হতো। প্রতিটি গ্রুপ স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা আদায়, প্রতিপক্ষের গতিবিধি নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে হামলায় অংশ নিত।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জুনায়েত কাউছার বলেন, ডেভিড ইমনের মাধ্যমে বড় সাজ্জাদ নগরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতেন। আর রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন রায়হান আলম।

তিনি বলেন, বাহিনীটি সেলভিত্তিকভাবে পরিচালিত হতো। অনেক সদস্য একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেনও না। ফলে একজন ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক সহজে প্রকাশ পেত না।

পুলিশের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত সাজ্জাদ আলী খান সরাসরি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। মধ্যম সারির কয়েকজন সমন্বয়কারীর মাধ্যমে তার নির্দেশ মাঠপর্যায়ে পৌঁছাত। ডেভিড ইমন এমনই একজন সমন্বয়কারী ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। নতুন সদস্যদের কাজে লাগানো, হামলার সমন্বয় এবং অর্থ বণ্টনের দায়িত্বও তার ওপর ছিল।

 

নাছির বাহিনী থেকে সাজ্জাদের উত্থান

পুলিশের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড ছিল শিবির ক্যাডার নাছিরের নিয়ন্ত্রণে। ওই সময় নাছির বাহিনীর তরুণ সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সাজ্জাদ আলী খান। সময়ের সঙ্গে তিনি শুধু নাছির বাহিনীর ফিল্ড অপারেটরই নন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

নাছিরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কে সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন গিট্টু নাছির, হাবিব খান, আহমুদুল হক, হুমায়ুন, ইয়াকুব, বাইট্টা আলমগীর, দেলওয়ার ওরফে ‘আজরাইল দেলওয়ার’, ‘ফাইভ স্টার’ জসিম, ছোট্ট সাইফুল, বাইট্টা ইউসুফ, বিলাই সাইফুল, বিডিআর সেলিম, ভাগিনা রমজান, তসলিম উদ্দিন মন্টু, মনজুর আলম ও সারওয়ার আলম।

১৯৯১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ক্রসফায়ার, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পাল্টা হামলায় নাছির বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কেউ নিহত হন, কেউ দেশ ছাড়েন, আবার কেউ কারাগারে যান। তবে সাজ্জাদ প্রায় সব সংঘর্ষ থেকেই বেঁচে যান এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। নাছির বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগে তিনি নতুন করে নিজের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

 

বাহিনীর আলোচিত সদস্যরা

পুলিশের তথ্যমতে, ২০০০ সালের পর সাজ্জাদ বাহিনীর প্রথম সারিতে ছিলেন নুরনবী ম্যাক্সন, সরওয়ার হোসেন (পরে সরওয়ার বাবলা) ও আকবর আলী। পরে গিট্টু মানিকসহ আরো কয়েকজন এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হন।

সাম্প্রতিক সময়ে ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন, রায়হান আলম, বোরহান উদ্দিন এবং শহিদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যাকে বাহিনীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলম বলেন, পুরোনো সদস্য নিহত, গ্রেপ্তার বা দলত্যাগ করলে তাদের জায়গায় নতুন সদস্যদের আনা হতো। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে তাদের দায়িত্ব বাড়ানো হতো। প্রথমে তথ্য সংগ্রহ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন, পরে চাঁদাবাজি, অস্ত্র বহন এবং শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।