দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হলেও সময়মতো রোগ নির্ণয়, আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি এবং সীমিত চিকিৎসাসুবিধার কারণে হাজারো রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। জটিল এই রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে মধ্যবিত্তরা হচ্ছেন দরিদ্র আর দরিদ্ররা হচ্ছেন নিঃস্ব। আবার আয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয় হওয়ায় মাঝপথেই থমকে যাচ্ছে অনেকের জীবন। ফলে অকালে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। যদিও বেসরকারি হাসপাতালে রোবোটিক সার্জারি, টার্গেটেড থেরাপিসহ আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে, তবে ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে বিদেশমুখী হচ্ছেন রোগীরা।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩ থেকে ১৫ লাখ ক্যানসার রোগী রয়েছেন। বছরে প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে মারা যান। দেশে ৩৮ ধরনের ক্যানসার শনাক্ত হলেও পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, খাদ্যনালি, মুখ ও ঠোঁট এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর প্রায় ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন, যাদের প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হয়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ক্যানসারে আক্রান্তদের ৯৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৭৫ বছর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি এবং রোগের ধরন ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে রোগ শেষ বা অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছালে সম্পূর্ণ নিরাময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার অপ্রতুলতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং জনসচেতনতার স্বল্পতায় ক্যানসারে মৃত্যুর হার বাড়ছে। পাশাপাশি তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বায়ুদূষণেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তাদের মতে, বেসরকারি হাসপাতালে ক্যানসারের ভালো চিকিৎসা হলেও ব্যয় খুব বেশি। ফলে অধিকাংশ রোগীর পক্ষে এ ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ রোগীই আর্থিক সংকটে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন। তাই রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ, আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া ক্যানসার মোকাবিলা সম্ভব নয়।
পরিসংখ্যান যা বলছে
দেশে ৩৮ ধরনের ক্যানসারের মধ্যে স্তন, মুখ ও মুখগহ্বর, পাকস্থলী, শ্বাসনালি ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ৫৩ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। মৃতদের মধ্যে ফুসফুস, শ্বাসনালি ও পাকস্থলীর ক্যানসারে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের ‘ক্যানসার বার্ডেন ইন বাংলাদেশ : অ্যাভিডেন্স ফ্রম আ পপুলেশন-বেসড ক্যানসার রেজিস্ট্রি’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ২ লাখ ১ হাজার ৬৬৮ জনের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। রোগীদের মধ্যে শিশু রয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ৭৫ বছরের বেশি বয়সি ৫ দশমিক ১ শতাংশ। পুরুষ ক্যানসার রোগীদের ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ ধূমপায়ী এবং ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত পাঁচ ধরনের ক্যানসার হলো—স্তন ক্যানসার (১৬ দশমিক ৮ শতাংশ), ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসার (৮ দশমিক ৪ শতাংশ), পাকস্থলীর ক্যানসার (৭ শতাংশ), কণ্ঠনালির ক্যানসার (৭ শতাংশ) এবং জরায়ু ক্যানসার (৫ দশমিক ১ শতাংশ)। আবার নারীদের ১৯ শতাংশ প্রজনন অঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্ত। ক্যানসার রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ ও স্ট্রোকের মতো অন্যান্য রোগও উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশই মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে। প্রতি বছর ২৫ হাজারের বেশি মানুষ এ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা মোট আক্রান্তের ১৫ শতাংশের বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার। এর পরেই রয়েছে ফুসফুস, স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার।
চিকিৎসায় যন্ত্রপাতির সংকট
দেশে ক্যানসার চিকিৎসার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি। বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। জেলা পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই বললেই চলে। রোগ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় সিটিস্ক্যান, এমআরআই, মেমোগ্রাফি ও পিইটি-সিটি সুবিধার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রেডিওথেরাপি মেশিনের সংকটে রোগীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, দেশের অন্তত ৫০ শতাংশ ক্যানসার রোগীর অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়। আবার মোট রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য রেডিওথেরাপি অপরিহার্য। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসা প্রদানকারী ৯টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে মাত্র ১২টি রেডিওথেরাপি মেশিন। এর মধ্যে কয়েকটি মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো মুমূর্ষু রোগী।
সরেজমিন দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি ক্যানসার হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ক্যানসার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির বেশিরভাগই বর্তমানে অচল। এর মধ্যে ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে পাঁচটি নষ্ট। চারটি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর মেশিনের মাত্র একটি সচল, একটি সম্প্রতি বিকল হয়েছে এবং বাকি দুটির আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে। একই ভাবে দুটি কোবাল্ট-৬০ মেশিনও বাতিল হয়েছে। বর্তমানে ব্র্যাকিথেরাপি সেবা দেওয়া হচ্ছে একটি সচল যন্ত্রের মাধ্যমে। ফলে সিরিয়াল পেতে অধিকাংশ রোগীকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে বিএমইউতেও। এখানে একটি মাত্র লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর (লিনাক) মেশিন সচল রয়েছে। এতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ জন রোগী চিকিৎসা পেলেও অপেক্ষমাণ থাকেন কয়েকশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি মেশিন নষ্ট থাকায় অনকোলজি বিভাগ চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারছে না। একটি কোবাল্ট ও একটি ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন দিয়ে কোনোমতে সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দুটি লিনাক মেশিন রয়েছে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি করে কোবাল্ট মেশিন রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকটি লিনাক মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় রয়েছে। রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই রেডিওথেরাপি সেবা নেই। তবে বেসরকারি পর্যায়ে আহছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল, ডেল্টা, স্কয়ার, ল্যাবএইডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রেডিওথেরাপি সেবা থাকলেও চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
পিইটি-সিটি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট
ক্যানসার শনাক্তের আধুনিক পরীক্ষা পিইটি-সিটি (পজিট্রন ইমিশন টমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি) প্রযুক্তিতেও বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। জানা গেছে, দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র ১২টি পিইটি-সিটি কেন্দ্র রয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের জন্য প্রতি এক কোটি ৫৫ লাখের জন্য একটি স্ক্যানার রয়েছে। অথচ একজন রোগীর চিকিৎসায় গড়ে অন্তত তিনবার পিইটি-সিটি স্ক্যান প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক রোগীকেই চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে অনেকের ক্যানসার আরো ছড়িয়ে পড়ে এবং অকালেই মারা যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০ জন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, ১০০ জন গাইনি ও সার্জিক্যাল অনকোলজি বিশেষজ্ঞ, ৫০ জন মেডিকেল অনকোলজিস্ট এবং প্রায় ২০০ জন নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কর্মরত আছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তবে এ সংকট কাটাতে সরকার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি আট বিভাগে নির্মাণাধীন আটটি ক্যানসার হাসপাতালের কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে।
চিকিৎসার ব্যয়ে নিঃস্ব পরিবার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশে সে তুলনায় চিকিৎসা অবকাঠামো এখনো অনেক পিছিয়ে। চিকিৎসকরা জানান, রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা জরুরি। দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় সাত খেবে ১২ লাখ টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। ফলে অনেক পরিবার জমি, গহনা ও সঞ্চয় বিক্রি করেও চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছে না। আর্থিক সংকটে অনেকেই মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) চলতি বছরের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৪১ দশমিক ৩৫ শতাংশ রোগী বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে গিয়ে ৫৪ শতাংশ রোগী কর্মীদের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেছেন। দীর্ঘদিন যন্ত্রপাতি বিকল থাকা, ওষুধের সংকট এবং জনবল ঘাটতিও সেবার মান ব্যাহত করছে।
জানা গেছে, দেশের সরকারি হাসপাতালে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় একটি রেডিওথেরাপি কোর্স সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও একই চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও শয্যা সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং পরীক্ষার জটিলতায় পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হয়। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির জন্য অনেক ক্ষেত্রে আট থেকে ১০ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ময়মনসিংহের ত্রিশালের জয়নাল হোসেন জানান, দীর্ঘদিন রোগ শনাক্ত না হওয়ায় সাত-আট মাসের চিকিৎসায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। একপর্যায়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমিও বিক্রি করতে হয়েছে।
পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত যশোরের কৃষক আবদুল খালেক বলেন, প্রতিটি কেমোথেরাপিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং মাসে ওষুধে আরো ১০-১৫ হাজার টাকা লাগে। অর্থাভাবে এখন নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছি না।
ক্যানসারে মারা যাওয়া সোলায়মান হোসেনের ভাই মিজান মিয়া জানান, সরকারি হাসপাতালে ভোগান্তির পর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ধারদেনা করেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়। ছয় মাস আগে ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। তার দুটি বাচ্চা আছে, তারা এখন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত ৬০-৭০ শতাংশ রোগীর রোগ শনাক্ত হয় শেষপর্যায়ে। এর সঙ্গে আর্থিক সংকট ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রোগীদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা বলছেন, উন্নত সেবা ও রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে না।
দেশে ক্যানসার চিকিৎসার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন আমার দেশকে বলেন, ক্যানসার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হলেও সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন।
ক্যানসার প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদারের পাশাপাশি জাতীয় ক্যানসার নিবন্ধন কর্মসূচি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ক্যানসারের ধরন, আক্রান্ত এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ক্যানসার চিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে দেশের সব বিভাগে সহজলভ্য করার পরামর্শও দেন তিনি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন আমার দেশকে বলেন, দেশে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতায় তুলনায় রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেশি। চিকিৎসা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ক্যানসারের প্রাথমিক স্ক্রিনিং (শনাক্তকরণ) ও ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিভাগীয় পর্যায়ে নির্মাণাধীন ক্যানসার হাসপাতালগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করে সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আহ্বান জানান তিনি।
ইউনাইটেড হাসপাতালের জিএম (কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী খান আমার দেশকে বলেন, দেশে ডায়াগনসিস ও জনসচেতনতার অভাবে ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুর হার বাড়ছে। আবার রোগীর তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা ও অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের ঘাটতি, আধুনিক ইকুইপমেন্টের অভাব, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসায় দেরি হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীদের রেডিওথেরাপিসহ বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। আবার বেসরকারিতে গেলে খরচ খুব বেশি। ফলে অনেকের পক্ষে এ ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামো, মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
দেশে ক্যানসার রোগী বাড়ার কারণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, অতিমাত্রায় তামাক সেবন, আবহাওয়ার পরির্তন, খাদ্যে ভেজাল, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি বাড়ছে। আবার তারা কায়িক পরিশ্রম কম করায় ওজন বাড়ছে, ফলে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ছে। এছাড়া অসংক্রামক রোগ ডায়াবেটিস, পাকস্থলীর সমস্যা এবং খাদ্যাভ্যাসসহ মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার কারণেই ক্যানসার বাড়ছে। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে জীবনধারা পরিবর্তন জরুরি।