একদিকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো খেলাপি ঋণের পাহাড় ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক পরিচালনায় দুর্বলতা, অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়া—এই ত্রিমুখী চাপে বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংক খাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স আটকে থাকা এবং দায়ী পরিচালকদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান। সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক খাত এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, অনিয়ম তদন্ত, বিশেষ নিরীক্ষা, নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো এবং আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু আইন বা নীতিমালা পরিবর্তন করলেই হবে না; সংকট কাটাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় খেলাপি ঋণ আদায়ে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠক করেছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। নেওয়া হয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এসব কর্মপরিকল্পনার আলোকে নতুন করে ঋণ পুনঃতপশিলে আর বিশেষ কোনো নীতিমালা হবে না। গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় অন্তত মূল ঋণ আদায় করতে হবে। এ কারণে আয় খাতে নেওয়া সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত শিথিল নিয়মে ঋণ পরিশোধ করা যাবে। তবে আগামী বছর থেকে কঠোরতার অংশ হিসেবে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান যুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, যেসব খেলাপি গ্রহীতা নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাদের নাম, ছবিসহ তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ তালিকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন বিমানবন্দর, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখার সামনে টানিয়ে রাখা হবে।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের আলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি নির্ধারণ করা হবে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে প্রভিশন ঘাটতি পূরণ এবং প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণের জন্য পরিচালনায় যুক্তদের নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হবে। ওই সময়ের মধ্যে মূলধন পূরণ করতে না পারলে পরিচালকরা মালিকানা হারাবেন। যারা পরিচালনা পর্ষদ থেকে একবার বের হবেন, তারা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পরিচালক হতে পারবেন না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাত সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, এখন সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও খুচরা ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেও ঋণ খেলাপির প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ এখন ব্যাংকিং খাতের নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ-সংবলিত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার। এক বছর আগে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি হিসাব দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, এটি শুধু ব্যাংকের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সতর্ক সংকেত। কারণ এসব হিসাবের বড় অংশই সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এসএমই উদ্যোক্তা, কৃষক এবং ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতাদের।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় করপোরেট ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ পড়ে। কিন্তু লাখ লাখ ছোট ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে পড়া আরও গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এতে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের আয়, সঞ্চয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ, এসএমই খাতের ধীরগতি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় আয় কমে যাওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। এর ফলে কৃষি ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, কয়েক বছর আগেও ব্যক্তিগত ঋণের কিস্তি পরিশোধে যে শৃঙ্খলা ছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ফলে খুচরা ঋণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট বকেয়া ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানের আরও অবনতি নির্দেশ করছে। খেলাপি ঋণ বাড়লে নতুন ঋণ বিতরণ, মুনাফা, মূলধন সংরক্ষণ এবং আমানতকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংকে দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অপর্যাপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অনিয়মিত ঋণ বিতরণের কারণে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোয় কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ মূল্যায়নের উন্নত পদ্ধতির কারণে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি কুটির শিল্প খাতে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে পৌঁছেছে রেকর্ড ৫২ দশমিক ৮ শতাংশে। এ ছাড়া পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, কৃষি, সেবা ও শিল্প খাতসহ প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেই খেলাপি ঋণের হার সমানভাবে বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বকেয়া ঋণ পুনরুদ্ধার করা, কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন এবং ভবিষ্যতে নতুন ঋণ বিতরণ করার স্বাভাবিক সক্ষমতা নিয়ে তীব্র নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদগুলোর কাছে কঠোর বার্তা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাফ জানিয়ে দিয়েছে, দেওয়া সুযোগ ও শিথিল নীতিমালা কাজে লাগিয়েও যদি খেলাপি ঋণ কমানো না যায়, তাহলে দায়ী পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন বা পরিচালক অপসারণের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। ব্যাংক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ অবস্থানকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা চালুর উদ্যোগও প্রায় এক বছর ধরে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২টি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ব্যাংকের আবেদন গ্রহণ করে। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ অনেক দূর এগোলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের মধ্যে নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া এই মুহূর্তে যৌক্তিক হবে না। অর্থনীতিবিদদেরও অনেকেই একই মত দিয়েছেন। তাদের মতে, নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আগে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে সুস্থ করা জরুরি। অন্যথায় নতুন ব্যাংকও একই সমস্যায় পড়তে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের দুটি দিক রয়েছে। একদিকে রয়েছে বড় করপোরেট ঋণখেলাপিদের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অন্যদিকে যুক্ত হয়েছে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার আর্থিক দুর্বলতা। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু বড় ঋণ আদায় করলেই হবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও সাধারণ গ্রাহকদের আয় বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের শীর্ষ ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান, সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন কালবেলাকে বলেন, ‘প্রচলিত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। ব্যাংক খাতে আস্থাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে কোনো পরিস্থিতিতে গ্রাহকের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখা এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম নিশ্চিত করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ-সংক্রান্ত বিষয়টি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। আশা করি, সংশ্লিষ্টরা এমন সিদ্ধান্তই নেবেন, যা আমানতকারী, ব্যবসায়ী এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য কল্যাণকর হবে।’
অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক কালবেলাকে বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য প্রায় এক ডজন কমিশন গঠন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে একাধিক সংস্কার কর্মসূচিও বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৯ সালে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিশনের ১০ শতাংশ সুপারিশও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এর ফল হলো আজ বাংলাদেশ খেলাপি ঋণের দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে, আর দেশের ব্যাংকিং খাতের গড় মূলধন সংরক্ষণ হার প্রায় ঋণাত্মক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।
তার ভাষ্য, প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে ব্যাংক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, অনেক ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়েছে এবং কিছু ব্যাংক টিকে আছে জনগণের করের অর্থের সহায়তায়। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে। এত সীমিত কর আহরণের মধ্যেও দুর্বল ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে জনগণের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একটাই—কাগজের সংস্কার নয়, বাস্তবায়িত সংস্কার। অতীতের কমিশনগুলোর সুপারিশ যেভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। জনগণ চায়, সংস্কারের বাস্তব ফল অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হোক, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরুক, রাষ্ট্র উপকৃত হোক এবং দেশের অর্থনীতি টেকসইভাবে এগিয়ে যাক।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। যদিও কিছু আমানতকারী এখনো তাদের চাহিদামতো অর্থ উত্তোলন করতে না পারায় হতাশা রয়েছে, তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব নিয়ে তাদের তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এই সহায়তার একটি অংশ সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ ভবিষ্যতে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। ফলে গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান, তারা যদি কিছুটা ধৈর্য ধারণ করেন, তাহলে বর্তমান সংকট ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বৈদেশিক লেনদেন আরও সহজ ও দ্রুত করতে নতুন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য এক্সিট প্ল্যান ও পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে তারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ফিরতে পারেন। এ ছাড়া আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য সহায়তাও অব্যাহত রয়েছে।
মুখপাত্র বলেন, ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংক একসময় অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। যেসব ব্যাংক স্বতন্ত্রভাবে টিকে থাকতে পারছিল না, সেগুলোকে একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ার আওতায় এনে শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শরিয়াহ বোর্ড পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং সেখানে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সার্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং খাত আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও জনআস্থাভিত্তিক হয়ে উঠবে।