বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস কার্যত জোট থেকে সরে যাওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য এখন বাস্তবে ৯ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলনে এখনো ‘১১ দলীয় ঐক্য’র ব্যানারই ব্যবহার করছে জোটটি।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৯টি দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও বৈঠক শেষে জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের কাছে এটিকে ‘১১ দলের কর্মসূচি’ বলেই উল্লেখ করেন।
লিয়াজোঁ কমিটির ওই বৈঠকে এলডিপি, জাগপা, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও বিডিপির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’—অর্থাৎ ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট এক জায়গায় আনার লক্ষ্য নিয়ে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল সমঝোতার ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতেও যৌথ কর্মসূচি পালন করে দলগুলো। তবে তফসিল ঘোষণার পর আন্দোলনের পরিবর্তে নির্বাচনী প্রস্তুতিকেই অগ্রাধিকার দেয় জোট।
পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যুক্ত হলে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১২টিতে। কিন্তু আসন বণ্টন ও রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধের জেরে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। এরপর বাকি দলগুলোকে নিয়ে জামায়াত ঘোষণা দেয় ১১ দলীয় ঐক্যের।
তবে নির্বাচন চলাকালেই নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে শরিকদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দেয়। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেই অস্বস্তি ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে গত ২৫ জুলাই। ওইদিন রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ খসরু স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১১ দলীয় ঐক্য ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা। নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐক্যের কার্যকারিতাও শেষ হয়েছে। ফলে এখন থেকে জোটের কোনো সভা, সমাবেশ বা কর্মসূচিতে অংশ নেবে না খেলাফত মজলিস। তবে দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে ভবিষ্যতে নতুন কোনো রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন হলে তা বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণেরও আভাস মিলছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দলের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে প্রতিটি দলকে লিখিতভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে। এরপর একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা নতুন জোট গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনাও রয়েছে যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্ভাব্য এই নতুন জোটে আগ্রহী।
কেন সরে গেল দুই দল
সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার ভাষ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা ও সংরক্ষিত নারী আসনে প্রত্যাশা অনুযায়ী ছাড় না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব তৈরি হয়। পরে জোটে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগও শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। পাশাপাশি উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও দুই দলের জোট ছাড়ার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী বলেছেন, ‘এটি মূলত নির্বাচনী সমঝোতা ছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় আমরা আলাদাভাবে নির্বাচন করেছি। সে সময় থেকেই কার্যত আমরা জোটে নেই। তখন থেকেই ১১ দলের কোনো বৈঠক বা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছি না।’
তবুও কেন ১১ দল?
জোটের নেতাদের দাবি, দুই দল আনুষ্ঠানিকভাবে জোটকে তাদের সিদ্ধান্ত না জানানোয় কাগজে-কলমে এখনো ১১ দলই রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘১১ দলের মধ্যে কোনো দল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়েনি। যে অর্থে বলা হচ্ছে ১১ দলে ভাঙন, সেটি ঘটেনি। তবে একটি পক্ষ সেই চেষ্টা করছে।’
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জাগপার সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। তিনি বলেছেন, ‘যে দুই দল এখন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জোটকে কিছু জানায়নি। তাই কাগজে-কলমে আমরা এখনো ১১ দলই আছি এবং ১১ দলই বলছি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত জানালে তখন জোট প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।’