উন্নয়ন প্রকল্পের রি-পারপাসিং ও রি-স্কোপিং এখন পরিকল্পনা কমিশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলমান এবং নতুন অননুমোদিত প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম যুক্ত বা বাদ দেওয়ার কাজও চলছে। সরকারের ভাষ্য, জাতীয় স্বার্থ ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম পুনর্বিন্যাসই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাদের মতে, এর প্রভাব পড়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ এবং উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে সেই চিত্রই উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের অন্যতম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের নামে যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, তাতে উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গতি ফিরবে বলে প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং রি-পারপাসিং ও রি-স্কোপিংয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি আরও মন্থর করেছে।
‘সিদ্ধান্তহীনতায় গতি কমেছে’
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেন, এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। ফলে প্রকল্পে কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে গতি আসছে না। নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কোন প্রকল্পকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় বাস্তবায়নও ধীর হয়ে পড়েছে।
তিনি বললেন, বর্তমানে যে খাল খনন কর্মসূচি চলছে, সেটিও পরিকল্পিত নয়। ভেকু মেশিন বা এক্সকাভেটর দিয়ে খাল কাটলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান খালের দুই পাশ কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে, যা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিনে গাছপালা ও ঘাসের কারণে শক্ত হয়ে যাওয়া পাড় নরম হয়ে গেলে দ্রুত ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পরিকল্পিতভাবে খাল খননের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
মামুন-আল-রশীদের মতে, একটি উন্নয়ন প্রকল্প শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থাসহ নানা খাত জড়িত। প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হলে এসব খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
চলছে প্রকল্প পুনর্বিন্যাস
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এখন উন্নয়ন প্রকল্পের রি-পারপাসিং ও রি-স্কোপিং কার্যক্রম চলছে।
গত ২৯ জুলাই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে বিশেষ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন চৌধুরী স্বপন। উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সেখানে চলমান ও নতুন প্রকল্পগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পরদিন ৩০ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং একই দিনে রেলপথ মন্ত্রণালয়েও পৃথক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাগুলোতে চলতি অর্থবছরের এডিপিভুক্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প চিহ্নিত করা, অর্থ অপচয়ের সুযোগ আছে কি না, প্রকল্পগুলো জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়েছে কি না এবং নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করছে সরকার। এতে সাময়িকভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল মিলবে। সরকার এমন প্রকল্পই নিতে চায়, যা নির্বাচনী ইশতেহার ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কাটছাঁটের পরও অব্যয় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বেশি
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। পরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা।
অর্থবছর শেষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ব্যয় করতে পেরেছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ কাটছাঁটের পরও ব্যয় হয়নি ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। ফলে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
পিছিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। বিভাগটির বাস্তবায়ন হার মাত্র ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।