‘অনেক হুমকি-ধমকি দিয়ে ২০১০ সালে আমার পৈতৃক জমি জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ২০১৮ সালে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সু-পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়। আমি আমার স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই। পাশাপাশি আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমি অথবা তার সমমূল্যের ক্ষতিপূরণ ফেরত দিতে ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন এটাই এখন আমার শেষ চাওয়া। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার আমাকে ন্যায়বিচার দেবেন।’
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার চার্জশিট দাখিলের পর নিজের প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে এসব কথা বলেন একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম।
তিনি বলেন, ‘সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি (বর্তমান কারাগারে) অনেক নির্যাতন হুমকি দিয়ে আমাদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নেয়। এরপর পরিকল্পিত হত্যায় আমার স্বামী মারা যায়। আমি শুধু স্বামীর বিচার চাই। একই সঙ্গে বদি আমার বাবার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমিও ফেরত চাই।’
আয়েশা বলেন, ‘নিরাপত্তাহীনতার কারণে টেকনাফ ছেড়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছি। অর্থকষ্ট তো আছেই। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। বাবার কথা বলে মেয়েরা এখনো কান্না করে। ওদের ভবিষ্যত নিয়ে খুব চিন্তত এবং ভয়ের মধ্য রয়েছি। কেননা বেশকিছু দিন আগেও বদিকে বাদ দিতে ভিন্নভাবে হুমকি এসেছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবা হারানো সন্তানদের কষ্ট ও একজন স্বামীহারা নারীর জীবনের সংগ্রাম উপলব্ধি করবেন। অন্তত তার (বিএনপির) আমলে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাব, এই আশাতেই এখনো বেঁচে আছি। পাশাপাশি আমি আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমাদের কথাগুলো সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাব।’
২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফে র্যাবের মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি একরামুল হক। ঘটনার পর তার স্ত্রী আয়েশা বেগম প্রকাশ করা একটি অডিও রেকর্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এরপর দীর্ঘ আট বছর বিচার না পাওয়ার বেদনা, সামাজিক চাপ এবং নানা ধরনের হুমকি-ধমকির অভিযোগের মধ্যেও দুই মেয়েকে নিয়ে অনিরাপদ জীবন কাটাচ্ছেন আয়েশা বেগম।
নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনার প্রায় সাত বছর পর, ২০২৫ সালের এপ্রিলে (গত বছরের এপ্রিলে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন আয়েশা বেগম। মামলাটি তদন্ত শেষে গত ২৬ জুলাই ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যাকান্ডের আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
যারা আসামি
তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও আবদুর রহমান বদি ছাড়াও আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি ও র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান, মেজর (অব.) রুহুল আমিন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ এবং কমান্ডার মো. আশেকুর রহমান সৈকতকে।
এদিকে সরেজমিনে টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী পাড়া ৩ নং ওর্য়াডে লামার বাজার সড়ক ভেতরে পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে নিহত একরামুল হকের পরিবারকে পাওয়া যায়নি। দরজায় তালা লাগানো পরিতাক্ত ঘরে জরাজীর্ণ অবস্থা। ভাঙাচোরা দরজা, জানালার কাচ ভাঙা। বর্তমানে দুই সন্তান চট্রগ্রামে থাকেন একরামুল হকের স্ত্রী।
এ বিষয়ে একরামুল হকে ভাই টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর এহেতশামুল হক বাহাদুর বলেন, ‘আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমরা বিশ্বাস করি ন্যায় বিচার পাব। ভাইয়ের পরিবার এখন চট্টগ্রামে রয়েছে।’
‘সেদিন কী ঘটেছিল’
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ থানার মেরিন ড্রাইভ এলাকায় নিহত হন একরামুল হক। তখন র্যাব দাবি করেছিল, মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গোলাগুলিতে নিহত হন ‘ইয়াবা গডফাদার’ একরামুল হক। তবে একরামুলের স্ত্রী তখনই বলেছিলেন, তার স্বামী মাদক ব্যবসায় জড়িত নন
আয়েশা বলেছেন, ‘সেসময় গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার ক্রমাগত ফোন পেয়ে ২৬ মে (২০১৮ সাল) রাতে একরাম বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। জমি সংক্রান্ত বিষয়ে স্বামী ঢেকে নিয়ে যায়। এরপর ফোন করলে রিসিভ করে নাই অনেকক্ষন। তখন আমরা বদিকে এ বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার কল করে, পায়নি। সর্বশেষ সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে না এলে তাঁর মেয়ে ১১টা ১৩ মিনিটে ফোন করেন তাঁর বাবাকে। পরে যে কল রের্কড সবার জানা আছে।’
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত’ হন তাহিয়াত ও নাহিয়ানের বাবা একরামুল হক। ঘটনার সময় তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। ১২ বছর ছিলেন টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি। ‘হত্যাকাণ্ড’টি ঘটার সময় মেয়েদের সঙ্গে তার কথোপকথন শোনা যায় ফোনে থেকে যাওয়া রেকর্ডে। একরামের প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনে মেয়ে ফোন করলে চাপ পড়ে রিসিভ হয়ে যায়। একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগমের মুঠোফোনে রেকর্ড হয়ে যায় গুলির শব্দ, শোরগোল। এই অডিও ভাইরাল হলে ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে।