বয়স ৩৫ বছর। কিন্তু উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি। দেখলে মনে হবে চার-পাঁচ বছরের একটি শিশু। অথচ এই ছোট্ট শরীর নিয়েই জীবনের ৩৫টি বছর পার করেছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম গুলিশাখালী গ্রামের মিলি আক্তার। জন্মগত হরমোনজনিত জটিলতায় তার শারীরিক বৃদ্ধি থেমে গেছে শৈশবেই। বয়স বাড়লেও বড় হয়নি শরীর, বদলায়নি শিশুসুলভ সরলতাও।
১৯৯২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া মিলির শারীরিক বৃদ্ধি জন্মের পর থেকেই স্বাভাবিক ছিল না। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতাই তার একমাত্র সরকারি সহায়তা।
মিলির ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন। একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন, যাতে কার্টুন দেখতে ও ছড়া-গান শুনতে পারেন। চলাচলের জন্য একটি নতুন গাড়ি, কারণ আগেরটি নষ্ট হয়ে গেছে। আর মাথা গোঁজার জন্য একটি সুন্দর ঘর।
মিলির দিন কাটে ভাগ্নে রাহাতের সঙ্গে। কার্টুন দেখা, গল্প করা, খেলাধুলা—সবকিছুতেই যেন তিনি এখনও ছোট্ট একটি শিশু। কখনো ভাগ্নেকে আদর করে উপদেশ দেন, আবার অভিমান করে বললেন, ‘তুমি তো বড় হয়ে গেছ, আমি এখনো বড় হতে পারলাম না।’ এক মিনিট আগে বলা কথাও অনেক সময় ভুলে যান। রাগ-অভিমানও করেন শিশুদের মতো।
মিলি জানালেন, আমার একটা মোবাইল ফোন খুব দরকার। আমি কার্টুন দেখব, ছড়া শুনব। আমার গাড়িটাও নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ যদি একটা গাড়ি কিনে দিত আর সরকার যদি একটু সাহায্য করত, তাহলে বাবার কষ্টটা একটু কমত। আমাদের একটা সুন্দর ঘর হলে খুব ভালো লাগত।
মা ফরিদা বেগম বললেন, ‘অভাবের কারণে মেয়ের ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি। তিনি বলেন, "সবাই আসে, ভিডিও করে চলে যায়, কিন্তু কেউ সাহায্য করে না। আমি মারা গেলে আমার এই মেয়েটাকে কে দেখবে—এটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা। সরকার বা সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি মেয়েটার জন্য একটি ঘর ও স্থায়ীভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।’
বাবা মো. নজরুল ইসলাম কৃষিকাজের পাশাপাশি খালে মাছ ধরে সংসার চালান। তিনি বললেন, ‘যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। মেয়ের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য হয়নি। ওর মাছ ধরার খুব শখ, তাই মাঝে মাঝে সঙ্গে করে খালে নিয়ে যাই।’

ভাগ্নে রাহাত জানায়, ছোটবেলা থেকেই সে খালাকে একই রকম দেখছে। আমি বড় হয়ে গেছি, কিন্তু খালা আগের মতোই ছোট রয়ে গেছে। কেউ যদি খালাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিত, তাহলে সে খুব খুশি হতো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিলি অত্যন্ত শান্ত ও সরল মনের মানুষ। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, একটি ভালো ঘর এবং চলাচলের জন্য নতুন গাড়ির ব্যবস্থা হলে তার জীবন অনেক সহজ হবে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বললেন, ‘মিলি বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের আওতায় থাকা অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে চলাচলের জন্য একটি গাড়ি এবং কিছু উপহার দেওয়া হয়েছিল।’
৩৫ বছর বয়স হলেও মিলির জীবন যেন থেমে আছে শৈশবেই। ছোট্ট শরীরের ভেতর বড় কোনো স্বপ্ন নেই—আছে শুধু একটু ভালোবাসা, সম্মান আর নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।