Image description

অনলাইনে টিকিট কাটতে, ব্যাংকিং সেবা নিতে, ই-মেইলে লগইন করতে বা কোনও ফরম পূরণ করতে গেলেই হঠাৎ সামনে আসে একটি ছোট বাক্স—“আমি রোবট নই”।

মজার বিষয় হলো, অনেক সময় শুধু একটি টিক চিহ্ন দিলেই কাজ হয়ে যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—একটি টিক দেখেই ওয়েবসাইট কীভাবে বুঝে যায় যে আপনি মানুষ, কোনও রোবট নন?

আসলে পুরো বিষয়টি টিক চিহ্নের চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

 

শুধু টিক নয়, আপনার আচরণও বিশ্লেষণ করা হয়

কম্পিউটার আপনার মন পড়তে পারে না। তবে আপনি ওয়েবসাইট কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেটি বিশ্লেষণ করতে পারে।

 

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, আধুনিক ক্যাপচা (CAPTCHA) প্রযুক্তি মানুষের আচরণ ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের আচরণের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করার চেষ্টা করে।

 

আপনি কোথায় ক্লিক বা ট্যাপ করছেন, কম্পিউটারে মাউস কীভাবে সরাচ্ছেন, মোবাইলে কীভাবে স্ক্রিন স্পর্শ বা স্ক্রল করছেন, কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন কিংবা ব্রাউজার কীভাবে ব্যবহার করছেন—এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে একটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সিস্টেম।

মাউস নাড়ানোর ধরনও গুরুত্বপূর্ণ

কম্পিউটারে মানুষ সাধারণত মাউস স্বাভাবিক ও কিছুটা অনিয়মিতভাবে সরান। কখনও থামেন, আবার দিক পরিবর্তন করেন।

অপরদিকে অনেক স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম বা বট অত্যন্ত নিখুঁত ও যান্ত্রিকভাবে কার্সর সরায় কিংবা সরাসরি নির্দিষ্ট স্থানে ক্লিক করে।

আর মোবাইলের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা হতে পারে আঙুলের স্পর্শের ধরন, স্ক্রল করার গতি, ট্যাপের সময় ও প্রতিক্রিয়ার ধরণ। কারণ মানুষ ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের ব্যবহার-পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য থাকে।

এসব আচরণগত সংকেত বিশ্লেষণ করেই ক্যাপচা মানুষের আচরণ শনাক্ত করার চেষ্টা করে।

শুধু ক্লিক নয়, সময়ও গুরুত্বপূর্ণ

একজন মানুষ সাধারণত ওয়েবপেজ খোলার পর কয়েক সেকেন্ড দেখে, তারপর ক্লিক করেন বা স্ক্রিনে ট্যাপ করেন।

কিন্তু স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার অনেক সময় মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই একই কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

তাই আপনি কত দ্রুত ফর্ম পূরণ করছেন, কতক্ষণ পর ক্লিক বা ট্যাপ করছেন, এমনকি কীভাবে স্ক্রল করছেন—এসব তথ্যও বিশ্লেষণের অংশ হতে পারে।

কখনও শুধু টিক, আবার কখনও ছবি কেন?

অনেকেই দেখেছেন, কখনও শুধু টিক দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায়। আবার কখনও বলা হয়— সব ট্রাফিক লাইট নির্বাচন করুন; সব বাস নির্বাচন করুন; সব মোটরসাইকেল নির্বাচন করুন।

এটি তখনই হয়, যখন সিস্টেম আপনার আচরণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না।

সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই করা হয়। কারণ মানুষের জন্য এসব ছবি শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হলেও অনেক স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রামের জন্য তা এখনও চ্যালেঞ্জিং।

কুকি ও ব্রাউজারের তথ্যও বিবেচনায় আসে

আপনি আগে ওই ওয়েবসাইট ব্যবহার করেছেন কি না, ব্রাউজারের নিরাপত্তা সেটিংস কেমন, অস্বাভাবিক কোনো আইপি ঠিকানা থেকে প্রবেশ করছেন কি না—এসব তথ্যও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও একটি তথ্যের ভিত্তিতে নয়; বরং একাধিক সংকেত একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তাহলে কি রোবটও ক্যাপচা পাস করতে পারে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর—হ্যাঁ, পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অনেক বট আগের তুলনায় আরও দক্ষ হয়ে উঠছে।

এ কারণেই ক্যাপচা প্রযুক্তিও নিয়মিত উন্নত করা হচ্ছে। বর্তমানে অনেক সেবায় এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে ব্যবহারকারীকে আলাদা করে কোনো ধাঁধা সমাধানই করতে হয় না। পর্দার আড়ালে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ভবিষ্যতে কি ‘আমি রোবট নই’ বোতাম থাকবে না?

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বাড়বে, যেখানে ব্যবহারকারীকে বাড়তি কিছুই করতে হবে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আচরণগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওয়েবসাইট নিজেই নির্ধারণ করার চেষ্টা করবে—স্ক্রিনের ওপারে একজন প্রকৃত মানুষ আছেন, নাকি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার।

শেষ কথা

অনেকেই মনে করেন, “আমি রোবট নই” বাক্সে টিক দেওয়াটাই পুরো পরীক্ষা। বাস্তবে এটি কেবল দৃশ্যমান অংশ।

পর্দার আড়ালে আপনার ক্লিক বা ট্যাপের ধরন, কম্পিউটারে মাউসের নড়াচড়া, মোবাইলে আঙুলের স্পর্শ ও স্ক্রল করার পদ্ধতি, প্রতিক্রিয়ার সময়, ব্রাউজারের বৈশিষ্ট্য এবং আরও নানা আচরণগত সংকেত বিশ্লেষণ করা হয়।

অর্থাৎ, ওয়েবসাইট আপনার পরিচয় জানে না; বরং আপনার আচরণের ধরন দেখে অনুমান করার চেষ্টা করে—স্ক্রিনের ওপারে একজন মানুষ আছেন, নাকি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম।