Image description

'ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক' এই দর্শনকে সামনে রেখে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহে আগামী ১ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে 'ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬'।

আগামী ১ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৪৫ দিন দেশব্যাপী একযোগে এই শুমারি পরিচালিত হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত 'ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা' অনুযায়ী বর্তমানে উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি চলছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত সব তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারকে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে উপজেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের হাতে সরকারি ডিজিটাল ট্যাব এবং আধুনিক শুমারি সফটওয়্যার তুলে দেওয়া হবে, যাতে সনাতনী কাগজভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

মাঠপর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিটি পরিবারের আয়, সম্পদ, জমিজমা, বসতভিটার ধরন, সদস্যসংখ্যাসহ ৫০টির বেশি সূচকে তথ্য সংগ্রহ করবেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ০ দশমিক ৫০ একর বা তার কম জমির তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রতি ১০ জন তথ্য সংগ্রহকারীর কার্যক্রম তদারকি করবেন একজন সুপারভাইজার। সংগৃহীত তথ্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা হবে এবং প্রক্সি মিন্স টেস্ট স্কোরের মাধ্যমে অতিদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকাভুক্ত হবে।

ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬ অনুযায়ী, কার্ডটি পরিবারের 'মা' অথবা 'জ্যেষ্ঠ নারী প্রধানের' নামে নিবন্ধিত হবে। এর মাধ্যমে সরকারি নগদ অর্থ সহায়তা, টিসিবির খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্র ছাড়াই সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও উপজেলা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ ও শুমারি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব প্রতিবেদককে বলেন, এই নিয়োগ ও শুমারি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপিত হবে।

সরকারি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬-এর নির্দেশনা অনুযায়ী শতভাগ নিরপেক্ষভাবে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষিত বেকার যুবক ও আইটি-দক্ষ তরুণদের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে।

নীতিমালার মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি উল্লেখ করে বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ও কয়েকবারের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা মন্তব্য করেন, এর মাধ্যমে সরাসরি সরকারি নগদ অর্থ সহায়তা, টিসিবি খাদ্যবান্ধব সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকি কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্র ছাড়াই প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে নীতিমালার মূল বৈশিষ্ট্য ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠিত হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে এই শুমারিতে ৬০ হাজার ৭৪১ জন তথ্য সংগ্রহকারী, ৬ হাজার ৭৪ জন রিজার্ভ তথ্য সংগ্রহকারী, ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার, ১২৮ জন জেলা মনিটর, ২৪ জন বিভাগীয় মনিটর এবং তিন শিফটে দায়িত্ব পালনকারী ১২৮ জন কেন্দ্রীয় মনিটর কাজ করবেন। শুমারি কার্যক্রম ১২টি বিভাগে পরিচালিত হবে।

ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু ঢাকা জেলা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ, তথ্য সংগ্রহকারী পদে ১৫ হাজার ৫৪৪ জন এবং সুপারভাইজার পদে ৩ হাজার ৫১ জন মনোনয়ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৫৮ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬৬০ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হবে।

গত ২১ জুলাই থেকে জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্থানীয় যোগ্য ও আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষিত বেকার যুবক ও আইটি-দক্ষ তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর পাইলট কার্যক্রমের উদ্বোধন চলতি বছরের ১০ মার্চ ঢাকার কড়াইল বস্তিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করেন। একই দিনে দেশের আট বিভাগের আওতায় ১৪টি বৈচিত্র্যময় এলাকা ও সিটি করপোরেশন ওয়ার্ডে, যার মধ্যে ঢাকার কড়াইল, ভাষানটেক, অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, বান্দরবানের লামা, সুনামগঞ্জের দিরাই এবং ঠাকুরগাঁও সদর উল্লেখযোগ্য, পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়।

পাইলট প্রকল্পে মোট ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়। এর আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি জিটুপির মাধ্যমে পরিবারের মা অথবা জ্যেষ্ঠ নারী প্রধানের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রদান শুরু হয়।