জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক জোটে ভাঙনের আভাস ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর এবার গুরুত্বপূর্ণ শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও নিজেদের অবস্থান নতুন করে পর্যালোচনা করছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন আলোচনা চলছে—জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা হবে, নাকি কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে তোলা হবে।
দলীয় দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এনসিপির ভেতরে বর্তমানে জোট রাজনীতির লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছে দলটি। এনসিপির একাধিক নেতা মনে করছেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে সেখানে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের একজন সদস্য আগামীর সময়কে বললেন, ‘কওমি ঘরানার কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে সংস্কার, বিচার এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতের জোটে থাকা কিংবা সেখান থেকে বেরিয়ে এলে রাজনৈতিকভাবে কী লাভ-ক্ষতি হতে পারে, সেটিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। জুলাইয়ের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’
এদিকে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় কওমি ঘরানার কয়েকটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্রগুলোর দাবি, আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। এরপর নতুন প্ল্যাটফর্মের কাঠামো, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
একাধিক সূত্রের দাবি, এই উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে এনসিপিও। ইতোমধ্যে দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কওমি ঘরানার কয়েকটি দলের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংস্কার এবং রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সম্প্রতি খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এর আগে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তবে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, বিভিন্ন আলেম ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ তাদের নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রমের অংশ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হলে তা দলীয়ভাবে নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি ইতোমধ্যে কয়েকটি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। তবে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলে প্রার্থী তালিকায়ও পরিবর্তন আসতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বললেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে এবং জোটগত সমঝোতার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। এনসিপি কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিষয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ের সমঝোতার সুযোগ না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
খেলাফত মজলিসের বিদায়ের পর এনসিপির এই অবস্থান পুনর্বিবেচনা এবং ইসলামপন্থী দলগুলোর নতুন উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এনসিপি জামায়াতের জোটে থাকবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে যুক্ত হবে—সেই সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।