
রাষ্ট্রক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনা সেই প্রাচীন গ্রিস থেকেই চলে আসছে। অ্যারিস্টটল তার ‘রাজনীতি’ গ্রন্থে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিশুদ্ধ ও বিকৃত রূপে ভাগ করেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন, একক শাসনও যেমন স্বৈরতন্ত্রে অধঃপতিত হতে পারে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন বহুজনের শাসনও নৈরাজ্যে রূপ নিতে পারে। তার মতে, সবচেয়ে স্থিতিশীল ব্যবস্থা সেটিই, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি ও ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে একটি সুষম মিশ্রণ থাকে। অষ্টাদশ শতকে ফরাসি চিন্তাবিদ মন্তেস্কু এই ধারণাকে আরো পরিশীলিত রূপ দেন তার ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ তত্ত্বে। তিনি শাসন, আইনপ্রণয়ন ও বিচার বিভাগকে পরস্পর থেকে পৃথক রাখার ওপর জোর দিয়েছিলেন, এই যুক্তিতে যে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনই স্বাধীনতার প্রধান শত্রু। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক লর্ড অ্যাক্টনের সেই বহুশ্রুত পর্যবেক্ষণ আজও প্রাসঙ্গিক—ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা করে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিগ্রস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জেমস ম্যাডিসনও ফেডারেলিস্ট প্রবন্ধমালায় একই যুক্তি হাজির করেছিলেন—মানুষ যদি দেবতা হতো, তবে শাসনের প্রয়োজনই হতো না; কিন্তু যেহেতু শাসক ও শাসিত উভয়েই মানুষ, তাই ক্ষমতাকে পরস্পরের ওপর প্রহরী বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস এই তত্ত্বকে বারবার সত্য প্রমাণ করেছে। যেখানেই নির্বাহী ক্ষমতা কোনো একক প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জমা হয়েছে, সেখানেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। তাই প্রশ্নটি শুধু রাষ্ট্রপতি বনাম প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ নয়—প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আমরা এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারি কি না, যা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হতে দেবে না।
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যখন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিলেন, তখন তা নিছক একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ কম। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া এই রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ছিল ২০২৮ সাল পর্যন্ত। প্রায় দুই বছর বাকি থাকতে, দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্বাস্থ্যগত ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তার সরে দাঁড়ানো এমন একসময়ে ঘটল, যখন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের প্রশ্নটি এমনিতেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। সংবিধান অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার নব্বই দিনের মধ্যে সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান থাকায়, স্পিকার এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং আগামী সেপ্টেম্বরের অধিবেশনেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা। এই ক্ষণটি তাই শুধু একটি প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের বিষয় নয়—এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির প্রকৃত অবস্থান কী হওয়া উচিত, সেই মৌলিক প্রশ্নে ফিরে তাকানোর একটি সুযোগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জনচরিত্র পর্যবেক্ষণ করলে একটি বৈশিষ্ট্য বারবার চোখে পড়ে : এদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে একক, দৃশ্যমান ও দায়বদ্ধ নেতৃত্বের প্রতি স্বাভাবিক আস্থা পোষণ করে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত—প্রতিটি বাঁকে জনগণ এমন একজন প্রতীকী নেতৃত্বের প্রতি তাকিয়েছে, যার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট, যার দায় সুনির্দিষ্ট। এই প্রবণতা রাষ্ট্রপতিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সংগতিপূর্ণ। অথচ আমাদের নাগরিক সমাজ, বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী মহল, ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রকে অধিকতর নিরাপদ মনে করে। ঔপনিবেশিক-উত্তর দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা কীভাবে ক্রমেই কর্তৃত্ববাদে রূপান্তরিত হয়েছে, তার তিক্ত স্মৃতি এই আশঙ্কার পেছনে কাজ করে। সুতরাং জনচরিত্র ও সুশীল সমাজের প্রজ্ঞা—এ দুইয়ের মধ্যে সংঘাত নয়, বরং সমন্বয়ই হতে হবে আমাদের রাষ্ট্র সংস্কারের মূল লক্ষ্য। আর সেই সমন্বয়ের নামই ক্ষমতার ভারসাম্য।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে এমন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বিরল। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং পঁচিশটি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরে গত বছরের অক্টোবরে যে জুলাই সনদ প্রণীত হলো, তা নিছক একটি রাজনৈতিক দলিল নয়—এটি জাতির আত্মজিজ্ঞাসার দলিল। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে, যা সংবিধান সংস্কারের পথ পরিষ্কার করেছে। জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করে, নির্বাচিত সংসদ সেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী দ্রুততার সঙ্গে শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সম্পন্ন করবে।
তবে লক্ষণীয়, জুলাই সনদের আলোচনায় যে কয়েকটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পূর্ণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব তার অন্যতম। প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে অধিষ্ঠিত থাকার বিধান নিয়েও ভিন্নমত রয়ে গেছে। এই মতভেদ কাটিয়ে ওঠাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। কারণ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস করে তা শুধু একটি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাতে কেন্দ্রীভূত রাখলে, দলীয় সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিপরীতে, রাষ্ট্রপতির হাতে এমন কিছু নির্দিষ্ট, রাজনৈতিক দলাদলির ঊর্ধ্বে থাকা দায়িত্ব ন্যস্ত করা গেলে, তা রাষ্ট্রকে একটি স্থিতিশীল কেন্দ্রবিন্দু দিতে পারে, যা নির্বাচনি ফল যাই হোক না কেন, অপরিবর্তিত থাকবে।
এখানেই প্রতিরক্ষা ও উচ্চশিক্ষা—এই দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে ক্ষমতায়িত করার প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সাংবিধানিকভাবে এরই মধ্যেই স্বীকৃত, কিন্তু বাস্তবে তা অনেকাংশে প্রতীকী থেকে গেছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হলে, এই সর্বাধিনায়কত্বকে কার্যকর তদারকির ক্ষমতায় রূপান্তরিত করা প্রয়োজন—যাতে সামরিক বাহিনীর মূল সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় এমন একজন সাংবিধানিক প্রধানের ভূমিকা থাকে, যিনি সরাসরি দলীয় নির্বাহী ক্ষমতার অংশ নন। একইভাবে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রাষ্ট্রপতির চ্যান্সেলর পদ ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান থাকলেও, উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস প্রশাসন পর্যন্ত সর্বত্র দলীয় রাজনীতির যে প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে, তা উচ্চশিক্ষাকে মানের প্রশ্নে ক্রমাগত পিছিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির চ্যান্সেলর-ক্ষমতাকে যথাযথ কর্তৃত্বে রূপ দেওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তৈরি হতে পারে।
স্মরণ করা দরকার, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য থাকা এবং স্পিকার-কর্তৃক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের এই অন্তর্বর্তী পর্ব প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষমতা আমাদের সংবিধানে যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। প্রশ্নটি সেই সাংবিধানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রপতি পদটিকে আমরা কতটা অর্থবহ করে তুলতে চাই, তা নিয়ে। সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনে যখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, ততদিনে যদি জুলাই সনদের অসমাপ্ত অংশগুলো—বিশেষত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসংক্রান্ত ধারাগুলো নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে নতুন রাষ্ট্রপতি শুধু একটি শূন্যপদ পূরণ করবেন না, বরং একটি পুনর্গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকায় অভিষিক্ত হবেন।
বিশেষজ্ঞ মহলের বৃহদাংশ মনে করে, রাষ্ট্রপতিকে অধিক ক্ষমতায়িত করলে তা একনায়কতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করতে পারে। এই আশঙ্কা অমূলক নয় এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি। কিন্তু সমাধান ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা নয়, বরং নির্দিষ্ট, সুস্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন কর্তৃত্ব দেওয়া, যাতে তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করতে পারেন, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একজন পক্ষ হিসেবে নয়। প্রতিরক্ষা ও উচ্চশিক্ষা এমন দুটি ক্ষেত্র, যেখানে দলীয় হস্তক্ষেপের ক্ষতি এরই মধ্যেই সুস্পষ্ট এবং যেখানে একজন নিরপেক্ষ সাংবিধানিক অভিভাবকের উপস্থিতি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে, তা বারবার আসে না। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমার আহ্বান থাকবে, জুলাই সনদের অসমাপ্ত আলোচনাগুলো—বিশেষত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রশ্নে—সংকীর্ণ দলীয় হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে ওঠে সমাধান করুন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার এই মুহূর্তটি আমাদের মনে করিয়ে দিক যে, ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য কোনো একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা নয়, বরং প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভকে তার যথাযথ ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করা। জনচরিত্র ও সুশীল সমাজের প্রজ্ঞা—এই দুইয়ের মিলনেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের প্রকৃত পথ।
শেষ পর্যন্ত এই সত্যটি মনে রাখা দরকার যে, কোনো সংবিধান নিজে থেকে গণতন্ত্র রক্ষা করে না; তা রক্ষা করে সেই সংবিধানের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অঙ্গীকার। জুলাই সনদ আমাদের একটি দলিল দিয়েছে, কিন্তু দলিলকে প্রাণবন্ত করার দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে আলোচনাকে তাই কোনো দল বা ব্যক্তির স্বার্থের মানদণ্ডে নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। এই মুহূর্তে জাতির সামনে যে সুযোগ উপস্থিত, তা যেন সংকীর্ণ বিতর্কে হারিয়ে না যায়—এটিই সময়ের দাবি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়