জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিম ‘বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি’ ও ‘বারডেম হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে ডায়াবেটিস এবং এর সঙ্গে যুক্ত রোগগুলোর চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসার যে আধুনিকতম পথ তিনি দেখিয়েছেন, যার ফলে আজ দেশজুড়ে রোগীরা একটি মানসম্মত ও কেন্দ্রীয় সেবা পাচ্ছে। কথাগুলো কালবেলাকে বলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।
কথার আড়ালেও কথা থাকে। ‘রোগীর সেবা করা এবং তাদের কষ্ট লাঘব করাই একজন চিকিৎসকের পরম ধর্ম’—জনহিতৈষী ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিমের অবিস্মরণীয় এই বাণীর এখন আর অস্তিত্ব নেই। তার গড়া প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো মানবিক মূল্যবোধ। বরং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির এক অপার বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। ডায়াবেটিক সমিতির অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোটি চলত সরকারি অনুদান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায়। অথচ এক সর্বগ্রাসী ‘দুষ্টচক্র’ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় খেয়ে ফেলছে, যাদের বেশিরভাগই আবার শীর্ষ পর্যায়ের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা। এ চক্রের সদস্যরা বছরের পর বছর সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলোকে লোকসান দেখিয়ে অনুদানের অর্থ হাতিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বাডাস প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ১৮ কোটি টাকা পরিশোধ করে আসছে। এরপরও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেট করে বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থ লোপাট, কমিশন বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছেন; অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন গরিব রোগীদের।
অনেক নেই-এর মধ্যে আছে রমরমা নিয়োগ-বাণিজ্য: নেই মেডিকেল সেবায় দক্ষ লোক। রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহে যারা কাজ করেন, তাদের নেই একাডেমিক সার্টিফিকেট। যারা হাসপাতাল পরিচালক ও প্রশাসনিক কাজের দায়িত্বে আছেন, তাদেরও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ওপর নেই কোনো দক্ষতা। এসব ‘নেই’-এর মধ্যে রমরমা যা আছে, তার নাম ঘুষ ও নিয়োগবাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন খোদ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও তার অনুগত পরিচালকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৭ বছর ধরে ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন। এই সময়ের মধ্যে তিনি যে গড়েছেন অঢেল সম্পত্তি। রাজধানীর উত্তরা রাজলক্ষ্মীর দুই নম্বর রোডে তার রয়েছে পাঁচ কাঠা জমির ওপর বাড়ি। গুলশানের প্রিন্স সিটিতে রয়েছে দুটি দোকান। চড়েন দামি গাড়িতে। স্ত্রী-স্বজনদের নামে-বেনামেও বিপুল সম্পদ গড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘আমি সরকারের সচিব ছিলাম এবং ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ছিলাম। ওই সময়ে উত্তরায় পাঁচ কাঠার ওপর বহুতল বাড়ি ও করেছি। এ সবই করেছি বৈধ আয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৮০। ১৭ বছর ধরে বাডাসে ভলেন্টিয়ার সার্ভিস দিচ্ছি। বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলো আগামীতে ভলেন্টিয়ার সার্ভিসের লোক খুঁজে পাবে না। কারণ, মানুষ আসেন চাকরির জন্য, ভলেন্টিয়ারি সার্ভিসের জন্য কেউ আসেন না।’
চিকিৎসা নিতে এসে ক্ষোভ: বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণভাবে অলাভজনক ও সেবামূলক বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পুরান ঢাকার বাসিন্দা শাহীন মিয়া তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর নিরাপদ প্রসবের আশায় বারডেম হাসপাতালে (শিশু ও মহিলা) ভর্তি করেন। অস্ত্রোপচারের পর তার স্ত্রীকে হাসপাতালে টানা ১৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। এতে চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কেবিন ভাড়াসহ মোট ব্যয় ৩ লাখ টাকায় পৌঁছায়। শাহীন মিয়ার দাবি, রোগীর শ্বাসকষ্ট এবং গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে চিকিৎসকরা সেদিনই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। অস্ত্রোপচারের পর মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ ছিল। কিন্তু নানা কারণ দেখিয়ে তাদের ১৫ দিন রেখে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ানো হয়।
সাড়ে ১৬ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক’ ব্যয়: বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জুনের আয়-ব্যয় বিবরণী পর্যালোচনার সময় হঠাৎ করেই ৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ঘাটতি ধরা পড়ে। বাডাস ন্যাশনাল কাউন্সিলের ৭১৬তম সভায় এ ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হলে দেখা যায়, জুন মাসে ‘রিঅ্যাজেন্ট, ভোগ্যপণ্য (কনজ্যুমেবলস) ও অন্যান্য সামগ্রী’ খাতে এক লাফে ১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। তদন্ত কমিটির তথ্যমতে, এ ব্যয় অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কারণ, এর আগের টানা ১১ মাস (জুলাই ২০২৪ থেকে মে ২০২৫) এ খাতে প্রতি মাসের খরচ ছিল গড়ে ৫ কোটি টাকার নিচে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কীভাবে এ খরচ তিন গুণের বেশি বেড়ে গেল, তা নিয়ে বাডাস সচিবালয় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
এ অস্বাভাবিক ব্যয়ের পর বাডাস সচিবালয় থেকে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই বারডেমের মহাপরিচালককে (ডিজি) চিঠি দিয়ে বিস্তারিত হিসাব চাওয়া হয়। তবে রহস্যজনকভাবে ১৭ কর্মদিবস পার হলেও বারডেম কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটি গত বছরের ১৩ আগস্ট এবং ২৭ আগস্ট পরপর দুটি কড়া তাগিদপত্র পাঠানোর পরে ২৮ আগস্ট বারডেম থেকে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম খান এবং কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, রহস্য উদ্ঘাটনে তারা বারডেমের অর্থ বিভাগের পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। কিন্তু বারডেমের হিসাব বিভাগ কমিটির সামনে ব্যয়ের স্বপক্ষে কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে বাডাসের মহাসচিব সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘সাড়ে ১৬ কোটি টাকার অস্বাভাবিক ব্যয়ের ব্যাপারে তদন্ত করেছি। তদন্তে যারা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিছু লোকজনের চাকরি চলে গেছে।’
সরকারি অনুদানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন: প্রতি বছরে ডায়াবেটিক সমিতিকে অনুদান দিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সেই অনুদানের টাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেয় সমিতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৮ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে বেতন বাবদ সহায়তা ৫ কোটি ৬০ লাখ এবং পণ্য ও সেবা বাবদ সহায়তা পেয়েছে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ব্যাংক থেকে নিয়মিত অনুদানের টাকার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, জাকাত ফান্ড ও ব্যক্তির কাছ থেকে অনুদান পেয়ে থাকে ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অর্থের অধিকাংশই মনগড়া অডিট দেখিয়ে মহাসচিব ও তার সিন্ডিকেট লোপাট করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সমিতিতে মহাসচিবের পারিবারিক রাজত্ব: বাডাসের মহাসচিব তার পদ ব্যবহার করে ডায়াবেটিক সমিতির নিয়োগ, বদলি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ—সবকিছুতে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ করেন। প্রতিটি অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানে তার পারিবারিক রাজত্বে পরিণত হয়েছে। মহাসচিবের মামা মোশাররফ হোসেন ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্কে (এনএইচএন) চাকরি করে মাসে লক্ষাধিক টাকা বেতন নিয়েছেন এবং এনএইচএনের গাড়ি ব্যবহার করেছেন। এসব নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে চাকরি ছেড়ে দেন মোশাররফ মহাসচিবের ভাই মাইনুদ্দিন এনএইচএনে চাকরি করেন। মহাসচিবের দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে, ভাগনার ছেলে উত্তরা সেন্টারে কাজ করেন। মহাসচিবের আত্মীয়দের মধ্যে আরও অনেকে বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। মহাসচিবের দ্বিতীয় স্ত্রীর সুপারিশেও এনএইচএনে বহু মানুষের চাকরি হয়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, এনএইচএনে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই চাকরি চলে যায়। প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এমন যে, প্রতিবাদ করার কারণে অনেকের চাকরি চলে গেছে কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ও এক সেন্টার থেকে অন্য সেন্টারে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এনএইচএনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো সার্কুলার বা বিজ্ঞাপন ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
আরেক কর্মকর্তা জানান, ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম এ সামাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার পদোন্নতি হয়নি।
এক প্রকল্পের টাকায় অন্য প্রকল্পের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর: দাতা সংস্থার কঠোর নিয়ম এড়াতে এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর, অডিট ফাঁকি দেওয়ার তাগিদ এবং অনভিজ্ঞ জনবলকে প্রমোশন দিয়ে একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে রাখার মতো গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে এনএইচএনের বিভিন্ন আঞ্চলিক ডায়াবেটিক সেন্টারের অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন প্রকল্প, সমাজসেবা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রকল্প এবং ডায়াবেটিস রোগীদের কাউন্সেলিং ও মানসিক সেবা প্রকল্পের অধীনে খোলা পূবালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ‘বাডাসের মা ও শিশুর স্বাস্থ্য’ প্রকল্পের বিনা সুদে সাময়িক ঋণ হিসেবে ৫৮ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা সম্পূর্ণ অন্য আরেকটি স্বাধীন প্রকল্পে এভাবে ঋণ হিসেবে স্থানান্তর করা দাতা সংস্থা এবং অডিট আইনের চরম লঙ্ঘন। এ বিষয়ে বাডাসের মহাসচিব সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। বাডাসের সব অ্যাকাউন্ট সরকারিভাবে অডিট করা হয়।’
বাডাসে অসংখ্য প্রকল্প নেওয়া হয়, যা মূলত বিদেশি অনুদান বা বেসরকারি ব্যক্তি ও কিছু ব্যাংকের সহযোগিতায় চলে। এসব প্রকল্পে এক ব্যক্তিকে বারবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নিরপেক্ষ তালিকাভুক্ত অডিটরদের মাধ্যমে অডিট প্রতিবেদন তৈরি করে তা জনগণের সামনে এবং ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা উচিত। এ ছাড়া নিজস্ব অডিটের পাশাপাশি অডিটর জেনারেল অফিস থেকেও এ প্রতিষ্ঠানের অডিট করা অপরিহার্য।’
অডিট ও অর্থ ফেরত দেওয়ার ভয়ে তড়িঘড়ি করে বাজেট খালি করার নির্দেশ: ডায়াবেটিস রোগীদের কাউন্সেলিং ও মানসিকসেবা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় ফান্ডে পড়ে থাকা অব্যায়িত অর্থ দাতা সংস্থাকে ফেরত না দিয়ে প্রকল্পের অর্থ তড়িঘড়ি করে খরচ করার কৌশল হিসেবে জনবলের বেতন এক ধাক্কায় দ্বিগুণ করা এবং একাধিক পদের দায়িত্বভার দেওয়া হয়। এক জুনিয়র অফিসারের মাসিক বেতন ছিল ২৫ হাজার টাকা। তাকে আকস্মিকভাবে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বরে সিনিয়র অফিসার পদে পদোন্নতি দিয়ে বেতন এক লাফে বাড়িয়ে ৫১ হাজার ৯৫৩ টাকা করা হয়। ওই নারী কর্মকর্তা একই সঙ্গে জুনিয়র অফিসার ও ফুল অফিসারের ডাবল দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। নিয়মানুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষে টাকা বেঁচে গেলে তা দাতা সংস্থাকে ফেরত দিতে হয়। কিন্তু এখানে এনজিও ব্যুরো ও দাতা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে যে কোনো উপায়ে টাকাগুলো খরচ দেখিয়ে বাজেট শেষ করার একটি চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণে প্রকল্পের ফান্ড থেকে ‘ঋণ’: সরকারি-বেসরকারি অনুদানে চলা বাডাসের প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বড় নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে সিনিয়র গবেষণা সহকারী কাজী মরিয়ম জাহানের ক্ষেত্রে। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কে একটি কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য ভিসা প্রসেসিং, বিমান টিকিট ও সেখানে থাকার খরচ বাবদ ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা ‘মা ও শিশু যত্ন’ প্রকল্পের ফান্ড থেকে ঋণ চেয়ে আবেদন করেন। ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কর্তৃপক্ষ সেই ঋণের অনুমোদন দেয়। অথচ একটি সেবামূলক প্রকল্পের জনকল্যাণ তহবিল থেকে কোনো কর্মকর্তা এভাবে ব্যক্তিগত বিদেশ যাত্রার জন্য টাকা অগ্রিম ঋণ নিতে পারেন না।
বাডাসের তহবিল থেকে ফ্ল্যাট ক্রয়ে ১০ লাখ টাকা ঋণ : বাডাসের কেন্দ্রীয় প্রশাসন থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যক্তিগত খাতিরে ঋণ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি একটি অফিসিয়াল প্রত্যয়নপত্রে সমিতির তৎকালীন সহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান শেখ নিজের স্বাক্ষর করা প্যাডে একটি প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করেন। এক নারীকে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ডায়াবেটিক সমিতির মতো একটি অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট কেনার ঋণ দেওয়া আর্থিক খাতের চরম স্বেচ্ছাচারিতা।
বারডেম ও বিআইএইচএসের বিরুদ্ধে মামলা কর্মচারীদের: বারডেম পরিচালিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের (বিআইএইচএস) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের স্থায়ী কর্মচারীদের সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে আকস্মিকভাবে নেওয়া এ সিদ্ধান্তকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ ও ‘সংবিধান পরিপন্থি’ আখ্যা দিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ঢাকার প্রথম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এ-সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলার বিবরণ ও আইনি নোটিশ থেকে জানা যায়, চাকরি হারানো কর্মচারীদের মধ্যে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রাশিদা আক্তার, জুনিয়র অ্যাটেনডেন্ট মো. কামরুল আহসান কামিম, জুনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. হাবিবুল্লাহ এবং জুনিয়র অ্যাটেনডেন্ট মো. বদরুল আলমসহ বেশ কয়েকজন। ভুক্তভোগী প্রত্যেকে ৫ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে সেবা দিয়ে আসছিলেন এবং কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কৃতও হয়েছেন।
ভঙ্গুর ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠানগুলো: হিসাব গোপন করার মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে। ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে দেউলিয়া অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে—বর্তমানে ব্যাংক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনা।
সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান নিলেও লাভের মুখ কেন দেখছে না বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলো—এমন প্রশ্নের জবাবে বাডাসের মহাসচিব সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘সরকারি অনুদান শুধু বারডেম হাসপাতাল পায়। বারডেমে সাড়ে ৭শ শয্যাবিশিষ্ট বেডের মধ্যে গরিব রোগীদের জন্য ৩০ শতাংশ বেড ফ্রি, ইনসুলিন ও ওষুধ ফ্রি। গত বছরে ফ্রি সার্ভিসের জন্য ডায়াবেটিক সমিতি ১১৩ কোটি টাকা খরচ করেছে।’
যা বললেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক: সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘সরকারের অনুদানের ২৮ কোটি টাকা এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের জন্য খুব বড় বিষয় নয়। তবে দেখার বিষয়, এর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা যদি লোকসান দেখানো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, সেখানে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সম্ভাবনা আছে। তাদের বৈধ আয়ের সঙ্গে এই সম্পদের সামঞ্জস্য আছে কি না এবং লোকসানি প্রতিষ্ঠান দেখানোর পেছনে কোনো প্রতারণা আছে কিনা; তা খতিয়ে দেখা দরকার।’ স্বাস্থ্য খাতে এ প্রতিষ্ঠানের অবদান থাকলেও পুরো বিষয়টিকে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করেন ড. ইফতেখার।